চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় মাত্র ৯ দিনের ব্যবধানে দুটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এতে ওই এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির চিত্র নতুন করে সামনে এসেছে। এসব হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে কিশোর গ্যাং সদস্যদের জড়িত থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে। কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য বেড়ে যাওয়ায় চরম আতঙ্কে দিন পার করছেন স্থানীয়রা। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর গুরুত্বপূর্ণ বাজার ও সড়কে চলাচলে নিরাপত্তাহীনতার সৃষ্টি হয়েছে।
এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কিশোর গ্যাংয়ের দাপট ও উচ্ছৃঙ্খল কর্মকাণ্ডে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা। বিকেল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত উপজেলার কেরানীহাট, রাস্তার মাথা, উপজেলা সদর, মৌলভির দোকান, জুটপুকুরিয়া বাজার, ফুলতলা ও ঠাকুরদীঘিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় কিশোর গ্যাং সদস্যদের অবস্থান করতে দেখা যায়।
স্থানীয়দের মতে, তুচ্ছ বিষয়কে কেন্দ্র করে এসব কিশোর বিভিন্ন সময়ে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। কোথাও প্রকাশ্যে মারামারি, কোথাও হট্টগোল এবং পথচারী-ব্যবসায়ীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের ঘটনায় সন্ধ্যার পর গুরুত্বপূর্ণ বাজার ও সড়কে চলাচলে নিরাপত্তাহীনতার সৃষ্টি হয়েছে।
গত ৩০ আগস্ট রাতে উপজেলার পুরানগড় ইউনিয়নে জাহেদুল ইসলাম জাহেদ ওরফে পিচ্চি জাহেদকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী মোটরসাইকেলে যাওয়ার সময় সড়কে গাছের গুঁড়ি ফেলে তার গতি রোধ করে দুর্বৃত্তরা। পরে ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে গুরুতর আহত করে পালিয়ে যায় তারা। রক্তাক্ত অবস্থায় জাহেদকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
এর ঠিক ৯ দিন পর গত ৮ সেপ্টেম্বর রাতে কেরানীহাট সিটি সেন্টার এলাকায় হামিম (১৯) নামে এক যুবক ছুরিকাঘাতে গুরুতর আহত হন। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় পালিয়ে যাওয়ার সময় হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে একজনকে স্থানীয়রা আটক করে পুলিশের কাছে সোপর্দ করেন।
পরপর দুই হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। তাদের দাবি, কোনো ঘটনা ঘটার পর অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলোতে নিয়মিত পুলিশি টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে কিশোর গ্যাংয়ের পেছনে থাকা পৃষ্ঠপোষক ও কথিত গডফাদারদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।
কেরানীহাট প্রগতিশীল ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেডের সভাপতি জয়নাল আবেদীন বলেন, সাতকানিয়ার ব্যবসায়িক প্রাণকেন্দ্র কেরানীহাট। বর্তমানে কিশোর গ্যাং সদস্যদের অত্যধিক উপস্থিতি ও উচ্ছৃঙ্খল আচরণে বাজারের ক্রেতা-বিক্রেতাদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। কিশোর গ্যাং সদস্য ও তাদের গডফাদারদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া ছাড়া এ পরিস্থিতির উত্তরণ সম্ভব নয়। দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
সাতকানিয়ায় নবনিযুক্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাজীব দাশ পুরকায়স্থ বলেন, আমি সবে সাতকানিয়ায় যোগদান করেছি। খুব কম সময়ের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভা করে পরিস্থিতির উন্নয়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করব।
সাতকানিয়া থানার ওসি জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আমরা ইতোমধ্যে অনেক অপরাধীকে গ্রেপ্তার করেছি। তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া-লোহাগাড়া) আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী সাম্প্রতিক অপরাধপ্রবণতায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে অপরাধ বেড়ে গেছে। মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। এ অবস্থার উত্তরণ হতে হবে। এজন্য প্রশাসনকে দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে কঠোর ভূমিকা পালন করতে হবে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের দাবি, সাতকানিয়ার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে কিশোর গ্যাং, মাদক কারবারি ও সংঘবদ্ধ অপরাধীদের বিরুদ্ধে সমন্বিত অভিযান জরুরি। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর গুরুত্বপূর্ণ বাজার ও জনবহুল এলাকায় পুলিশি টহল বাড়ানোর পাশাপাশি কিশোর গ্যাংয়ের পেছনে থাকা পৃষ্ঠপোষকদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা জরুরি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

