আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীর ছদ্মবেশে মুক্তিপণের কারবার

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীর ছদ্মবেশে মুক্তিপণের কারবার
ছবি: আমার দেশ

কালো পোশাকের ওপর এসআরবি লেখা কটি, মাথায় ক্যাপ, মুখে মাস্ক। সঙ্গে ভুয়া পরিচয়পত্র ও হ্যান্ডকাফ। সব মিলিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যের মতোই সাজানো হয়েছিল পরিচয়। সেই পরিচয় ব্যবহার করে চট্টগ্রামের বাঁশখালী থেকে এক ব্যবসায়ীকে তুলে নেওয়ার পর দাবি করা হয় ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ। পরে তাকে আটকে রাখা হয় কক্সবাজারের টেকনাফের একটি রোহিঙ্গা ক্যাম্পের কাছে। পুলিশের অভিযানে উদ্ধার হয়েছেন ওই ব্যবসায়ী। গ্রেপ্তার হয়েছেন ছয়জন।

চট্টগ্রাম জেলার পুুলিশ সুপার মাসুদ আলম বৃহস্পতিবার সকালে জানান, এটি নিছক অপহরণ নয়; আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়কে হাতিয়ার বানিয়ে মুক্তিপণ আদায়ের একটি পরিকল্পিত কৌশল। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন চাকরিচ্যুত সাবেক সেনাসদস্য সুমন মুন্সি। তার বিরুদ্ধে ছিনতাই, দস্যুতা ও অস্ত্রসংশ্লিষ্ট অভিযোগে ১৩টি মামলার তথ্য পেয়েছে পুলিশ। অন্য কয়েকজনের বিরুদ্ধেও আগের মামলা রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

গত ১৭ অক্টোবর রাত সাড়ে ৮টার দিকে বাঁশখালীর পুঁইছড়ি ইউনিয়নের প্রেমবাজারে মেসার্স আব্দুল্লাহ এন্টারপ্রাইজ নামের হার্ডওয়্যারের দোকানে ঢোকেন কয়েক ব্যক্তি। কালো পোশাকের ওপর SRB লেখা কটি পরা ওই ব্যক্তিরা নিজেদের বাহিনীর সদস্য পরিচয় দেন। দোকানে থাকা ব্যবসায়ী মোহাম্মদ এহছান ওরফে হাসানের পরিচয় নিশ্চিত করার পর তার দুই হাত পেছনে নিয়ে হ্যান্ডকাফ পরানো হয়। এরপর তাকে টেনেহিঁচড়ে দোকান থেকে বের করে নিয়ে যাওয়া হয়।

অপহরণের পর ভুক্তভোগীর স্ত্রী ও দোকানের ব্যবস্থাপকের মুঠোফোনে বিভিন্ন ভিওআইপি নম্বর থেকে কল আসে। দাবি করা হয় ২০ লাখ টাকা। টাকা না দিলে তাকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয় বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ রয়েছে।

ঘটনার পর চট্টগ্রাম জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ও বাঁশখালী থানার পুলিশ যৌথভাবে তদন্ত শুরু করে। তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে কক্সবাজার সদর, পেকুয়া, উখিয়া, রামু ও টেকনাফের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালানো হয়। ২০ অক্টোবর কক্সবাজার সদর এলাকার বাস টার্মিনাল, বাংলাবাজার ও কোর্টবাজার থেকে ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ২১ অক্টোবর ভোর ৪টার দিকে টেকনাফের লেদা (আলীখালী) রোহিঙ্গা ক্যাম্প-২৫-সংলগ্ন এলাকা থেকে হাসানকে সুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন সুমন মুন্সি, মিজানুর রহমান, জয়নাল উদ্দিন ওরফে জুনু, আব্বাস উদ্দিন, ছলিম ওরফে সেলিম এবং দেলোয়ার হোসেন। পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সুমন অতীতে উখিয়া এলাকায় SRB-তে কর্মরত ছিলেন। পরে বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগে চাকরিচ্যুত হন এবং কারাভোগ করেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে পুলিশ বলেছে, পরবর্তী সময়ে তিনি ভুয়া SRB পরিচয়ে একটি দল গড়ে তোলেন।

পুলিশ সুপারের দাবি, আব্বাস উদ্দিন ও দেলোয়ার হোসেন সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে সুমনকে তথ্য দিতেন। এরপর দলের সদস্যরা ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে অপহরণ করতেন এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আটকে রেখে মুক্তিপণ আদায়ের চেষ্টা করতেন। তবে এই ভূমিকা ও অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা তদন্ত এবং বিচারিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হবে।

পুলিশ জানিয়েছে, সুমনের বিরুদ্ধে ১৩টি মামলা রয়েছে। জয়নাল উদ্দিনের বিরুদ্ধে অপহরণ, চুরি ও ছিনতাইয়ের তিনটি মামলা, আব্বাস উদ্দিনের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে একটি মামলা এবং ছলিম ওরফে সেলিমের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে দুটি মামলা রয়েছে। এসব মামলার বর্তমান অবস্থা এবং কোনোটিতে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে কি না, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

অভিযানে একটি প্রাইভেট কার, পাঁচটি কালো এসআরবি লেখা কটি, দুটি ভুয়া পরিচয়পত্র ও একটি হ্যান্ডকাফ জব্দ করা হয়েছে। এসব সরঞ্জাম কীভাবে সংগ্রহ করা হয়েছিল, এর আগে একই কৌশলে অন্য কাউকে অপহরণ করা হয়েছে কি না এবং মুক্তিপণের অর্থ আদায়ে ব্যবহৃত নম্বরগুলোর সঙ্গে আর কারা যুক্ত—এসব বিষয় এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

এমএইচ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন