চাঁদাবাজির ঘটনায় ছাত্রদল নেতা বহিষ্কার, অধরা সন্দ্বীপের ঘাটদস্যুরা

চাঁদাবাজির ঘটনায় ছাত্রদল নেতা বহিষ্কার, অধরা সন্দ্বীপের ঘাটদস্যুরা
জগলুল হোসেন নয়ন (বামে), চাঁদাবাজির অভিযোগে বহিষ্কৃত ছাত্রদল নেতা শহিদুল (মাঝে) এবং আ.লীগের পলাতক নেতা আনোয়ার হোসেন (ডানে)।

চাঁদাবাজির অভিযোগ ও দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে সন্দ্বীপ উপজেলা ছাত্রদলের সদস্যসচিব শহিদুল ইসলামকে দল থেকে চূড়ান্তভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে। কুমিরা-গুপ্তছড়া নৌঘাটে চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে নৌ-যোগাযোগ বন্ধ থাকা এবং এর জেরে বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজ উদ্দিনের মৃত্যুর ঘটনার পর এই সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, শুধু শহিদুল ইসলামকে বহিষ্কার করলেই ঘাটকেন্দ্রিক চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারের অবসান হবে না। তাদের দাবি, ঘটনার নেপথ্যে থাকা মূল হোতারা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন।

শনিবার চট্টগ্রাম উত্তর জেলা ছাত্রদলের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে শহিদুল ইসলামকে বহিষ্কারের তথ্য জানানো হয়। দপ্তর সম্পাদক নাজিম উদ্দীনের স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল চট্টগ্রাম উত্তর জেলা শাখার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে সন্দ্বীপ উপজেলা ছাত্রদলের সদস্যসচিব শহিদুল ইসলামকে তার পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

Amardesh_Suspend_Chatrodol

চট্টগ্রাম উত্তর জেলা ছাত্রদলের সভাপতি তকিবুল হাসান চৌধুরী তকি ও সাধারণ সম্পাদক সরোয়ার হোসেন রুবেল এই বহিষ্কারাদেশ অনুমোদন করেছেন। একই সঙ্গে ছাত্রদলের সব পর্যায়ের নেতাকর্মীকে শহিদুল ইসলামের সঙ্গে কোনো ধরনের সাংগঠনিক সম্পর্ক না রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ঘাটে অচলাবস্থা, প্রাণ গেল বীর মুক্তিযোদ্ধার

এর আগে ঘাটকেন্দ্রিক চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারের জেরে কুমিরা-গুপ্তছড়া নৌরুটে হঠাৎ স্পিডবোট সার্ভিস বন্ধ হয়ে যায় বলে অভিযোগ ওঠে।

গত বুধবার সকালে উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম শহরে যাওয়ার পথে ঘাটে আটকা পড়েন বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজ উদ্দিন (৭২)। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পরও পারাপারের কোনো ব্যবস্থা না পাওয়ায় বিনা চিকিৎসায় ঘাটেই তার মৃত্যু হয় বলে অভিযোগ স্বজন ও স্থানীয়দের।

এই ঘটনার পর ঘাট ব্যবসার টাকার ভাগাভাগি নিয়ে উপজেলা বিএনপির কয়েকজন নেতার উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত একটি সালিশ বৈঠকের ২৭ মিনিটের একটি গোপন অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

ওই অডিওতে শহিদুল ইসলামসহ উপজেলা বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের কয়েকজন নেতার সম্পৃক্ততার বিষয়টি সামনে আসে বলে দাবি করা হচ্ছে। পরে দলের পক্ষ থেকে শহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলেও অন্যদের বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

গোপন অডিওতে বিএনপি নেতাদের উপস্থিতি এবং চাঁদাবাজির ঘটনায় অন্য অভিযুক্তদের বিষয়ে জানতে চাইলে সন্দ্বীপ উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট আবু তাহের কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

‘ষড়যন্ত্রের শিকার’ দাবি শহিদুলের

বহিষ্কারের বিষয়ে জানতে চাইলে সদ্য বহিষ্কৃত ছাত্রদল নেতা শহিদুল ইসলাম নিজেকে ষড়যন্ত্রের শিকার বলে দাবি করেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের অবস্থান তুলে ধরে তিনি লেখেন, জগলুল হোসেন নয়নের শেয়ার ৫ শতাংশ, কিন্তু ব্যবসার পুরো লভ্যাংশ সে একাই ভোগ করে আসছিল। আমি নয়নের চাঁদাবাজির প্রতিবাদ করায় উল্টো আমাকেই চাঁদাবাজ বানিয়ে দিল।

শহিদুলের এই অভিযোগের বিষয়ে স্পিডবোট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান আরকে এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী জগলুল হোসেন নয়নের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, শহিদ তো ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কেউ না। আমি অপরাধ করলে ব্যবসার পার্টনাররা অভিযোগ তুলবে। শহিদ এখানে কে?

জগলুল হোসেন নয়ন আমার দেশকে বলেন, পলাতক আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন তার নৌঘাট ব্যবসার অংশীদার। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ব্যবসার পুরো মুনাফা দীর্ঘদিন আনোয়ার হোসেন একাই ভোগ করেছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

‘কারণ দর্শানোর সুযোগ দেওয়া হয়নি’

তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় শহিদুল ইসলাম আমার দেশকে বলেন, এখনও পর্যন্ত বহিষ্কারাদেশের কোনো চিঠি আমি পাইনি। বহিষ্কার যদি করেই থাকে, আমাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ বা আত্মপক্ষ সমর্থনের অন্তত একটা সুযোগ দেওয়া উচিত ছিল।

আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা ছাত্রদলের সভাপতি তকিবুল হাসান চৌধুরী তকি বলেন, সুনির্দিষ্ট প্রমাণ থাকায় এবং দলীয় শৃঙ্খলা চরমভাবে লঙ্ঘিত হওয়ায় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী তাকে সরাসরি বহিষ্কার করা হয়েছে।

ধরাছোঁয়ার বাইরে চাঁদাবাজির মূল হোতারা?

গোপন সালিশি বৈঠকের অডিও ফাঁস এবং ছাত্রদল নেতার বহিষ্কারকে কেন্দ্র করে সন্দ্বীপের রাজনৈতিক অঙ্গনে তোলপাড় চলছে। তবে স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, ঘাটকেন্দ্রিক চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারের পেছনে থাকা আরও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে।

স্থানীয়দের অভিযোগ ও অনুসন্ধানে জানা গেছে, কুমিরা-গুপ্তছড়া নৌরুটের লাভজনক ঘাট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণে ছিলেন আওয়ামী লীগের পলাতক নেতা ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে আনোয়ার হোসেন আত্মগোপনে থাকলেও তার গড়ে তোলা সিন্ডিকেট এখনো ঘাটে সক্রিয় বলে দাবি ঘাটসংশ্লিষ্টদের।

তাদের ভাষ্য, পলাতক আওয়ামী লীগ নেতা আনোয়ার হোসেনের ‘মাসলম্যান’ হিসেবে ঘাট নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছিলেন শহিদুল ইসলাম। মূলত সন্দ্বীপবাসীকে জিম্মি করে এই সিন্ডিকেটের বিপুল অঙ্কের টাকা ভাগাভাগি ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করেই ঘাটে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

আর এর চরম মূল্য দিতে হয়েছে অসুস্থ বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজ উদ্দিনকে।

‘বড় মাছ ধরা ছোঁয়ার বাইরে, ধরা পড়ল ছোটটা’

শহিদুল ইসলামের বহিষ্কারের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তাদের অনেকেরই দাবি, মূল ঘাটদস্যুদের আড়াল করে একজনকে বলির পাঁঠা বানানো হয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই মন্তব্য করেছেন, বড় মাছ ধরা ছোঁয়ার বাইরে, ধরা পড়ল ছোটটা।

সন্দ্বীপ উপজেলা যুবদল নেতা টিটু হায়দার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করে লিখেছেন, শহিদকে বলি দিয়ে দীর্ঘ ১৯ বছরের ঘাটদস্যু নয়নকে বাঁচিয়ে দেওয়া হলো।

ঘাটে চলমান নৈরাজ্য ও যাত্রীদের জিম্মি করার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সন্দ্বীপ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আমজাদ হোসেন আমার দেশকে বলেন, মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যুর ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। আমরা বিষয়টি সম্পর্কে অবগত হয়ে তাৎক্ষণিক স্পিডবোট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে যাত্রী পারাপার স্বাভাবিক রাখার কড়া নির্দেশ দিয়েছি।

তিনি আরও বলেন, এ ছাড়া ঘাটে চাঁদাবাজি ও পলাতক সিন্ডিকেটের বিষয়ে আমরা খোঁজ নিচ্ছি। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ পেলে বা সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেলে কোনো অপরাধীকেই ছাড় দেওয়া হবে না।

স্থানীয়দের দাবি, শুধু একজনকে বহিষ্কার করলেই কুমিরা-গুপ্তছড়া ঘাটের নৈরাজ্য বন্ধ হবে না। তারা পলাতক আওয়ামী লীগ নেতা আনোয়ার হোসেনসহ ঘাটকেন্দ্রিক চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত সব ব্যক্তিকে তদন্তের আওতায় এনে আইনের মুখোমুখি করার দাবি জানিয়েছেন।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন