অনেক বেকার তরুণের স্বপ্ন থাকে বিদেশে গিয়ে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে নিজেদের জীবন সাজাবেন। পরিবারে ফিরিয়ে আনবেন আর্থিক সচ্ছলতা। মা-বাবা, স্ত্রী-সন্তানের মুখে হাসি ফোটাবেন। সেই স্বপ্ন বুকে নিয়ে বাবার শেষ সম্বল ভিটেমাটি বিক্রি আর ধারদেনা করে লাখ লাখ টাকা তুলে দেন দালালের হাতে। কিন্তু দালাল নামের সেই চক্রের ফাঁদে পড়ে নিঃস্ব হন শত শত তরুণ।
এমনই এক প্রতারণার শিকার হয়ে এক বছরের মাথায় সৌদি আরব থেকে খালি হাতে দেশে ফিরেছেন দুই তরুণ আসাদুজ্জামান ইমন ও আরিফ মো. তারেক। দালালচক্র নাছির-তৌফিক সিন্ডিকেটের ফাঁদে পড়ে এই দুই তরুণকে সৌদিতে কারাবাসের পর শূন্য হাতে দেশে ফিরতে হয়েছে।
অভিযোগ পাওয়া গেছে, শ্যালক-ভগ্নিপতি ‘নাছির-তৌফিক সিন্ডিকেট’ চক্রের ফাঁদে পড়ে ইতোমধ্যেই নিঃস্ব হয়েছেন কয়েকশ তরুণ। চক্রটির কারণে ভিসা ও আকামা জটিলতায় পড়ে অবৈধ অভিবাসীর তকমা নিয়ে দেশে ফিরতে হয়েছে তাদের।
ভুক্তভোগীরা জানান, দালালদের একজন কক্সবাজারে, অন্যজন থাকেন সৌদি আরবের মক্কায়। কক্সবাজারের রামু উপজেলার রশিদনগরের বাসিন্দা নাছির উদ্দিন দেশে বসে বিদেশগামী তরুণদের ফাঁদে ফেলেন, আর সৌদি আরবের মক্কায় বসে সব কলকাঠি নাড়েন তারই ভগ্নিপতি তৌফিকুল ইসলাম। এই চক্রে যুক্ত আছে তৌফিক ও নাছিরের পুরো পরিবার। তৌফিকের আরো তিন ভাই এসব প্রতারণায় সরাসরি যুক্ত, যারা ভাইয়ের সঙ্গে সৌদি আরবে থাকেন।
অভিযোগমতে, তাদের সহজ শিকার কক্সবাজারের নবগঠিত উপজেলা ঈদগাঁও এলাকার তরুণরা। ঈদগাঁও ছাড়াও তাদের হাতে প্রতারিত হয়ে নিঃস্ব হয়েছেন কক্সবাজার সদর, রামু ও চকরিয়া উপজেলার কয়েকশ তরুণ।
ভুক্তভোগীরা বলেন, নাছির উদ্দিন ফ্রি ভিসায় সৌদি পাঠানোর কথা বলে বিদেশ যেতে ইচ্ছুক তরুণদের ফাঁদে ফেলেন। তাদের জানানো হয়, সৌদিতে তারা যাবেন ফ্রি ভিসায়। কাজের কোনো অভাব নেই। যে কোনো জায়গায় কাজ করতে পারবেন। ভিসা ও আকামার কোনো জটিলতা হবে না। হলেও সব দায়িত্ব তাদের।
বিদেশগামী তরুণরা নাছিরের পাতা ফাঁদে পা দিয়ে ঘরবাড়ি, জায়গাজমি বিক্রি ও ধারদেনা করে লাখ লাখ টাকা তুলে দেন তার হাতে। ভিসা প্রসেসিং, টিকিটসহ নানা কাজের কথা বলে আদায় করেন অতিরিক্ত টাকা। বিদেশগামীদের জানানো হয়, সৌদি আরবে তাদের রিসিভ করবেন তার ভগ্নিপতি তৌফিক। আকামা, কফিল ও কাজ সবকিছুই করে দেবেন সেই তৌফিক—এই শর্তে তাদের পাঠানো হয়।
কিন্তু সৌদিতে পৌঁছেই দেখা দেয় নতুন জটিলতা। যে তৌফিক তাদের রিসিভ করার কথা, তার আর দেখা মেলে না। এই প্রতারক তাদের মাধ্যমে যাওয়া কাউকেই কফিলের (চাকরিদাতা/স্পন্সর) সঙ্গে লেনদেন করতে দেন না। নিজেই সব করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সেসব তরুণের কাছ থেকে প্রতি মাসে টাকা নিতে থাকেন।
আর সৌদির কফিল বেকার তরুণদের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে ব্লক করে দেন ‘আকামা’ (রেসিডেন্ট পারমিট)। সেই আকামা খুলতে গেলেও টাকা, না খুললেও টাকা; আর জটিলতা লম্বা হয়ে গেলে অবৈধ অভিবাসী হয়ে গ্রেপ্তার হয়ে শূন্য হাতে ফিরতে হয় দেশে।
কারা এই শ্যালক-ভগ্নিপতিচক্র
নাছির উদ্দিন হলেন রামু উপজেলার রশিদনগর ইউনিয়নের ধলিরছড়া গ্রামের আরফান আলীর ছেলে। এই প্রতারক দীর্ঘদিন সৌদিতে অবস্থান করে দেশে ফিরে শুরু করেন আদম ব্যবসা। তিনিই হলেন এই দালালচক্রের বাংলাদেশ অংশের মূল ব্যক্তি।
অন্যদিকে তৌফিকুল ইসলাম হলেন নাছির উদ্দিনের আপন ভগ্নিপতি ঈদগাঁও উপজেলার পোকখালী ইউনিয়নের দানু মিয়ার ছেলে এবং সিন্ডিকেটের সৌদি অংশের প্রধান।
এই চক্রের হাতে প্রতারিত হয়েই ফিরতে হয়েছে আসাদুজ্জামান ইমন ও আরিফ মোহাম্মদ তারেককে। কক্সবাজার শহরের উত্তর নুনিয়াছড়া এলাকার এ দুই যুবক সৌদিতে গিয়েছিলেন মাত্র এক বছর আগে। তারা হাজার হাজার রিয়াল নাছির উদ্দিন ও তৌফিকুল ইসলামকে দিলেও সেই টাকা নিজেরা মেরে দেয় এবং ভিসা-আকামা জটিলতায় পড়ে সৌদিতে জেল খেটে পরে দেশে ফিরতে বাধ্য হন ভুক্তভোগীরা।
আসাদুজ্জামান ইমন জানান, নাছির উদ্দিন সৌদি আরবে টাকা নিয়েও নানা জটিলতা করেছেন। অবশেষে সৌদিতে যেতে পারলেও শুধু তৌফিকের বাটপাড়ির কারণে এক বছর না যেতেই দেশে ফিরতে হয়েছে।
তিনি বলেন, তৌফিক আমাকে কফিলের সঙ্গে দেখা করতে দেননি। কফিল টাকা চাইছে বলে হাজার হাজার রিয়াল নিয়েছেন; কিন্তু একটি রিয়ালও কফিলকে না দেওয়ায় আমার আকামা ব্লক করে দিয়েছেন সৌদি কফিল। এই ব্লক খুলে দেওয়ার নামেও কয়েক হাজার রিয়াল নিয়েছেন তৌফিক। কিন্তু আমার আকামার ব্লক খুলে দেননি।
তিনি বলেন, আমি যখন পুলিশের হাতে ধরা পড়ি, তখন আমাকে ছাড়ানোর কথা বলে এই তৌফিক আমার পরিবারের কাছ থেকে তিন হাজার রিয়াল (৯৬ হাজার টাকা) নিয়েছেন। কিন্তু আমাকে ছাড়াতে কোনো চেষ্টাই করেননি।
আরেক ভুক্তভোগীর কাহিনি
তৌফিক খান নামের কক্সবাজার সদরের পিএমখালী ইউনিয়ন এলাকার এক তরুণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, দুই বাটপাড়কে পরিচয় করিয়ে দেব। সৌদি আরব থেকে ভিসা ব্যবসা করে সবচেয়ে বড় বাটপাড় ‘তৌফিক বাটপাড়’। তার বাড়ি কক্সবাজারের ঈদগাঁও উপজেলার পোকখালী ইউনিয়নের গোমাতলী। তারা চার ভাই সৌদি আরবে বসে শুধু বাটপাড়িই করে। শুধু বাংলাদেশিদের সঙ্গে নয়, সৌদিদের সঙ্গেও বাটপাড়ি করে।
আর তাদের সঙ্গে যুক্ত বাংলাদেশের রশিদনগরের ‘নাছির বাটপাড়’। তার কাজ হলো মিষ্টি কথা বলে আল্লাহর নামে অসংখ্য শপথ করে, সাত-পাঁচ বুঝিয়ে অনেক টাকা নিয়ে ভিসা বিক্রি করে সৌদি আরব পাঠিয়ে দেওয়া। তারপর সৌদি আরবে বসে থাকা তৌফিক তার বাটপাড়ি, অত্যাচার ও হয়রানি শুরু করে।
তিনি লেখেন, এরা সৌদি আরবে নিয়ে অনেককেই আকামা দেয় না। আকামার জন্য আরো টাকা দিতে হবে। সেটা সমাধান হলে কিছুদিন যেতে না যেতেই ‘তোমার মোয়াচ্ছাচায় (প্রবাসী শ্রমিক রাখার লাইসেন্স) নামছে, টাকা দাও’! সেটা দিয়ে সোজা হতে না হতেই বলে, ‘তোমার কফিল টাকা চাচ্ছে, এ সপ্তাহের মধ্যেই ২০০০ রিয়াল দিতে হবে’! দিতে না পারলে দিনরাত ফোন করে বিরক্ত করে, অনেক কথা শোনায়।
এদিকে শ্যালক-ভগ্নিপতিচক্রের হাতে প্রতারিত হয়ে দেশে ফিরতে বাধ্য হওয়া আসাদুজ্জামান ইমন প্রতারিত সবার কথা ভেবে কক্সবাজার সদর মডেল থানায় মামলা করেছেন। ওই মামলায় নাছির উদ্দিন, তৌফিকুল ইসলাম, তার স্ত্রী পারুল আক্তার ও তৌফিকের বাবা দানু মিয়াকে আসামি করা হয়েছে। আসাদুজ্জামান ইমন দাবি করেন, এরা সবাই সৌদি আরবে পাঠানোর জন্য টাকা নেওয়ার সঙ্গে জড়িত ছিলেন।
আসাদুজ্জামান ইমন ও আরিফ মোহাম্মদ চান তাদের মতো আর কেউ যেন এই চক্রের হাতে প্রতারিত না হন।
এ ব্যাপারে কথা বলতে নাছির উদ্দিনের দুটি মোবাইল নম্বরে একাধিকবার কল দিলেও ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। সৌদি আরবে অবস্থানরত তৌফিকুল ইসলামের বক্তব্য নেওয়াও সম্ভব হয়নি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


১৪৩ বছর জ্ঞানের আলো ছড়াচ্ছে রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিধন্য প্রতিষ্ঠানটি
রাজিবপুরে টিআর-কাবিটার অধিকাংশ প্রকল্পে হরিলুট
অধ্যক্ষ হওয়ার যোগ্যতা নেই, তবু বহাল আতাউল্লাহ