কন্ট্রোল রুম চালু

পেকুয়ায় পানিবন্দি ২০ হাজার মানুষ, প্রস্তুত ৭১ আশ্রয়কেন্দ্র

উপজেলা প্রতিনিধি, পেকুয়া (কক্সবাজার)

পেকুয়ায় পানিবন্দি ২০ হাজার মানুষ, প্রস্তুত ৭১ আশ্রয়কেন্দ্র
ছবি: আমার দেশ

প্রকৃতির টানা আঘাতে কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে কক্সবাজারের পেকুয়া। চার দিনের অতিভারি বর্ষণে উপজেলার বিস্তীর্ণ জনপদ এখন বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। কোথাও কোমরপানি, কোথাও বিচ্ছিন্ন সড়কযোগাযোগ, আবার কোথাও পাহাড়ধসের আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটছে হাজারো মানুষের।

ইতিমধ্যে একজনের প্রাণহানি ঘটেছে, পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে অন্তত ২০ হাজার মানুষ। পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হওয়ার আশঙ্কায় উপজেলা প্রশাসন ৭১টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রেখে চালু করেছে জরুরি কন্ট্রোল রুম এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

জেলা প্রশাসনের জারি করা গণবিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, কক্সবাজার সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত বহাল রয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস বলছে, আগামী কয়েক দিনও ভারি থেকে অতিভারি বর্ষণ অব্যাহত থাকতে পারে। ফলে আকস্মিক বন্যা ও পাহাড়ধসের ঝুঁকি আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপ এবং সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে পেকুয়ার সাতটি ইউনিয়নের অন্তত ২০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পেকুয়া সদর, উজানটিয়া, মগনামা, রাজাখালী, শিলখালী, টইটং ও বারবাকিয়া ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা।

বহু পরিবার ঘরবাড়িতে পানি ওঠায় নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটছে। অনেক গ্রামীণ সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে বিভিন্ন জনপদ।

উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, শতাধিক বসতঘরে পানি ঢুকেছে। হাঁটু থেকে কোমরপানিতে ডুবে গেছে অসংখ্য গ্রাম। বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থা বিভিন্ন এলাকায় ব্যাহত হয়েছে। কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই অধিকাংশ সড়ক চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে।

কক্সবাজার আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, টানা তিন দিনে জেলায় মোট ৬৪৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ। শুধু শেষ ২৪ ঘণ্টায় রেকর্ড হয়েছে ১২৯ মিলিমিটার বৃষ্টি। আবহাওয়াবিদদের মতে, স্বল্প সময়ে এত বিপুল পরিমাণ বৃষ্টিপাত পাহাড়ধস ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আব্দুল হান্নান বলেন, আগামী কয়েক দিনও ভারি বর্ষণের প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। তাই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারীদের সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অতিরিক্ত বৃষ্টিতে পাহাড়ের মাটি সম্পূর্ণ সিক্ত হয়ে পড়েছে। ফলে নতুন করে বড় ধরনের পাহাড়ধসের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। পাশাপাশি খাল-নালা উপচে পড়ায় দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে।

এদিকে উত্তাল সাগরের কারণে পেকুয়া-কুতুবদিয়া নৌপথে নৌযান চলাচল বন্ধ রয়েছে। এতে জরুরি প্রয়োজনে যাতায়াতকারী মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েছে। টইটং ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় ইতোমধ্যে পাহাড়ধসের ঘটনাও ঘটেছে। পাহাড়ঘেঁষা হাজারো পরিবার এখন চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

উপজেলা দুর্যোগ ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) কাউসার আহমেদ জানান, সম্ভাব্য যেকোনো দুর্যোগ মোকাবিলায় উপজেলার ৭১টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। উপজেলা প্রশাসনের কার্যালয়ে কন্ট্রোল রুম চালু রয়েছে এবং উদ্ধার, ত্রাণ ও জরুরি সহায়তা কার্যক্রম সার্বক্ষণিক সমন্বয় করা হচ্ছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য পর্যাপ্ত শুকনো খাবার মজুত রয়েছে। অতিরিক্ত ত্রাণের চাহিদা জেলা প্রশাসনের কাছে পাঠানো হয়েছে। প্রয়োজনীয় ঢেউটিনও প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে সব ইউনিয়নের জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম আরও জোরদার করা হবে।

দুর্যোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, টানা ভারি বর্ষণ অব্যাহত থাকলে পেকুয়ার নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে। তাই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী মানুষকে বিলম্ব না করে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার পাশাপাশি প্রশাসনের নির্দেশনা কঠোরভাবে অনুসরণের আহ্বান জানানো হয়েছে।

এমএইচ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...