আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

অন্য আসনেও বিএনপি-জামায়াত সমানে সমান

সালাহউদ্দিনকে চ্যালেঞ্জ ছুড়লেন জামায়াতের তরুণ ফারুক

আনছার হোসেন, কক্সবাজার

সালাহউদ্দিনকে চ্যালেঞ্জ ছুড়লেন জামায়াতের তরুণ ফারুক

বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর ঘাঁটি হিসেবেই দীর্ঘ বছর ধরে পরিচিত কক্সবাজার। সাধারণত অনিয়ম, প্রতারণা ও ভোট ডাকাতির আশ্রয় না নিলে জেলার চারটি আসনের সবকটিতে বিএনপি-জামায়াতের প্রার্থীরা জয়ী হয়ে আসেন। তবে সেটি অবশ্য জোটবদ্ধ নির্বাচনে। এবার কিন্তু সে চিত্র ভিন্ন। দল দুটি এবার নির্বাচনে আলাদা হয়ে লড়ছে। নির্বাচনি ডামাডোলের শুরুর দিকে জেলার চারটি আসনে বিএনপির আধিপত্য থাকলেও বর্তমানে সে সমীকরণ বদলে গেছে।

সাধারণ ভোটাররা মনে করছেন, দুটি আসনে বিএনপি আর দুটি আসনে জামায়াতের প্রার্থীরা জয়ী হতে যাচ্ছেন। যদিও দলীয় নেতাকর্মীরা প্রতিটি আসনেই নিজেদের প্রার্থীদের স্পষ্ট বিজয় দেখছেন। বিএনপি নেতাকর্মীরা বলছেন, তারা কক্সবাজার জেলার চারটি আসনই বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে উপহার দেবেন। অন্যদিকে জামায়াতের নেতাকর্মীরা দাবি করছেন, অতীতে যাই হোক, এবার চারটি আসনেই তাদের প্রার্থীরা জিতবেন। কক্সবাজারের চারটি আসনকে গুরুত্ব দিয়ে ইতোমধ্যে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান দুবার জেলায় সফর করেছেন। যদিও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কক্সবাজার সফরের কথা থাকলেও সে কর্মসূচি প্রত্যাহার করা হয়।

বিজ্ঞাপন

কক্সবাজার-১ (চকরিয়া-পেকুয়া)

জেলার বৃহত্তর উপজেলা চকরিয়া আর উপকূলীয় উপজেলা পেকুয়া নিয়ে গড়া এ আসনে শিকড় শক্ত করে অনেকটা স্থায়ী আসন গেড়েছে বিএনপি। আসনটিতে সালাহউদ্দিন আহমদকে মনে করা হয় ‘অপরাজেয়’। তিনি এ আসনে বিএনপির প্রার্থী।

এ আসনে অনেক আগেই প্রার্থী ঘোষণা করেছে জামায়াতে ইসলামী। দলটির কক্সবাজার শহর শাখার আমির ও সাবেক ছাত্রনেতা আবদুল্লাহ আল ফারুককে প্রার্থী ঘোষণার পর থেকে তিনি নিজে ও সাংগঠনিকভাবে মাঠ চষে বেড়িয়েছেন। প্রচার শেষে এমন অবস্থা দাঁড়িয়েছে, জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীরা তাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন। তারা মনে করছেন, এবার এ আসনে তাদেরই বিজয় হবে।

সালাহউদ্দিন আহমদও নিয়মিত প্রচার চালিয়ে গেছেন। চেষ্টা করেছেন ভোটারদের দুয়ারে দুয়ারে যেতে। সাধারণ ভোটারদের ধারণা, দিন শেষে বিজয়টা সালাহউদ্দিন আহমদেরই হবে।

এ আসনে বিএনপি-জামায়াতের মধ্যেই মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। এখানে তারা দুজন ছাড়া মাত্র আরেকজন প্রার্থী রয়েছেন। তিনি হলেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ছরওয়ার আলম কুতুবী।

কক্সবাজার-২ (মহেশখালী-কুতুবদিয়া)

জেলার দুটি দ্বীপ উপজেলা মহেশখালী ও কুতুবদিয়া নিয়ে গড়া এ আসন জোটবদ্ধ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীকে ছেড়ে দেওয়া হয়। অতীতে এ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হিসেবে জোটের ভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক ছাত্রনেতা এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ। এবারও তিনি জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী।

আসনটিতে জামায়াতে ইসলামীর উল্লেখযোগ্য ভোট রয়েছে। তবে চিরাচরিতভাবেই বিএনপির ভোট বেশি। ইতঃপূর্বে বিএনপি-জামায়াত জোটবদ্ধ নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় হামিদুর রহমান আযাদ সহজেই নির্বাচিত হয়েছিলেন। সাধারণ ভোটাররা মনে করেন, আসনটিতে তার জেতার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।

অন্যদিকে বহু গ্রুপে বিভক্ত বিএনপির প্রার্থী হয়েছেন সাবেক সংসদ সদস্য আলমগীর মুহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ ফরিদ। তিনি জনপ্রিয় প্রার্থী হলেও বিএনপির একাধিক গ্রুপিংয়ের কারণে ভোটের মাঠে কিছুটা পিছিয়ে আছেন। যদিও গ্রুপিংয়ে থাকা নেতাকর্মীদের তার সঙ্গে প্রচারে দেখা গেছে। কিন্তু সাধারণ মানুষ মনে করছেন, গ্রুপিংয়ের কারণে দলের লোকজনের সমর্থন তিনি খুব বেশি পাবেন না। কুতুবদিয়ায় বিএনপির অনেক ভোটই জামায়াত প্রার্থীর ঘরে যাবে।

এ আসনেও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এবং জাতীয় পার্টির প্রার্থী রয়েছেন। তবে এখানে তাদের সম্ভাবনা একেবারেই ক্ষীণ।

কক্সবাজার-৩ (সদর-রামু-ঈদগাঁও)

আসনটি সব সময় বিএনপির ঘরেই থাকে। বিএনপির প্রার্থী যেই হোন না কেন, জেতেন তিনিই। তবে এ আসনে প্রতিবারই বিএনপিতে প্রার্থিতা নিয়ে জটিলতা দেখা দেয়। কিন্তু এবার বিএনপির একক প্রার্থী সাবেক সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল।

অন্য আসনের মতো এ আসনেও বিএনপির ভোট বেশি। কিন্তু জামায়াতের সাংগঠনিক কার্যক্রম মজবুত। অনেক আগেই এ আসনে দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করে দলটি। এবারের নির্বাচনে তাদের প্রার্থী কক্সবাজার সরকারি কলেজ ছাত্র সংসদের সাবেক ভিপি ও সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান শহিদুল আলম বাহাদুর, যিনি ভিপি বাহাদুর নামেই বেশি পরিচিত। তিনি ব্যক্তিগত ইমেজের চেয়ে সাংগঠনিক ভিত্তিকে কাজে লাগিয়ে ভোটের মাঠ চষে বেড়িয়েছেন। জামায়াতের নেতাকর্মীরা মনে করেন, তারা ইতোমধ্যে সবকিছু কাভার করে নিয়েছেন। লুৎফুর রহমান কাজলের ফুরফুরে মেজাজের আমেজে ঘি ঢেলে সাধারণ মানুষ ভিপি বাহাদুরকেই ভোট দিয়ে জিতিয়ে আনবেন।

তবে সাধারণ ভোটারদের ধারণা, শেষ পর্যন্ত এ আসনে এমপি হতে যাচ্ছেন কাজলই। কারণ, এবার ঐক্যবদ্ধ বিএনপি কাজ করছে মাঠে।

আসনটিতে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের একমাত্র প্রার্থী দলটির জেলা সভাপতি ও রামু চাকমারকুল দারুল উলুম মাদরাসার মুহাদ্দিস মাওলানা আমিরুল ইসলাম মীর। এছাড়া বাংলাদেশ লেবার পার্টির জগদীশ বড়ুয়া ও আমজনতার পার্টির নুরুল আবছার এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী ইলিয়াছ মিয়া থাকলেও ভোটের মাঠে তাদের কোনো প্রভাব নেই।

কক্সবাজার-৪ (উখিয়া-টেকনাফ)

দেশের রাজনীতিতে একটি কথা প্রচলিত আছেÑকক্সবাজার-৪ আসনে যে দলের প্রার্থী জয়ী হন, সে দলই ক্ষমতার চেয়ারে বসে। সীমান্তের এ আসনে বিএনপির হয়ে দীর্ঘকাল ধরে ভোট করে আসছেন জেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক হুইপ শাহজাহান চৌধুরী। তিনি অনেকবার এ আসনে জিতেছেন। অনেকেই মনে করেন, ভোটের খেলায় তিনি পারদর্শী। এবারও বিএনপির হয়ে লড়ছেন তিনি। কিন্তু তার জন্য ‘পথের কাঁটা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও দখলবাজির অভিযোগ।

শাহজাহানকে ‘সীমান্ত শার্দূল’ বলা হলেও জুলাই বিপ্লবের পর তার পরিবার ও আশপাশের নেতাকর্মীদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড তাকে বেকায়দায় ফেলেছে, যেটা ভোটের মাঠেও প্রভাব ফেলছে। সাধারণ মানুষ মনে করছেন, শাহজাহান চৌধুরীর অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে, জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর কাছে তার ভরাডুবিও হতে পারে।

আসনটিতে জামায়াতে ইসলামী কখনোই জিততে পারেনি। কিন্তু এবার দলটির প্রার্থী হয়েছেন জেলা আমির মাওলানা নূর আহমেদ আনোয়ারী। তিনি টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যং ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত চেয়ারম্যান। তিনি ওই ইউনিয়ন পরিষদে প্রতিবারই চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে আসছেন। জামায়াতের এই প্রার্থী একটি মাদরাসার অধ্যক্ষ এবং এলাকার সাধারণ মানুষের কাছে তুমুল জনপ্রিয়। এলাকাবাসী মনে করেন, ‘জোব্বাওয়ালা’ (জামায়াত প্রার্থী) যতদিন বেঁচে থাকবেন, ততদিন তিনিই চেয়ারম্যান হতে থাকবেন।

ইউনিয়ন পরিষদের এ জনপ্রিয়তাকে নূর আহমেদ এবার সংসদ নির্বাচনে কাজে লাগাচ্ছেন। সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর সাংগঠনিক তৎপরতা তাকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়েছে। উখিয়া-টেকনাফে জামায়াতের দলীয় ভিত্তি মজবুত। জামায়াতের নেতাকর্মীরা আশা করছেন, এবার এ আসন তাদের কাছ থেকে কেউ ছিনিয়ে নিতে পারবে না।

এ আসনেও প্রার্থী আছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের। তিনি নুরুল হক। আরো আছেন এনডিএমের সাইফুদ্দিন খালেদ। যদিও মাঠে-ময়দানে তাদের তেমন কোনো কার্যক্রম নেই।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন