কুমিল্লা দেশের অন্যতম প্রধান মাদক সরবরাহের রুটে পরিণত হয়েছে। জেলার সীমান্তবর্তী এলাকা দিয়ে ভারত থেকে বিভিন্ন ধরনের মাদক দেশে প্রবেশ করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। মাদকের প্রবেশ ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করলেও বন্ধ করা যাচ্ছে না এর প্রবেশ ও সরবরাহ। কারণ, অভিযানে মাদক জব্দের পাশাপাশি বাহক ও খুচরা বিক্রেতারা গ্রেপ্তার হলেও মূল হোতারা থেকে যাচ্ছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।
সীমান্ত পেরিয়ে কুমিল্লা নগরী, মহাসড়ক, নদী ও রেলপথ ব্যবহার করে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে ফেনসিডিল, গাঁজা, ইয়াবাসহ নানা ধরনের মাদক। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রশাসনের একাংশের সহযোগিতার কারণে মাদক কারবারের মূল নিয়ন্ত্রকদের অনেকেই ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকছেন। ফলে অভিযান ও গ্রেপ্তার অব্যাহত থাকলেও বন্ধ হচ্ছে না সীমান্তপথে মাদকের প্রবেশ এবং দেশের অভ্যন্তরে এর সরবরাহ।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, জেলায় মাদক কারবারির তালিকায় গডফাদার ১৪ জন, পাইকারি ৫৪ জন এবং খুচরা বিক্রেতা আছেন ১১৬ জন। সর্বমোট ১৮৪ জনের নাম এই তালিকায় রয়েছে। অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক বজলুর রহমান আমার দেশকে বলেন, তদন্তের স্বার্থে গডফাদারদের নাম প্রকাশ করা হচ্ছে না।
জানা গেছে, তালিকাভুক্ত দুই শতাধিক মাদক কারবারির ছয়জন পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হলেও বাকিরা পলাতক। এদের বিরুদ্ধে একাধিক মাদক মামলা হয়েছে। তাদের বেশিরভাগই জামিনে রয়েছেন বলে জানা গেছে। গত ১৮ আগস্ট থেকে মাদকবিরোধী অভিযান শুরু হওয়ার পরই গা-ঢাকা দিয়েছেন এসব মাদক কারবারি।
স্থানীয়রা জানান, মাদক পাচার নিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের একাধিক শক্তিশালী সিন্ডিকেট কাজ করছে । এরাই নোম্যান্স ল্যান্ডের পাশে ভারতে গড়ে তুলেছে ফেনসিডিলসহ নানা ধরনের মাদকের কারখানা। শত শত বিঘা জমিতে চাষ করা হচ্ছে গাঁজা। জেলার সহস্রাধিক ছোট-বড় মাদক ব্যবসায়ী এসব সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে বিভিন্ন সময় কিছু মাদক কারবারি ধরা পড়লেও মূল হোতারা বরাবরই থেকে যাচ্ছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। এদের অনেকেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের বড় বড় পদ-পদবিধারী।
আমার দেশ-এর প্রতিবেদকের হাতে জেলার মাদক কারবারিদের একটি নামের তালিকা এসেছে। তালিকায় আদর্শ সদর উপজেলার ধর্মপুর এলাকার জিন্নাতুন নেছা, শাসনগাছার সুরাইয়া বেগম, বালুতোপার শিবু, কাটাবিলের অপু ও সাব্বিরের নাম রয়েছে।
এছাড়া ব্রাহ্মণপাড়ার আবুল হোসেন, সোনা মিয়া, হেলাল, মুখলেছ, বিল্লাল হোসেন, সামির উদ্দিন, জামাল হোসেন, জাহাঙ্গীর মিয়া, রফিকুল ইসলাম, জাহাঙ্গীর আলম, মামুন মিয়া, উজ্জ্বল, বাহাদুর, আব্দুল জলিল, দেলোয়ার হোসেন, শশীদলের হেলাল উদ্দিন ও রিপন মিয়া, তেতাভূমীর আলী আকবর ও সুমন মেম্বার এবং দীঘিরপাড়ের বাবুল মিয়ার নাম রয়েছে।
বুড়িচংয়ের তালিকায় চরানল এলাকার হুমায়ন মেম্বার, মহসিন, শংকুচাইলের রবিউল ইসলাম রবি, বিল্লাল হোসেন, আনোয়ার হোসেন, আবদুল খালেক ওরফে মুরগি শাহিন, পাইকোডার জসিম উদ্দিন, কালাকচুয়ার মাধব চন্দ্র সাহা, উত্তরগ্রামের ফিরোজ মিয়া ও এনামুল হক, মীরপুরের খোরশেদ আলম ও জামাল খান, নগরপাড়ের এনু মিয়া এবং বারেশ্বরের মানিক মিয়া ও নুরুল ইসলামের নাম রয়েছে।
চৌদ্দগ্রামের তালিকায় রয়েছে চান্দিশকড়ার আরিফুর রহমান, বসন্তপুরের রুবেল মিয়া ও দেলু, উপজেলা সদরের নাছির উদ্দিন এবং জগমোহনের শাহীনের নাম। সদর দক্ষিণের তালিকায় মান্দারীর নাজমুল হাসান, শামীম হোসেন, শাকিল, রুবেল, ফারুক ও সুমন, মুদ্দতের আলমগীর হোসেন, সূর্যনগরের নূর হোসেনসহ অনেকের নাম রয়েছে।
৪৭ ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্ট
বিভিন্ন সূত্র ও সরকারি নথির উদ্ধৃতি দিয়ে কুমিল্লা সীমান্তে প্রায় ৪৭টি পয়েন্টকে মাদক ও চোরাচালানের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে আদর্শ সদর উপজেলার বিবিরবাজার ও গোলাবাড়ী, ব্রাহ্মণপাড়ার শশীদল, আশাবাড়ী ও হরিমঙ্গল, বুড়িচংয়ের হায়দ্রাবাদ, নগর ও ভবেরমুড়া, সদর দক্ষিণের মথুরাপুর ও কনসতলাসহ বিভিন্ন সীমান্তবর্তী এলাকা উল্লেখযোগ্য।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সীমান্তের ওপার থেকে মাদক এনে এসব পয়েন্ট ব্যবহার করে দেশের ভেতরে ঢোকানো হয়। পরে স্থানীয় নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তা বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে পড়ে।
নদীতে ভাসিয়েও আসে চালান
সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দারা বলছেন, নদীপথেও মাদক পাচারের অভিনব কৌশল ব্যবহার করা হয়। বিজিবি সদস্য এনামুল হকের ভাষ্য অনুযায়ী, ভারত থেকে বিভিন্ন চিহ্নযুক্ত বস্তা নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। বস্তার সঙ্গে খালি পানির বোতল, মবিলের বোতল, কলাগাছ বা অন্য হালকা বস্তু বেঁধে দেওয়া হয়। চালানের বস্তা ও চিহ্নের ছবি বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মোবাইলে পাঠানো হয়। পরে ভাটির দিকে থাকা ব্যক্তিরা নির্দিষ্ট চিহ্ন দেখে চালান সংগ্রহ করেন বলে জানান তিনি।
কটক বাজার-গাজীপুর এলাকার বাসিন্দা সৈয়দ পেয়ার আহমেদ বলেন, পলিথিনের মধ্যে বালু বা পাথর দিয়ে মাদক পানিতে ডুবিয়ে রাখা হয়। সঙ্গে থাকে খালি বোতল বা নির্দিষ্ট সংকেত।
প্রাডোতে ১৫ কোটি টাকার ইয়াবা
মাদক পাচারের বড় চালানের একটি ঘটনা ঘটে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের জাগুরঝুলি এলাকায়। গত ১৯ আগস্ট একটি প্রাডো গাড়ি থেকে প্রায় ১৫ কোটি টাকার তিন লাখ ইয়াবা উদ্ধার করে ডিবি পুলিশ। এ সময় দুজনকে আটক করা হয়।
তবে যে গাড়িতে এতবড় চালান পরিবহন করা হচ্ছিল, সেটির মালিকের সন্ধান তখনো পাওয়া যায়নি। কুমিল্লা ডিবির ওসি শাহ আলম শাহ বলেন, গাড়ির মালিকের সন্ধানে কাজ চলছে। তদন্তের স্বার্থে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া সম্ভব নয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সীমান্ত থেকে মাদক সড়ক, নদী ও রেলপথে দেশের অভ্যন্তরে ঢোকে। এমনকি অ্যাম্বুলেন্সের মতো জরুরি সেবার যানবাহন ব্যবহার করেও মাদক পরিবহনের অভিযোগ রয়েছে।
রাজনৈতিক ছত্রছায়ার অভিযোগ
সীমান্ত এলাকার কয়েকজনের অভিযোগ, মাদক ও চোরাচালানের সঙ্গে জড়িতদের রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সম্পর্ক রয়েছে। কয়েকজন মাদক কারবারির দাবি, আগে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা এই কারবার নিয়ন্ত্রণ করতেন। এখন বিএনপির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু ব্যক্তি প্রভাব বিস্তার করে মাদক নিয়ন্ত্রণ করছেন। তাদের নাম প্রকাশ করলে মাদক দিয়ে আটক করে মামলা দিয়ে হয়রানি করা হয় বলে জানান ওই মাদক কারবারিরা।
কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের সাবেক কাউন্সিলর কাজী গোলাম কিবরিয়া আমার দেশকে বলেন, প্রশাসন ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে কুমিল্লায় মাদক বেড়েছে। তার দাবি, প্রশাসন চাইলে সীমান্ত দিয়ে মাদক প্রবেশ অনেকাংশে বন্ধ করা সম্ভব।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধেও অভিযোগ
কিছু স্থানীয় সূত্র আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু সদস্যের বিরুদ্ধে মাদক কারবারিদের সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগ করেছে। কয়েকজন বিজিবি সদস্য অর্থের বিনিময়ে কারবারিদের তথ্য সরবরাহ করেন—এমন অভিযোগও রয়েছে বলে দাবি তাদের।
গত মাসে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড এলাকায় একটি মাদকের চালান আটকের পর ডিবি পুলিশের বিরুদ্ধে সেটি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। তবে ওই অভিযোগের স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া যায়নি এবং পুলিশের পক্ষ থেকেও তা স্বীকার করা হয়নি।
তিন বছরে প্রায় ৫২ কোটি টাকার মাদক জব্দ
বিজিবির রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম চৌধুরী জানান, কুমিল্লা ১০ ও সুলতানপুর ৬০ বিজিবি ব্যাটালিয়ন গত তিন বছরে প্রায় ২০ হাজার ২০০ অভিযান চালিয়ে প্রায় ৫২ কোটি টাকার মাদক জব্দ করে। এসব অভিযানে ৫২৬ জনকে মাদকসহ হাতেনাতে আটক করা হয় এবং আড়াই শতাধিক আসামি পলাতক রয়েছে।
জব্দ মাদকের মধ্যে রয়েছে—৩৪ হাজার ২৩৫ বোতল ফেনসিডিল, ৩৪ হাজার ১৭২ বোতল স্কাফ সিরাপ, ১৮ হাজার ৪৯ বোতল বিয়ার, ৮৪ হাজার ৯৫৮ বোতল হুইস্কি, ২৩ হাজার ৯৮১ কেজি গাঁজা এবং তিন লাখ ১০ হাজার ৫৯৮টি ইয়াবা। এছাড়া আইপি ইনজেকশন, সেনেগরা, মোসলাইড, সিপ্রোহেপ্টাডিন ও ট্যাপেন্টাডলসহ বিভিন্ন ট্যাবলেটও জব্দ করা হয়েছে।
মাদক শুধু সীমান্তের সমস্যা নয়
মাদক এখন আর শুধু সীমান্তের সমস্যা নয়। মাদককে কেন্দ্র করে কুমিল্লা নগরীতে সহিংসতার অভিযোগ উঠেছে। গত ২৫ জুন কাটাবিল এলাকায় মাদক ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী ইথান আহমেদসহ অন্তত পাঁচজন আহত হয়।
কুমিল্লা পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চলছে। গত ১৮ আগস্ট থেকে পাঁচ শতাধিক মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকসেবীকে আটক করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
সীমান্তে মাদক জব্দের পাশাপাশি চালানের অর্থদাতা, সরবরাহকারী, পরিবহনকারী, স্থানীয় সমন্বয়কারী ও মূল ক্রেতাদের শনাক্ত করা না গেলে মাদকের এই নেটওয়ার্ক ভাঙা কঠিন। সীমান্ত নিরাপত্তার পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরের নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়াই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


