নান্দনিক উপস্থাপনায় সারি সারি প্রাণীর কঙ্কাল চট্টগ্রামে

নান্দনিক উপস্থাপনায় সারি সারি প্রাণীর কঙ্কাল চট্টগ্রামে

প্রবেশপথ পেরোলেই চোখে পড়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল এক জিরাফের কঙ্কাল। কয়েক পা এগোলেই হাতি, উট, কুমির কিংবা অজগরের কঙ্কাল। কোথাও সারি সারি অস্থি, কোথাও আবার কাচের পাত্রে রাসায়নিক দ্রবণে সংরক্ষিত চোখ, হৃৎপিণ্ড, ফুসফুস, কিডনি ও জরায়ুর মতো অঙ্গপ্রত্যঙ্গ। আছে বিভিন্ন প্রাণীর মডেল, ভ্রূণ এবং মাইক্রোস্কোপের স্লাইডও।

প্রথম দেখায় জায়গাটিকে মনে হতে পারে এক অদ্ভুত ‘কঙ্কালপুরী’। কিন্তু একটু গভীরে গেলেই বদলে যায় সেই অনুভূতি। নীরব কঙ্কাল আর সংরক্ষিত অঙ্গগুলো যেন প্রাণীদেহের গঠন, বিবর্তন, জীবনপ্রক্রিয়া ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের নানা অজানা গল্প বলতে শুরু করে।

বিজ্ঞাপন

চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিম্যাল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ে (সিভাসু) গড়ে উঠেছে দেশের প্রথম কঙ্কাল জাদুঘর বা ‘অ্যানাটমি মিউজিয়াম’। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউসুফ চৌধুরী ভবনের নিচতলায় প্রায় ৩,০০০ বর্গফুট জায়গাজুড়ে গড়ে ওঠা এ জাদুঘরের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) উচ্চশিক্ষা ও মানোন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় জাদুঘরটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। এর কার্যক্রম শুরু হয় ২০১১ সালে এবং প্রায় ছয় বছর পর ২০১৭ সালে তা দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়।

জাদুঘরটি প্রতিষ্ঠার সময় সংশ্লিষ্ট বিভাগের প্রধান ও প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন অধ্যাপক মোহাম্মদ লুৎফুর রহমান। বর্তমানে তিনি সিভাসুর উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

জাদুঘরের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ বিশাল আকৃতির জিরাফের কঙ্কাল। দীর্ঘ গলা আর সুউচ্চ অবয়ব নিয়ে প্রবেশমুখেই দাঁড়িয়ে থাকা কঙ্কালটি দর্শনার্থীদের সহজেই থমকে দেয়।

২০১৯ সালে বাংলাদেশ জাতীয় চিড়িয়াখানায় মারা যায় জিরাফটি। প্রায় ছয় মাস মাটিতে পুঁতে রাখার পর এর অস্থিগুলো সংগ্রহ করা হয়। পরে বিশেষ ব্যবস্থায় এসব হাড় চট্টগ্রামে এনে সিভাসুর অ্যানাটমি ও হিস্টোলজি বিভাগে বিভিন্ন রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় পরিষ্কার ও সংরক্ষণ করা হয়।

একেকটি অস্থি সতর্কতার সঙ্গে শনাক্ত করে জোড়া লাগিয়ে জিরাফের পূর্ণাঙ্গ অবয়ব তৈরি করতে সময় লাগে প্রায় দেড় বছর। কঙ্কালটি সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও পুনর্গঠনে ব্যয় হয়েছে প্রায় আড়াই লাখ টাকা।

সিভাসুর সংশ্লিষ্টরা জানান, জিরাফের কঙ্কাল অত্যন্ত দুর্লভ। অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে বিশ্বের আর কোথাও এমন কঙ্কাল থাকার তথ্য খুব সীমিত। ফলে সিভাসুর জাদুঘরে জিরাফের কঙ্কাল যুক্ত হওয়া সংগ্রহশালাটিকে আন্তর্জাতিক মানের একটি বিশেষ আকর্ষণ দিয়েছে।

জিরাফের পাশেই রয়েছে কক্সবাজারের চকরিয়া সাফারি পার্ক থেকে সংগ্রহ করা হাতির কঙ্কাল। ঢাকার জাতীয় চিড়িয়াখানা থেকে আনা হয়েছে উটের কঙ্কাল। সীতাকুণ্ড ইকোপার্কে মৃত অবস্থায় পাওয়া বিশাল অজগর এবং ময়মনসিংহের ভালুকা কুমির প্রজনন কেন্দ্র থেকে সংগ্রহ করা বড় আকৃতির কুমিরের কঙ্কালও দর্শনার্থীদের কৌতূহল বাড়ায়।

এছাড়া জাদুঘরে রয়েছে মানুষের কঙ্কাল, যা ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। চট্টগ্রামের ইউএসটিসি থেকে সংগ্রহ করা একটি মানবশিশুর দেহ ফরমালিনভর্তি বোতলে সংরক্ষণ করা হয়েছে। এসব নমুনা শিক্ষার্থী ও দর্শনার্থীদের শরীরের গঠন, প্রাণীর বৈচিত্র্য এবং জীববিজ্ঞানের নানা বিষয় সম্পর্কে ধারণা দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

কঙ্কাল জাদুঘর হলেও এখানে শুধু অস্থি প্রদর্শন করা হয়নি। বরং প্রাণীদেহের ভেতরের জটিল গঠনকে শিক্ষার্থীদের সামনে তুলে ধরতে সংরক্ষণ করা হয়েছে নানা অঙ্গপ্রত্যঙ্গ।

মানবদেহের বিভিন্ন অঙ্গের পাশাপাশি মানুষের চোখ, হৃৎপিণ্ড, জরায়ু, ফুসফুস, কিডনি ও স্তনের নমুনা রয়েছে। একইভাবে কুকুর, বিড়াল, শূকর, গরু ও মুরগির বিভিন্ন অঙ্গ সংরক্ষণ করা হয়েছে কাচের পাত্রে রাসায়নিক দ্রবণে সংরক্ষিত বিভিন্ন প্রাণীর অঙ্গপ্রত্যঙ্গ। রয়েছে ডিএনএ ও ক্রোমোজমের নমুনাও।

ছাগল, শূকর ও খরগোশের ভ্রূণ ফরমালিনে সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে প্রদর্শনের জন্য। মাইক্রোস্কোপের স্লাইডে দেখা যায় বিভিন্ন প্রাণীর টিস্যু ও কোষের গঠন।

এসব নমুনা শিক্ষার্থীদের কাছে কেবল দেখার বিষয় নয়। শ্রেণিকক্ষের বইয়ে পড়া প্রাণীদেহের গঠন ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে বাস্তবে দেখার সুযোগ করে দেয় এগুলো। কোন অঙ্গ কোথায় অবস্থান করে, তার গঠন কেমন এবং কীভাবে কাজ করে—এসব বিষয়ে হাতে-কলমে ধারণা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে এই জাদুঘরে।

জাদুঘরের আরেকটি আকর্ষণ ‘স্ট্যাফিং’ করা প্রাণী ও পাখি। মোরগ, মুরগি, রাজহাঁস, কবুতর, কাঠঠোকরা, দোয়েল, প্যাঁচা, মাছরাঙা, তিতির, কোয়েল, খরগোশ, গিনিপিগ, কচ্ছপ, অজগর, গোখরা, বাদুড় ও হাঁসসহ বিভিন্ন প্রাণীর স্ট্যাফ এখানে সংরক্ষিত আছে।

স্ট্যাফিং পদ্ধতিতে মৃত প্রাণীর চামড়া ও দেহাবশেষ বিশেষ প্রক্রিয়ায় পরিষ্কার ও সংরক্ষণ করা হয়। এরপর তুলা, রড ও জিআই তার ব্যবহার করে প্রাণীটির স্বাভাবিক আকৃতি তৈরি করা হয়। সবশেষে সেই অবয়বের ওপর চামড়া পরিয়ে দেওয়া হয়। ফলে দূর থেকে মনে হয় প্রাণীটি বুঝি এখনো জীবিত, শুধু স্থির হয়ে আছে।

জাদুঘরের দেয়ালজুড়ে রয়েছে প্রাণীর বিভিন্ন অঙ্গ, দেহতন্ত্র ও শারীরবৃত্তীয় গঠনের চিত্র। পাশাপাশি জীববিজ্ঞান ও প্রাণিবিদ্যায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা বিজ্ঞানীদের প্রতিকৃতিও স্থান পেয়েছে।

সিভাসুর অ্যানাটমি অ্যান্ড হিস্টোলজি বিভাগের শিক্ষক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ লুৎফুর রহমান জাদুঘরটি তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে রয়েছেন।

তিনি বলেন, বিভিন্ন গৃহপালিত ও বন্য প্রাণীর অঙ্গপ্রত্যঙ্গ এখানে সংরক্ষণ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা ব্যবহারিক ক্লাসে হাতে-কলমে শেখার সুযোগ পাচ্ছে। প্রাণীদেহের অঙ্গ ও দেহতন্ত্রের অবস্থান, গঠন, বৈশিষ্ট্য এবং কার্যক্রম সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের ধারণা দেওয়াই জাদুঘর প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য।

তিনি জানান, সর্বশেষ জিরাফের কঙ্কাল যুক্ত হওয়ায় জাদুঘরটি আরো সমৃদ্ধ হয়েছে। দেশের শিক্ষার্থীদের ভেটেরিনারি শিক্ষার প্রতি আগ্রহ তৈরি এবং এই পেশার সম্প্রসারণ ও উন্নয়নে জাদুঘরটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

তিনি বলেন, কঙ্কাল সংগ্রহ দুই ভাবে প্রসেস করা হয়। ছোট প্রাণীর ক্ষেত্রে কেমিক্যাল দিয়ে এবং বড় প্রাণীর ক্ষেত্রে প্রথমে মাটিতে পুঁতে রাখা হয়। দুই-তিন মাস পর মাংসগুলো পচে গেলে কেমিক্যাল দিয়ে প্রসেস করে হাড়গুলো জোড়া লাগানো হয়।

শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য নয়, চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্কুল-কলেজের বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীরাও একাডেমিক শিক্ষার অংশ হিসেবে এই জাদুঘর পরিদর্শন করে থাকে।

জাদুঘরটি সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত সাধারণ দর্শনার্থী ও শিক্ষার্থীদের জন্য খোলা থাকে। ফলে শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষের পড়াশোনার পাশাপাশি এখানে এসে প্রাণীদেহের গঠন ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সরাসরি দেখার সুযোগ পাচ্ছে।

জাদুঘর ঘুরে দর্শনার্থী মো. রাশেদ বলেন, এখানে এসে এত ধরনের প্রাণীর কঙ্কাল ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ একসঙ্গে দেখার সুযোগ পাওয়া সত্যিই অন্যরকম অভিজ্ঞতা।

বিশেষ করে জিরাফের কঙ্কালটি খুবই আকর্ষণীয়। বইয়ে যেসব বিষয় পড়েছি, সেগুলো এখানে বাস্তবে দেখে আরো ভালোভাবে বোঝা যায়।

এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘বইয়ের ছবিতে প্রাণীর হাড় বা অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দেখার চেয়ে জাদুঘরে সরাসরি দেখার অভিজ্ঞতা অনেক বেশি কার্যকর। কোন অঙ্গের গঠন কেমন এবং কোথায় থাকে, তা সহজেই বোঝা যায়। এতে পড়াশোনার বিষয়গুলোও মনে থাকে বেশি।’

সিভাসুর সূত্র জানায়, জাদুঘরে বিভিন্ন প্রাণীর প্রায় ৬০টি কঙ্কাল দক্ষতার সঙ্গে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। এছাড়া এখানে রয়েছে প্রায় ৩০টি স্ট্যাফ (প্রাণীর অস্থি থেকে চামড়া আলাদা করে নতুন অবয়ব সৃষ্টির পর পুনরায় চামড়া দিয়ে মোড়ানো), রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় সংরক্ষিত বিভিন্ন প্রাণীর প্রায় ৫০০টি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, প্রায় ২,০০০ অস্থি, বিভিন্ন প্রাণীর ৭৫টি মডেল এবং শিক্ষার্থীদের পাঠদানের জন্য প্রায় ৩,০০০ স্লাইড।

কঙ্কাল সাধারণত মৃত্যুর প্রতীক। কিন্তু সিভাসুর এই জাদুঘরে এসে সেই ধারণাটিই যেন বদলে যায়। এখানে মৃত প্রাণীর হাড়ে উঠে আসে জীবনের বিজ্ঞান, অঙ্গপ্রত্যঙ্গে ফুটে ওঠে দেহের জটিল কর্মযজ্ঞ, আর মডেল ও স্লাইডে উন্মোচিত হয় প্রাণীকুলের অদৃশ্য জগৎ।

একটি জিরাফের দীর্ঘ গলা, হাতির বিশাল অস্থি, কুমিরের চোয়াল কিংবা অজগরের দীর্ঘ মেরুদণ্ড—প্রতিটি কঙ্কালই প্রাণীর জীবনধারা ও বিবর্তনের আলাদা গল্প বলে। অন্যদিকে সংরক্ষিত হৃৎপিণ্ড, ফুসফুস কিংবা কিডনি মনে করিয়ে দেয় প্রাণীর বেঁচে থাকার পেছনে থাকা জটিল শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ার কথা।

এই অ্যানাটমি মিউজিয়ামে গবেষণা ও ইন্টার্নশিপ করার জন্য দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষার্থী ও গবেষক আসেন। এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক মানের প্রায় ১০টি জার্নাল প্রকাশিত হয়েছে।

তাই সিভাসুর কঙ্কাল জাদুঘর নিছক হাড়সহ অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সংগ্রহশালা নয়। এটি একই সঙ্গে প্রাণিবিজ্ঞান, চিকিৎসাবিজ্ঞান ও ভেটেরিনারি শিক্ষার এক ব্যতিক্রমী শিক্ষা ব্যবস্থা—যেখানে বইয়ের বাইরে এসে হাড়ে হাড়ে শেখা যায় প্রাণীদের জীবনচক্র।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন