চট্টগ্রামে অবৈধ বালু উত্তোলন ও ব্যবসার সঙ্গে নিজ দলের নেতাকর্মীরা জড়িত থাকলেও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে প্রশাসনকে বলেছেন বিএনপির কয়েকজন সংসদ সদস্য। তাদের ভাষ্য, বালু ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বন্দ্বে দলের নেতাকর্মীরাই একের পর এক খুন হচ্ছেন। রাজনৈতিক পরিচয় যেন অপরাধের ঢাল না হয়, সে বিষয়েও প্রশাসনকে কঠোর থাকার তাগিদ দিয়েছেন তারা।
বুধবার চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে অনুষ্ঠিত আইনশৃঙ্খলা সমন্বয় কমিটির সভায় বালু ব্যবসা, মাদক ও অবৈধ অস্ত্র নিয়ে আলোচনা হয়। সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন পানিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি।
সভা সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় অবৈধ বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের তৎপরতার বিষয়টি আলোচনায় আসে। রাজনৈতিক পরিচয়ধারী কেউ এতে জড়িত থাকলেও দলীয় বিবেচনা না করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেন জনপ্রতিনিধিরা।
কয়েকজন বিএনপি নেতা ও সংসদ সদস্য বলেন, নিজেদের দলের নেতাকর্মীরা বালু ব্যবসায় জড়িত থাকলেও তাদের ছাড় দেওয়া উচিত নয়। তাদের ভাষ্য, বালুর নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে সংঘাতের কারণে দলের নেতাকর্মীরাই খুন হচ্ছেন।
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর রাঙ্গুনিয়া ও রাউজানে বালু ব্যবসাকে কেন্দ্র করে অন্তত ২৩টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় নিহতদের বেশির ভাগই স্থানীয় বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বলে সভায় জানানো হয়। এসব হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় শতাধিক মানুষ গ্রেপ্তার এবং অর্ধশতাধিক আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারের তথ্যও তুলে ধরা হয়।
সর্বশেষ গত জুনে রাউজানের পাহাড়তলী বাজার এলাকায় প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক মাকসুদুল হক চৌধুরী মাসুদকে।
পুলিশ তখন হত্যার কারণ তদন্ত করে দেখার কথা জানিয়েছিল। তদন্তের পর পুলিশ সুপার মাসুদ আলম জানান, বালু ব্যবসার দ্বন্দ্বে যুবদলের এই নেতাকে হত্যা করা হয়।
রাঙ্গুনিয়ার সংসদ সদস্য হুম্মাম কাদের চৌধুরীও অভিযোগ করেন, অবৈধ বালু উত্তোলন ও ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি সিন্ডিকেট এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকতে পারে। তার দাবি, মাসুদ অবৈধ বালু উত্তোলন ও ব্যবসার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে।
জানতে চাইলে বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দিন বলেন, মাদক, অস্ত্র ও বালু ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করার প্রস্তাব এসেছে সভায়। অবৈধ বালু উত্তোলনকে শুধু পরিবেশগত সমস্যা হিসেবে না দেখে আইনশৃঙ্খলার দৃষ্টিতেও দেখার প্রয়োজন রয়েছে বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে স্থানীয় পর্যায়ে বিরোধ ও সংঘাত তৈরি হলে তা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর প্রভাব ফেলে। এ কারণে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করতে হবে।
দলীয় পরিচয়ে ছাড় নয়
সভায় রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে অপরাধ করার বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। পানিসম্পদমন্ত্রী এ্যানি প্রশাসনকে দল-মত না দেখে অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেন। বালু ব্যবসার সঙ্গে বিএনপির নেতাকর্মীদের কারও সম্পৃক্ততার প্রসঙ্গ উঠলে কয়েকজন সংসদ সদস্যও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করেন।
জনপ্রতিনিধিদের বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল, অপরাধী যে দলেরই হোক, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে যেন কেউ প্রশাসনিক সুবিধা না পান। একই সঙ্গে বালু ব্যবসাকে কেন্দ্র করে সংঘাত ও হত্যাকাণ্ডের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
চট্টগ্রাম-৭ আসনের সংসদ সদস্য হুম্মাম কাদের চৌধুরী এর আগেও অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে কঠোর অবস্থানের কথা বলেছেন। জাতীয় সংসদে তিনি রাঙ্গুনিয়ার বালুমহাল থেকে পাওয়া রাজস্বের তুলনায় নদীভাঙন ঠেকাতে বেশি অর্থ ব্যয়ের বিষয়টি তুলে ধরেছিলেন। বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে সহিংসতা এবং মাসুদ হত্যার সঙ্গে এর সম্পর্কের কথাও তিনি বলেছিলেন।
মাদক ও অস্ত্র উদ্ধারে জোর
সভায় মাদক নিয়ন্ত্রণেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। শুধু খুচরা বিক্রেতা নয়, মাদকের উৎস, সরবরাহ ও পরিবহন নেটওয়ার্ক শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়। রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী কোনো ব্যক্তি মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকলে তাঁর বিরুদ্ধেও আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান জোরদারের কথাও বলা হয়। অস্ত্রের উৎস, সরবরাহকারী ও ব্যবহারকারীদের শনাক্ত করতে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়।
সভা শেষে মন্ত্রী এ্যানি বলেন, চট্টগ্রাম দেশের গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও অর্থনৈতিক অঞ্চল হওয়ায় এখানকার নিরাপত্তায় আলাদা গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। মাদক ও অস্ত্র উদ্ধারে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট বাহিনীকে দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সন্ত্রাসীদের জামিনে মুক্তির বিষয়েও সরকার কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে বলে জানান তিনি।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা জানান, চলতি বছর রাঙ্গুনিয়ার সব বালুমহালের ইজারা বন্ধ রয়েছে। এরপরও রাতের আঁধারে অবৈধভাবে বালু তোলার চেষ্টা হচ্ছে। অভিযানের খবর পেয়ে অনেক সময় ড্রেজারসহ সরঞ্জাম সরিয়ে নেওয়া হয়।
জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, সীমিত জনবলের কারণে একসঙ্গে সব এলাকায় নজরদারি করা কঠিন। তবে অবৈধ বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে। রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাবশালী ব্যক্তির চাপের কারণে আইন প্রয়োগে শিথিলতা দেখানো হবে না বলেও সভায় গুরুত্ব দেওয়া হয়।
আইনশৃঙ্খলা সমন্বয় সভায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন, বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দিন, জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা, সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী, চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আবদুল কুদ্দুস চৌধুরী ও জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলমসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
এমএইচ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

