সরকারি দপ্তরে ঢুকে হুমকি ও হামলা, আতঙ্কে কর্মকর্তারা

জমির উদ্দিন, চট্টগ্রাম

সরকারি দপ্তরে ঢুকে হুমকি ও হামলা, আতঙ্কে কর্মকর্তারা

নির্বাহী প্রকৌশলীর কক্ষে ঢুকে টেবিলে অস্ত্র রাখা, কার থামিয়ে কাচ ভাঙচুর করে গুলির হুমকি, কিংবা দল বেঁধে কার্যালয় ঘেরাও করে হট্টগোল—গত কয়েক মাসে চট্টগ্রামের সরকারি দপ্তরগুলোতে এমন ঘটনার সংখ্যা বেড়েছে। বিল পরিশোধ ও টেন্ডার নিয়ে বিরোধের জেরে শুরু হওয়া এই চাপে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

তারা বলছেন, এভাবে চলতে থাকলে কাজ করা কঠিন হয়ে যাবে। অন্যদিকে প্রশাসন বলছে, কেউ হামলা বা মবক্রেসির অভিযোগ দিলে ঘটনাস্থলে গিয়ে পুলিশ নিরাপত্তা দিচ্ছে। আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শুধু গত এক বছরে অন্তত ১০টি সরকারি অফিসে হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে পুলিশের কাছে অভিযোগ এসেছে মাত্র পাঁচটি।

বিজ্ঞাপন

গত ২১ জুন স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) চট্টগ্রাম কার্যালয়ে ঠিকাদারদের হামলার অভিযোগ ওঠে। বিল পরিশোধ নিয়ে বিরোধের জেরে রোববার দুপুরে ৩০-৩৫ জন ঠিকাদার ও তাদের সমর্থক কার্যালয়ে গিয়ে হট্টগোল ও ভাঙচুরের চেষ্টা করেন বলে কর্মকর্তারা অভিযোগ করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ঘটনাস্থলে পুলিশ মোতায়েন করা হয়।

এলজিইডির কর্মকর্তাদের দাবি, হামলার আশঙ্কায় চট্টগ্রাম এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আবদুল মতিন ওই দিন কার্যালয়েও আসেননি। এরপর থেকে কার্যালয়ে আতঙ্ক বিরাজ করছে।

গত ১৮ জুন চট্টগ্রাম শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রকৌশলী মো. তানভীর ইসলামের টেবিলে অস্ত্র রেখে হুমকি দেওয়া হয়। মুখোশধারী ১০-১২ জনের সশস্ত্র দল ওই কর্মকর্তার কার্যালয়ে ঢোকে। তাদের মধ্যে চারজন সরাসরি নির্বাহী প্রকৌশলী তানভীর ইসলামের কক্ষে ঢুকে পড়ে। বাকিরা কার্যালয়ের অন্য কক্ষগুলোতে অবস্থান নেয়।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে জানা গেছে, সশস্ত্র দলটি কক্ষে থাকা অন্য ব্যক্তিদের জোর করে বের করে দেওয়ার চেষ্টা করে। এরপর তারা বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদের পরিচয়ে হোয়াটসঅ্যাপ কলে নির্বাহী প্রকৌশলীর সঙ্গে কথা বলায় এবং তার অনুসারীদের কাজ দেওয়ার জন্য চাপ দেয়। কথোপকথনের সময় দুই সন্ত্রাসী টেবিলে দুটি বিদেশি পিস্তল রেখে ভয় দেখানোর চেষ্টা করে। এক সহকারী প্রকৌশলী মোবাইল ফোন বের করতে চাইলে তাকে অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে থামানো হয় বলেও জানা গেছে। তবে এ বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী তানভীর ইসলাম মন্তব্য করতে রাজি হননি।

কাস্টমস কর্মকর্তার গাড়িতে হামলা

একই ধরনের ভীতি প্রদর্শনের ঘটনা ঘটেছে চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের ক্ষেত্রেও। ডবলমুরিং থানার আগ্রাবাদ সিডিএ আবাসিক এলাকায় গত বছরের ৪ ডিসেম্বর সকালে অফিসে যাওয়ার পথে কাস্টমসের রাজস্ব কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান খান ও সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা বদরুল আরেফিন ভূঁইয়ার প্রাইভেটকারের গতিরোধ করে মোটরসাইকেলে আসা তিন ব্যক্তি। তাদের একজনের হাতে থাকা চাপাতি দিয়ে গাড়ির কাচ ভাঙচুর করা হয়। এ সময় গুলি করারও হুমকি দেয় হামলাকারীরা। প্রাণভয়ে দুই কর্মকর্তা গাড়ি থেকে নেমে পাশের একটি গলিতে আশ্রয় নিয়ে রক্ষা পান।

কাস্টমস সূত্রের ভাষ্য, আমদানি-নিষিদ্ধ পপি বীজ ও ঘন চিনিভর্তি কনটেইনার জব্দ করা এবং প্রসাধনী আমদানির আড়ালে গড়ে ওঠা একটি জালিয়াতি সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়ার জের ধরেই এই হামলা হয়। ভুক্তভোগী কর্মকর্তা জানান, নিয়মিত অনিয়ম ধরে মামলা করার কারণে তারা আগে থেকেই বিভিন্ন সময় ফোনে হুমকি পেয়েছিলেন। ঘটনার পর পুলিশ তদন্তে নেমে এ সংক্রান্ত মামলায় দুজনকে গ্রেপ্তার করে।

এছাড়া গত ৪ জানুয়ারি চট্টগ্রামের কালুরঘাটে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) অফিসে অস্ত্র দেখিয়ে হুমকির অভিযোগে আলমগীর হোসেন নামে এক ঠিকাদারকে গ্রেপ্তার করে সেনাবাহিনী। এর ঠিক দুদিন আগে কালুরঘাটের বিএডিসি অফিসে সন্ত্রাসী আলমগীর হোসেনের নেতৃত্বে ৯ জনের একটি দল অস্ত্রসহ প্রবেশ করে। পরে তারা নির্বাহী কর্মকর্তা নুরুল ইসলামকে খুঁজতে গিয়ে তাকে না পেয়ে অফিস স্টাফদের গায়ে হাত তোলে এবং হত্যার হুমকি দেয়।

একই উদ্দেশ্যে ষোলশহরের বিএডিসি অফিসে ঢুকে রিয়াজ মাহমুদ নামে এক কর্মচারীকে মারধর করা হয়। একপর্যায়ে সহকারী প্রকৌশলী তমাল দাস পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করলে কম্পিউটার অপারেটর ফাহিমকে ঠিকাদার আলমগীর হোসেন শার্টের নিচে রাখা অস্ত্র দেখিয়ে ভয়ভীতি দেখায়।

গত ১০ জুন আগ্রাবাদ বিদ্যুৎ ভবনে সিবিএ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে প্রকৌশলী ও কর্মকর্তাদের ওপর হামলা, হেনস্তা এবং তাণ্ডব চালানোর অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।

অভিযোগ অনুযায়ী, ১০ জুন দুপুর ১টা ৪০ মিনিট থেকে দুটা ২০ মিনিট পর্যন্ত নির্বাহী প্রকৌশলী নিলুফা ইয়াসমিনের কার্যালয়ে এ ঘটনা ঘটে। ওই সময় সিবিএর বর্তমান ও সাবেক নেতাসহ ২০-২৫ জনের একটি দল কার্যালয়ে ঢুকে হট্টগোল, বাকবিতণ্ডা ও মারধরের ঘটনা ঘটায়। পুরো ঘটনায় নেতৃত্ব দেন সম্প্রতি অবসরে যাওয়া সিবিএ নেতা গাজী মো. আইয়ুব।

এর আগে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনেও (চসিক) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ তৌহিদুল ইসলামের অপসারণ দাবিতে চসিক কর্মচারী ইউনিয়ন কার্যালয় ঘেরাও করে বিক্ষোভ সমাবেশ করে। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ ছিল কমিশন বাণিজ্য, অবৈধ সম্পদ অর্জন ও ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে।

কঠোর হাতে দমনের আহ্বান

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সম্পাদক আইনজীবী আখতার কবির চৌধুরী জানান, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে এই ধরনের চাপ ও সশস্ত্র ভীতি প্রদর্শন অব্যাহত থাকলে তা সরকারি কাজের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করতে পারে এবং নিয়মতান্ত্রিক প্রশাসনিক সংস্কৃতির বদলে বল-প্রয়োগের সংস্কৃতি জায়গা করে নিতে পারে।

চট্টগ্রাম এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আবদুল মতিন বলেন, সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে যদি এভাবে হেনস্তার শিকার হতে হয়, তাহলে দায়িত্ব পালন করা কঠিন হয়ে পড়ে। সরকার নিজেই বলছে, কাজ সম্পন্ন না হলে বিল দেওয়া যাবে না। আমরা সেই নির্দেশনাই অনুসরণ করছি। কিন্তু এজন্য যদি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভয়ভীতি ও চাপের মুখে পড়তে হয়, তাহলে সরকারি কাজ বাধাগ্রস্ত হবে।

নগর পুলিশের সহকারী কমিশনার আমিনুর রশিদ বলেন, কয়েকটি সরকারি অফিসে অবরোধ করে চাপ সৃষ্টির ঘটনা ঘটেছে। আমরা যখনই খবর পেয়েছি, পুলিশ পাঠিয়ে ব্যবস্থা নিয়েছি। থানায় সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দিলে আইনগত ব্যবস্থা নিচ্ছি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন