ফেরদৌস ট্র্যাজেডি: হুমকিতে জাহাজভাঙা শিল্প

ফেরদৌস ট্র্যাজেডি: হুমকিতে জাহাজভাঙা শিল্প

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ভাটিয়ারীতে ‘ফেরদৌস শিপইয়ার্ডে’ বিষাক্ত হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে ১০ শ্রমিকের প্রাণহানির পর জাহাজভাঙা শিল্পকে একটি বড় ধরনের বহুমুখী সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

মূলত আন্তর্জাতিক চাপ, আইনি জটিলতা, অর্থনৈতিক ক্ষতি ও ভাবমূর্তি সংকটের কারণে এই শিল্পটি বর্তমানে হুমকির মুখে পড়েছে।

জানা গেছে, আন্তর্জাতিক ও গ্রিন শিপইয়ার্ড সনদের চাপ অর্থাৎ আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা ও হংকং কনভেনশন বাস্তবায়নের বাধ্যবাধকতা বাড়ছে। এই কনভেনশন অনুযায়ী জাহাজ ভাঙার ক্ষেত্রে কঠোর পরিবেশগত ও শ্রমিক নিরাপত্তা মানদণ্ড মানতে হয়। ফেরদৌস শিপইয়ার্ডে গ্যাস শনাক্তকরণ ও ভেন্টিলেশনের মতো প্রাথমিক সুরক্ষার অভাবে ১০ জনের প্রাণহানি প্রমাণ করে যে অনেক ইয়ার্ড এখনো সেফটি স্ট্যান্ডার্ডে পিছিয়ে। এর ফলে আন্তর্জাতিক জাহাজ মালিকরা বাংলাদেশে পুরোনো জাহাজ পাঠাতে নিরুৎসাহিত হতে পারেন।

দেশে তৈরি পোশাক খাতের পর জাহাজ ভাঙা শিল্প নিয়েও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও শ্রমিক অধিকার সংস্থা শিপব্রেকিং প্লাটফর্ম প্রতিনিয়ত নজরদারি চালায়। একের পর এক প্রাণঘাতী দুর্ঘটনায় বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশের জাহাজ ভাঙা খাতের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ হয়। বিদেশি শিপিং কোম্পানিগুলো ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশের অজুহাতে ভারত বা তুরস্কে জাহাজ পাঠাতে আগ্রহী হয়ে ওঠে।

করে চরম সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় শ্রমিক নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠলেও শিল্পসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন—একক কোনো দুর্ঘটনার কারণে পুরো শিল্প বন্ধ না করে, কোথায় নিরাপত্তার ঘাটতি ছিল তা চিহ্নিত করে দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।

গত ১৪ আগস্ট ‘এমটি রাশি’ নামক একটি জাহাজের ব্যালাস্ট ট্যাংকে কাজ করার সময় বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হন বেশ কয়েকজন শ্রমিক। পরবর্তীতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও একজনের মৃত্যু হলে মোট প্রাণহানি দাঁড়ায় ১০ জনে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ট্যাংকের তলানিতে জমা পানিতে দ্রবীভূত হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাস পানি নিষ্কাশনের সময় বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ে এই বিপত্তি ঘটায়। এ অবস্থায় ট্যাংকে প্রবেশের আগে সঠিক গ্যাস পরীক্ষা, গ্যাসমুক্তকরণ, পর্যাপ্ত ভেন্টিলেশন ও জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা যথাযথ ছিল কি না—তদন্ত সাপেক্ষে তা স্পষ্ট করার দাবি উঠে এসেছে।

বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আসলাম চৌধুরী (এফসিএ) বলেন, শ্রমিক বাঁচলেই শিল্প বাঁচবে। শ্রমিকের জীবন রক্ষা করেই এ শিল্পকে এগিয়ে নিতে হবে। ফেরদৌসের ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে শিপইয়ার্ড মালিকদের সঙ্গে সমন্বয় করে আরো নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

জনতা শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডের মালিক কামাল উদ্দিন এবং শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইকেলিং অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি আমজাদ হোসেন চৌধুরী জানান, এই দুর্ঘটনা পুরো খাতের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। তবে শিল্প বন্ধ করা সমাধান নয় বরং আধুনিক গ্যাস ডিটেকটর, মানসম্মত সুরক্ষা সরঞ্জাম, পর্যাপ্ত ভেন্টিলেশন ও জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা নিশ্চিত করে নিরাপত্তাব্যবস্থার উন্নয়ন করাই এখন প্রধান কাজ।

এসএল স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডের মালিক লোকমান বলেন, তদন্তে কারও গাফিলতি প্রমাণিত হলে রাষ্ট্রীয় আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হোক। তবে অযথা উদ্যোক্তাদের হয়রানি করা হলে নতুন বিনিয়োগকারীরা এ শিল্পে আসতে নিরুৎসাহিত হবেন।

বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টদের মতে, সীতাকুণ্ডের এই জাহাজ ভাঙা শিল্প দেশের রড, স্টিল, রি-রোলিং ও নির্মাণ খাতের প্রধান কাঁচামাল সরবরাহ করে থাকে। এর সঙ্গে পরিবহন, স্ক্র্যাপ ব্যবসা ও বিপণনসহ বিস্তৃত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে বিপুল মানুষের কর্মসংস্থান ও সরকারি রাজস্ব জড়িত। তাই ফেরদৌস ট্র্যাজেডিকে খাতটি বন্ধ করার কারণ না বানিয়ে—কঠোর নিরাপত্তা অডিট, বাধ্যতামূলক গ্যাস টেস্ট এবং আধুনিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে একটি নিরাপদ ও টেকসই শিল্প গড়ার সুযোগ হিসেবে নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

জেডএম

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন