জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর হতে চলল। গত ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের মাধ্যমে বিদায় নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার সময়ও প্রায় চার মাস হতে চলল। অথচ এখনো দেশে বিচার বিভাগের সরকারি একমাত্র ওয়েবসাইটে চট্টগ্রামের সেগমেন্টে (বিভাগে) আওয়ামীপন্থি আইনজীবীদের নাম শোভা পাচ্ছে। যাদের অনেকেই পদধারী আওয়ামী লীগ নেতা ও জুলাইয়ে ছাত্র-জনতা হত্যা মামলার আসামি।
শুধু তাই নয়, বিচারক ও সরকারি অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীর নামও নিয়মিত হালনাগাদ করা হচ্ছে না ওয়েবসাইটটিতে। এতে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে বর্তমান পিপি, জিপি, অতিরিক্ত পিপি, অতিরিক্ত জিপিদের মধ্যে। তারা বলছেন, ছাত্র-জনতার আন্দোলনে বিরোধিতা করা অনেক আইনজীবীর নাম এখনো রয়ে গেছে সরকারি ওয়েবসাইটে। এটি একদিকে যেমন আমাদের ভাবমূর্তি সংকটে ফেলছে, অন্যদিকে ব্যর্থতাও প্রকাশ পাচ্ছে। যারা বিভিন্ন মামলার আসামি তারা দায়িত্বে না থাকলেও সরকারি ওয়েবসাইটে তাদের স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে।
‘জুডিশিয়ারি গভ ডট বিডি’ নামে ওয়েবসাইটটিতে সরকারি আইনজীবী বাতায়নে ক্লিক করলে প্রত্যেক জেলার নামে আলাদা ইউআরএল ওপেন হয়। সেখানে সরকারি আইন কর্মকর্তাদের নাম, পদবী ও মোবাইল নম্বর উল্লেখ থাকে। তবে চট্টগ্রাম অপশনে এখনো আওয়ামী লীগের আইনজীবীদের নাম বহাল রয়েছে।
ওয়েবসাইটে সবার শীর্ষে নাম থাকা আইনজীবী ইফতেখার সাইমুল চৌধুরী। তাকে জেলা পিপি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ ২০২৪ সালের ১৬ অক্টোবর তিনিসহ চট্টগ্রামের ৩৫১ জন সরকারি আইনজীবীর নিয়োগ বাতিল করা হয়েছে। ওই সময় নতুন দায়িত্ব পান অ্যাডভোকেট আশরাফ হোসেন চৌধুরী রাজ্জাক।
ইফতেখার সাইমুল চৌধুরীকে ২০২২ সালের ৩০ জুন আওয়ামী লীগ সরকার নিয়োগ দেয়। তিনি চট্টগ্রামের মহানগর আওয়ামী লীগের আইনবিষয়ক সম্পাদক। বর্তমানে তিনি আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের জামিনে কাজ করছেন বলে জানা গেছে।
এছাড়াও ওয়েবসাইটে জেলা জিপি হিসেবে নাজমুল হাসান আলমগীরের নাম রয়েছে। তিনি কর্ণফুলী উপজেলা আওয়ামী লীগের আইন সম্পাদক। অথচ বর্তমানে জেলা জিপি আবুল কাশেম চৌধুরী।
ওয়েবসাইটে প্রথম অতিরিক্ত পিপিদের তালিকায় রয়েছেন— ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় সদস্য অ্যাড. আজহারুল ইসলাম, উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের আইন সম্পাদক ভবতোষ নাথ, আওয়ামী লীগ নেত্রী দিল মনি দে, তপন কুমার দাশ, ইকবাল হোসেন, রাশেদুল ইসলাম রাশেদ। দ্বিতীয় অতিরিক্ত পিপি পাল চন্দ্র চৌধুরী, সমীর দাশ গুপ্ত, এ এফ এম সাইফুল্লাহ চৌধুরী, পিটু কুমার শীল, দিদারে আলম, মোহাম্মদ মহসীনের নামও। তারা সবাই আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা। সব মিলিয়ে ওয়েবসাইটে ১৩১ জনের নাম রয়েছে যারা প্রত্যেকে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের নেতা।
শুধু আইনজীবী নয় বিচারকদের নামও নিয়মিত হালনাগাদ করা হচ্ছে না ওয়েবসাইটটিতে। অথচ ২০২৪ সালের ১৬ অক্টোবর আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আইন এবং বিচার বিভাগের সলিসিটর উইং থেকে একটি নিয়োগ আদেশ জারি করা হয়। ওই আদেশে চট্টগ্রামের আদালতগুলোতে ৩৪৬ জনকে নিয়োগ দেওয়া হলেও তাদের অধিকাংশের নাম সরকারি ওয়েবসাইটে নেই।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পরও সরকারি ওয়েবসাইটে আওয়ামী লীগের আইনজীবীদের নাম থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিএনপি ও জামায়াতপন্থি আইনজীবীরা।
অতিরিক্ত জেলা পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট মো. সরোয়ার হোসাইন লাভলু বলেন, আওয়ামী লীগের পতন হয়েছে দীর্ঘ ২০ মাস আগে। ২০২৪ সালের ১৬ অক্টোবর অন্তর্বর্তী সরকারের আইন বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে চট্টগ্রামের বিভিন্ন আদালতে প্রায় ৩৫৭ জন পিপি ও জিপি, অতিরিক্ত পিপি এপিপি অতিরিক্ত জিপি ও বিশেষ পিপি নিয়োগ করা হয়। দীর্ঘদিন অতিবাহিত হলেও ওয়েবসাইটে তা হালনাগাদ না হওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক। এতে মানুষ নানাভাবে বিভ্রান্ত হচ্ছে। তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের কোনো গাফিলতি আছে কিনা খতিয়ে দেখা দরকার।
এ বিষয়ে দুদকের পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট রেজাউল করিম রনি বলেন, সরকারি ওয়েবসাইটে আওয়ামী লীগের নেতাদের নাম থাকা হতাশাজনক। কারা এই ওয়েবসাইটগুলো পরিচালনা করছেন, তারা ফ্যাসিস্ট কিনা সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার। একটি ওয়েবসাইটে নাম পরিবর্তন করা খুব বেশি সময়ের প্রয়োজন হয় না।
জেলা পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট আশরাফ হোসেন চৌধুরী রাজ্জাক বলেন, বিষয়টি আমার জানা নেই। আমাদের নিয়োগের এতদিন পরও নাম ওয়েবসাইটে না থাকা দুঃখজনক। কেন এমন হলো বিষয়টি খতিয়ে দেখব।
চট্টগ্রাম আদালতে কর্মরত একজন অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক নাম প্রকাশ না করে বলেন, ওয়েবসাইটগুলো সরাসরি বিচার বিভাগ থেকে পরিচালিত হয়। আমাদের হাতে কোন আইডি পাসওয়ার্ড দেওয়া হয় না। এ কারণে অনেকে দায়িত্ব শেষ করার পরও নাম পরিবর্তন হয় না।
চট্টগ্রাম মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের অফিস সহকারী মোহাম্মদ মুরাদ জানান, মহানগর আদালতের পিপি, এপিপিদের নাম হালনাগাদ আছে। ওয়েবসাইটটি আমাদের হাতে নেই। এ বিষয়ে আমার জানা নেই।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


কুমিল্লায় বাহার নেই, তবে ঠিকই চলছে তার রাজত্ব