ক্যান্সারের বিরুদ্ধে নিজের জীবনযুদ্ধ চালাতে গিয়ে চিকিৎসার খরচ জোগাতে বিক্রি করতে হয়েছিল পরিবারের একমাত্র পৈতৃক বাড়ি। হাসপাতালের শয্যায় শুয়ে তখন তরুণ প্রবাসী মুজাহিদুল ইসলাম মুনির উপলব্ধি করেছিলেন, অর্থের অভাবে চিকিৎসা না পাওয়ার কষ্ট কতটা নির্মম। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন, সুস্থ হয়ে ফিরতে পারলে অসহায় মানুষের জন্য গড়ে তুলবেন একটি বিনামূল্যের চিকিৎসাসেবা কেন্দ্র। কিন্তু ২০১৯ সালের ২৯ জুলাই ক্যান্সারের কাছে হার মানেন তিনি। মৃত্যুর পরও থেমে যায়নি তার সেই স্বপ্ন। পরিবার, বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত ‘মুনির ফাউন্ডেশন’ গত সাত বছর ধরে অসহায় মানুষের চিকিৎসাসেবায় কাজ করে যাচ্ছে।
প্রতিষ্ঠার সপ্তম বর্ষপূর্তি উপলক্ষে শুক্রবার (৩১ জুলাই) সীতাকুণ্ড পৌর সদরের সিকিউর সিটির নিচতলায় দিনব্যাপী বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা ও ওষুধ বিতরণ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। সকাল ১০টা থেকে শুরু হওয়া এ চিকিৎসা ক্যাম্পে মেডিসিন, গাইনি, শিশুরোগ, দন্ত ও চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা উপজেলার বিভিন্ন প্রত্যন্ত এলাকা থেকে আসা রোগীদের চিকিৎসাসেবা প্রদান করেন।
আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, এদিন প্রায় ২৫০ জন রোগী বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করেন। চিকিৎসকদের ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী তাদের মধ্যে প্রায় এক লাখ টাকা মূল্যের ওষুধ বিতরণ করা হয়।
চিকিৎসাসেবা নিতে আসা সৈয়দপুরের বাকখালী এলাকার আতর আলী বলেন, আমরা গরিব মানুষ। টাকা দিয়ে ডাক্তার দেখানো সম্ভব হয় না। এখানে বিনা খরচে চিকিৎসা ও ওষুধ পেয়েছি। এটি আমাদের মতো মানুষের জন্য অনেক বড় সহায়তা।
একইভাবে আকিলপুরের রহিমা বেগম, গুলিয়াখালীর শিশু নঈমসহ বিভিন্ন এলাকার শত শত মানুষ এই চিকিৎসা ক্যাম্প থেকে চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করেন। অনেকের মতে, এমন উদ্যোগ শুধু চিকিৎসা নয়, অসহায় মানুষের মনে নতুন করে বেঁচে থাকার আশা জাগায়।
জানা যায়, সীতাকুণ্ড উপজেলার মুরাদপুর দোয়াজিপাড়া গ্রামের বাসিন্দা মুজাহিদুল ইসলাম মুনির প্রবাসে কর্মরত অবস্থায় ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। দীর্ঘ চিকিৎসায় পরিবার চরম আর্থিক সংকটে পড়ে। চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে গিয়ে বিক্রি করতে হয় পরিবারের একমাত্র পৈতৃক বাড়িটিও। জীবনের শেষ সময়ে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে তিনি দেখেছিলেন, অর্থের অভাবে কত মানুষ চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। সেই অভিজ্ঞতাই তাকে অসহায় মানুষের জন্য কিছু করার স্বপ্ন দেখায়।
মুনিরের মৃত্যুর পর তার পরিবার, বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেন। তাদের হাত ধরেই প্রতিষ্ঠিত হয় ‘মুনির ফাউন্ডেশন’। প্রতিষ্ঠার পর থেকে সংগঠনটি ক্যান্সার রোগীসহ বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত অসহায় মানুষের চিকিৎসা, ওষুধ, আর্থিক সহায়তা এবং নিয়মিত বিনামূল্যে চিকিৎসা ক্যাম্প পরিচালনা করে আসছে।
ফাউন্ডেশনের পরিচালক আব্দুল গনি জানান, ব্যক্তি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অনুদানে পরিচালিত এ সংগঠনটি গত সাত বছরে ক্যান্সার রোগীসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত অসহায় মানুষের চিকিৎসা, ওষুধ ও মানবিক সহায়তায় অন্তত এক কোটি টাকা ব্যয় করেছে।
তিনি বলেন, মুনিরের স্বপ্ন ছিল অসহায় মানুষের চিকিৎসার কষ্ট কিছুটা হলেও লাঘব করা। আমরা সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের চেষ্টা করছি। সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এগিয়ে এলে আরও অনেক মানুষের পাশে দাঁড়ানো সম্ভব হবে।
চিকিৎসা ক্যাম্প শেষে বিকেল ৩টায় ফাউন্ডেশনের সপ্তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। এতে সংগঠনের সভাপতি শরিফুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক করিমুল ইসলাম, পরিচালক আব্দুল গনি এবং সংগঠনের সদস্য ও স্বেচ্ছাসেবীরা উপস্থিত ছিলেন।
মুজাহিদুল ইসলাম মুনির আজ আর বেঁচে নেই। কিন্তু তার দেখা স্বপ্ন আজও বেঁচে আছে অসহায় মানুষের মুখের হাসিতে। যে মানুষটি জীবনের শেষ দিনগুলোতে চিকিৎসার অসহায়ত্ব দেখেছিলেন, তার নামেই গড়ে ওঠা একটি সংগঠন আজ সেই অসহায় মানুষের চিকিৎসার ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মৃত্যুর পরও তাই মুনিরের স্বপ্ন বেঁচে আছে মানুষের সেবায়, মানবতার নীরব এক আলোকবর্তিকা হয়ে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

