কোমরসমান পানি পেরিয়ে সন্তান বাঁচল, হারিয়ে গেল মা

বাঁশখালীর বন্যায় জন্মের আনন্দ ছাপিয়ে মৃত্যুর কান্না

জমির উদ্দিন, বাঁশখালী (চট্টগ্রাম) থেকে

বাঁশখালীর বন্যায় জন্মের আনন্দ ছাপিয়ে মৃত্যুর কান্না

এগারো মাস আগেও এই বাড়িতে ছিল নতুন সংসারের স্বপ্ন। এসএসসি পাশ করে বিচারক হওয়ার স্বপ্নও বুকে লালন করতেন যে মেয়েটি, বিয়ের পর সেই স্বপ্নের পাশাপাশি তিনি লালন করছিলেন আরেকটি নতুন প্রাণ। কিন্তু সেই সন্তানকে পৃথিবীর মুখ দেখানোর মূল্য চোকাতে হলো নিজের জীবন দিয়ে। সাদিয়া সোলতানা রিজা। সতেরো বছর বয়সী এই কিশোরী—সন্তান জন্ম দিয়েই চলে গেলেন না-ফেরার দেশে।

বাঁশখালীর গুনাগরী ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের বক্সির হামিদের বাড়িতে এখন আর কোনো আনন্দ নেই। টিনশেডের বাড়িটির দেয়ালে এখনও লেগে আছে বন্যার কাদার দাগ, আঙিনার একাংশ ধসে পড়েছে, চারদিকে ছড়িয়ে আছে পানির ধ্বংসচিহ্ন। কিন্তু সেই ভৌত ক্ষতির চেয়েও গভীর এক ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছে এই পরিবার—যা সহজে শুকাবার নয়।

বিজ্ঞাপন

মঙ্গলবার সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, ঘরের এক কোণে বসে অঝোরে কাঁদছেন মা খালেদা বেগম। পাশে নির্বাক হয়ে বসে আছেন বাবা রেজাউল করিম মমতাজ। কথা বলতে গিয়ে বারবার থেমে যাচ্ছেন, চোখের পানি মুছতে মুছতে শুধু একটি কথাই বারবার উচ্চারণ করছেন, ‘আমার আদরের মেয়েটারে বাঁচাইতে পারলাম না।’

পাঁচ কিলোমিটার কোলে করে, কোথাও কোমর পানি, কোথাও সাঁতরে

গত ১০ জুলাই ভোররাতে প্রসববেদনা শুরু হয় সাদিয়ার। তখন পুরো এলাকা কোমরসমান পানিতে তলিয়ে গেছে। বাড়ির সামনে দিয়ে কোনো যানবাহন চলাচলের সুযোগ ছিল না—চারদিকে শুধু ঘোলাটে বন্যার পানি।

মেয়ের কষ্ট দেখে মরিয়া হয়ে ওঠেন মা-বাবা। বাবা রেজাউল করিম মমতাজ মেয়েকে কোলে তুলে নিয়ে বাড়ি থেকে বের হন। এরপর শুরু হয় জীবন-মৃত্যুর এক লড়াই। প্রায় পাঁচ কিলোমিটার পথ তাঁকে কোলে নিয়েই হাঁটতে হয়েছে গুনাগরী বাজার পর্যন্ত। কোথাও পানি কোমর সমান, কোথাও বুক সমান। কয়েক জায়গায় সাঁতার কেটেও পার হতে হয়েছে বাবাকে, মেয়েকে বুকে চেপে ধরে।

কোনোভাবে গুনাগরী বাজারে পৌঁছানোর পর সেখান থেকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয় সাদিয়াকে। সেখানেই জন্ম হয় একটি ফুটফুটে পুত্রসন্তানের। কিন্তু সন্তানকে পৃথিবীতে রেখে নিজের আর ফেরা হলো না ওই কিশোরীর। বেঁচে রইল শুধু নবজাতকটি, এখন সে আছে আত্মীয়স্বজনের কোলে—মায়ের মুখ না দেখেই যার জীবন শুরু হলো।

বিচারক হওয়ার স্বপ্ন যেখানে থেমে গেল

পরিবারের তিন সন্তানের মধ্যে বড় ছিলেন সাদিয়া। ২০২৪ সালে বাঁশখালী কামাল উদ্দিন চৌধুরী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় ভালো ফল করেছিলেন তিনি। পড়াশোনায় ভালো, স্বপ্ন দেখতেন বিচারক হওয়ার।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে মা খালেদা বেগম বলেন, মাইয়াডার খুব শখ আছিল বিচারক হইবো। পড়ালেখা খুব পছন্দ করতো। কিন্তু ১১ মাস আগে বিয়া দিলাম। ভাবছিলাম সংসারও করবো, লেখাপড়াও করবো। আল্লাহ আর সুযোগ দিল না।

বাবা রেজাউল করিম মমতাজের কণ্ঠেও একই আক্ষেপ, যদি রাস্তাঘাট ঠিক থাকতো, যদি এত পানি না হইত, সময়মতো হাসপাতালে নিতে পারতাম। আমার মাইয়াডা হয়তো আজও বাঁচত।

পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, সাদিয়ার স্বামীও বন্যার কারণে সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছাতে পারেননি। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় চিকিৎসা পেতে যে দেরি হয়েছে, সেটাই কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে দাবি পরিবারের।

তিন কিলোমিটার দূরে আরেক গল্প—মা ও মেয়ে দুজনই বেঁচে ফিরেছেন

সাদিয়াদের বাড়ি থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে গুনাগরী ইউনিয়নেরই দত্তপাড়া। সেখানেও ১০ জুলাই শুরু হয়েছিল আরেকটি লড়াই, তবে এবারের গল্পটা ভিন্ন। প্রসববেদনায় কাতর ছিলেন রিমা মল্লিক। চারদিকে তখন থইথই পানি। তবু পরিবারের সদস্যরা হাল ছাড়েননি—পানি ভেঙে তাঁকে নিয়ে যান চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে জন্ম হয় একটি সুস্থ কন্যাশিশুর। মা ও মেয়ে দুজনই সুস্থ আছেন।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ছোট্ট মেয়েটিকে কোলে নিয়ে আদর করছেন রিমা। মুখে তখনও রয়ে গেছে দুঃসহ সেই রাতের স্মৃতি। তিনি বলেন, মনে হইছিল হাসপাতালে পৌঁছাইতে পারুম না। চারদিকে শুধু পানি। আল্লাহর রহমতে আমি আর আমার মাইয়া দুইজনই বাঁচছি।'

স্বামী টিকলু মল্লিকের কণ্ঠেও তখনকার আতঙ্কের রেশ, যেই সময় বউরে লইয়া গেছি, মনে হইছিল জানি ফিরতে পারুম কি না। পানির মধ্যে মানুষজন মিলে অনেক কষ্ট কইরা হাসপাতালে পৌঁছাইছি।

প্রতিবন্ধী ছেলেকে নিয়ে তিন দিন সড়কে

গুনাগরীর পাশেই লাবুর দোকান এলাকা। সেখান থেকে একটি ছোট ছড়া পেরিয়ে সাঁকো দিয়ে যেতে হয় লুতুজ বেগমের বাড়িতে। বন্যার পানিতে সেই সাঁকোও তলিয়ে গিয়েছিল।

লুতুজ বেগমের ছেলে হামিদ হোসাইন নাইম হাঁটতে পারেন না, নিজে ঠিকমতো বসতেও পারেন না। বন্যার পানি বাড়তে শুরু করলে ছেলেকে কোলে নিয়ে কোনোভাবে মূল সড়কে উঠে আসেন এই মা। এরপর সেই রাস্তাতেই কাটাতে হয় টানা তিন দিন—রাস্তাই হয়ে ওঠে তাঁদের সাময়িক আশ্রয়।

লুতুজ বেগমের আরেক ছেলে সাইফুল ইসলাম সাইমও ছিলেন প্রতিবন্ধী, গত বছরের আগস্টে তিনি মারা গেছেন। এখন ছোট মেয়ে আর একমাত্র প্রতিবন্ধী ছেলেকে নিয়েই চলছে তার জীবনযুদ্ধ।

চোখের পানি মুছতে মুছতে লুতুজ বেগম বলেন, পানির মধ্যে ঘরে থাকতে পারি নাই। এই ছেলেডারে লইয়া কী করমু বুঝি নাই। তিন দিন রাস্তার ওপর আছিলাম। কেউ একটু সাহায্য করছে, কেউ খাবার দিছে। আল্লাহ ছাড়া আর কেউ নাই।

তিনি আরও বলেন, এই ছেলেডারে কোলে না নিলে চলতে পারে না। পানি আইলে আমরা আগে কোথায় যামু?

কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে গুনাগরী ইউনিয়নে ঘটে গেছে তিনটি ভিন্ন গল্প। একটি ঘরে জন্মের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে মৃত্যু। আরেকটি ঘরে মৃত্যুর শঙ্কাকে হারিয়ে এসেছে নতুন প্রাণ। আর একটি ঘরে প্রতিবন্ধী সন্তানকে বাঁচাতে চলছে এক মায়ের নির্ঘুম, নিরন্তর সংগ্রাম।

বন্যার সরকারি পরিসংখ্যান হয়তো বলবে কত মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে, কতগুলো ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কত মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়ে উঠেছে। কিন্তু গুনাগরীর মানুষের কাছে এবারের বন্যা মানে, কোলে করে পাঁচ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেওয়া এক বাবার অসহায়ত্ব। বিচারক হওয়ার স্বপ্ন দেখা এক কিশোরীর অপূর্ণ জীবন। পানির মধ্যে জন্ম নেওয়া এক নবজাতকের প্রথম কান্না।

আর প্রতিবন্ধী সন্তানকে বুকে আগলে তিন রাত রাস্তার ওপর কাটানো এক মায়ের নীরব সংগ্রাম। বাঁশখালীর মানুষ হয়তো একদিন এই বন্যার পানি ভুলে যাবে। কিন্তু সাদিয়া সোলতানা রিজার পরিবারের কাছে ১০ জুলাই চিরকাল থেকে যাবে সেই দিন হিসেবে, যেদিন একটি শিশুর জন্ম হয়েছিল, আর একটি মায়ের জীবন থেমে গিয়েছিল।

এমএইচ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন