আধঘণ্টা ধরে একটি প্রাইভেটকারকে ধাওয়া করছিল কয়েকটি মোটরসাইকেল। প্রায় দুই কিলোমিটার ধাওয়ার পর বাকলিয়া এক্সেস রোডে গাড়িটি থামিয়ে গুলি করে চলে যায় হামলাকারীরা। ঘটনাস্থলের কাছাকাছিই ছিল পুলিশের টহল গাড়ি, কিন্তু হামলা ঠেকাতে পুলিশ এগিয়ে যায়নি। হামলাকারীরা চলে যাওয়ার পরই শুরু হয় পুলিশের তৎপরতা।
ঘটনাটি ২০২৫ সালের ২৯ মার্চ দিবাগত রাতের। ওই হামলায় দুজন নিহত হন। পরে পুলিশ মামলা করে, তদন্ত করে, সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে এবং আসামিদের গ্রেপ্তার করে। কিন্তু হত্যাকাণ্ডের আগে যে আধঘণ্টা ধরে গাড়িটিকে ধাওয়া করে গুলি করা হচ্ছিল, সেই সময় পুলিশের প্রতিরোধ কোথায় ছিল—এই প্রশ্নের উত্তর মেলেনি।
চট্টগ্রাম নগর ও জেলায় গত দুই বছরে এমন একাধিক ঘটনা ঘটেছে। কোথাও হামলার আগে পুলিশকে সতর্ক করা হয়েছিল, কোথাও পুলিশের পাহারায় থাকা বাড়িতে হামলা হয়েছে, কোথাও তদন্ত কেন্দ্রের কয়েকশ মিটারের মধ্যে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। এসব ঘটনায় পরে পুলিশ মামলা করেছে, আসামি ধরেছে এবং অস্ত্র উদ্ধার করেছে। কিন্তু হামলার মুহূর্তে পুলিশের উপস্থিতি দেখা যায়নি।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. সাখাওয়াত হোসেনের মতে, এই প্রবণতার পেছনে রয়েছে পুলিশ সদস্যদের মনোবল ও সমন্বয়ের ঘাটতি, সক্রিয় সোর্স ও গোয়েন্দা তথ্যের অভাব, লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধার না হওয়া এবং পুলিশ-জনগণের মধ্যে পারস্পরিক অনাস্থা। তার ভাষ্য, ফেরারি ও চিহ্নিত আসামিদের প্রকাশ্যে ফিরে আসাও আধিপত্য বিস্তার ও অরাজকতার সুযোগ তৈরি করছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত চট্টগ্রাম নগর ও জেলায় অন্তত ৩৫ জন খুন হয়েছেন, যার মধ্যে ২২ জন গুলিতে নিহত। এ সময়ে ৪০টির বেশি গুলির ঘটনা ঘটেছে। অক্সিজেন, বালুচরা, হামজারবাগ, চন্দনপুরা, চান্দগাঁও, বাদুরতলা, খুলশী, বর্মা কলোনি, বাকলিয়া, কালুরঘাট, রাউজান ও সীতাকুণ্ডে বারবার অস্ত্রের ব্যবহার দেখা গেছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মোটরসাইকেলে এসে প্রকাশ্যে গুলি করে দ্রুত পালিয়ে যাওয়ার কৌশল নেয় দুর্বৃত্তরা।
চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ (সিএমপি) কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী ও ডিসি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) মো. রইছ উদ্দিনের বক্তব্য জানতে ফোন ও এসএমএস করা হলেও তাঁদের সাড়া মেলেনি।
সিএমপির সহকারী কমিশনার (মিডিয়া) আমিনুর রশিদ অবশ্য এই অভিযোগ নাকচ করে আমার দেশকে বলেন, পুলিশ আগাম ব্যবস্থা নিতে পারেনি—এমন বক্তব্য সঠিক নয়। খবর পেলেই পুলিশ তাৎক্ষণিক ঘটনাস্থলে গেছে। তিনি বলেন, ‘পুলিশ যখনই খবর পেয়েছে, সব সময় ঘটনাস্থলে গেছে। কাল্পনিক কোনো কথা না বললেই ভালো।’
আধঘণ্টা ধরে ধাওয়া, কাছেই পুলিশ
গত বছরের ২৯ মার্চ দিবাগত রাতে শাহ আমানত সেতু এলাকা থেকে একটি প্রাইভেটকারকে কয়েকটি মোটরসাইকেল নিয়ে ধাওয়া করে অস্ত্রধারীরা। ধাওয়া করে তাদের বাকলিয়া এক্সেস রোড পর্যন্ত নিয়ে যায়। পরে গাড়িতে গুলি চালানো হলে চালকসহ দুজন নিহত এবং দুজন আহত হন। শেষ পর্যায়ে ছয় অস্ত্রধারীকে মোটরসাইকেলে দেখা যায়, যারা গুলি করে দ্রুত সরে যায়।
ওই সময় এলাকায় পুলিশের টহল ছিল। দীর্ঘ সময় ধরে ধাওয়া এবং গুলির শব্দের পরও হামলা ঠেকানো যায়নি। ঘটনার পর সিসিটিভি ফুটেজ ও কল রেকর্ড ধরে তদন্ত করে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। অর্থাৎ অপরাধের পর তদন্তে তৎপরতা থাকলেও অপরাধ সংঘটনের সময় প্রতিরোধ ছিল না। অধ্যাপক সাখাওয়াতের মতে, এই ব্যবধানই চট্টগ্রামের সাম্প্রতিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বড় চিত্র।
গত বছরের ২৭ ও ২৮ অক্টোবর বাকলিয়া থানার সৈয়দ শাহ রোডে যুবদলের দুই পক্ষের সংঘর্ষের সময় ব্যাপক গোলাগুলি হয়। এতে সাজ্জাদসহ (২২) কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হন এবং পরে সাজ্জাদ নিহত হন। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) মেয়র শাহাদাত হোসেন জানান, সংঘর্ষের প্রায় এক ঘণ্টা আগে তিনি নিজে পুলিশ কমিশনারকে ফোন করে এলাকার উত্তপ্ত পরিস্থিতি ও নির্দিষ্ট কয়েকজনকে গ্রেপ্তারের অনুরোধ জানিয়েছিলেন। তাঁর দাবি, কয়েকদিন ধরে বাকলিয়া থানার ওসিকেও তিনি এ বিষয়ে জানিয়ে আসছিলেন।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব.) এমদাদুল ইসলাম বলেন, আগাম সতর্কতা থাকার পরও সংঘর্ষ ও হত্যা ঠেকানো না যাওয়াকে শুধু ‘অপরাধের পর তদন্ত’ দিয়ে ব্যাখ্যা করার সুযোগ নেই। কারণ প্রতিরোধমূলক পুলিশি কাজের মূল অংশই হলো সম্ভাব্য সংঘর্ষের আগে ব্যবস্থা নেওয়া।
পুলিশ পাহারার মধ্যেই হামলা
নগরের চন্দনপুরায় স্মার্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমানের বাড়িতে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সকালে গুলি চালায় একদল অস্ত্রধারী। এর আগে ২ জানুয়ারি একই বাড়িতে গুলি চালানো হয়েছিল বলে বাড়িটি তখন পুলিশের পাহারায় ছিল। তবু হামলাকারীরা বাড়ির পেছন থেকে এসে দ্বিতীয় দফায় গুলি চালানোর সুযোগ পায়।
মোস্তাফিজুরের ভাষ্যমতে, সিকিউরিটি গার্ড খবর দেওয়ার পর পাহারারত পাঁচ-ছয়জন পুলিশ সদস্য দোতলায় উঠে প্রস্তুতি নেওয়ার আগেই হামলাকারীরা পিস্তল ও চাইনিজ রাইফেল নিয়ে গুলি চালিয়ে চলে যায়। অধ্যাপক সাখাওয়াতের ভাষ্য, পাহারা থাকার পরও হামলা না ঠেকাতে পারা পুলিশের প্রতিরোধ ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন তোলে।
তদন্তকেন্দ্রের কাছাকাছি দুই হত্যাকাণ্ড
রাউজানের পূর্ব গুজরায় গত ৫ জানুয়ারি রাতে যুবদল নেতা জানে আলম শিকদারকে মোটরসাইকেলে আসা দুর্বৃত্তরা গুলি করে হত্যা করে। এর কয়েক সপ্তাহ পর ২৫ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় একই এলাকার অলিমিয়াহাটে আরেক যুবদল কর্মী আবদুল মজিদও একই কৌশলে (মোটরসাইকেলে এসে কাছ থেকে গুলি করে দ্রুত পালানো) হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। দুই ঘটনাস্থলই পূর্ব গুজরা পুলিশ তদন্তকেন্দ্রের কাছাকাছি হলেও প্রথম হত্যাকাণ্ডের পর এলাকায় অস্ত্রধারীদের চলাচল বন্ধ হয়নি।
গত বছরের ৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় হাটহাজারীর মদুনাঘাটে ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় আবদুল হাকিমের প্রাইভেটকার অনুসরণ করে পানি শোধনাগারের গেটের সামনে থামিয়ে গুলি করে অস্ত্রধারীরা। গুরুতর আহত হাকিম হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যান; তার চালকও গুলিবিদ্ধ হন। গাড়িতে পরে ২২টি গুলির চিহ্ন ও দুই চাকা ফুটো পাওয়া যায়।
হামলাটি হয়েছিল মদুনাঘাট পুলিশ তদন্তকেন্দ্র থেকে মাত্র ৬০০ ফুট দূরে। ঘটনার পর চারজনকে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করা হলেও হামলার সময় পুলিশের প্রতিরোধ কোথায় ছিল, সে প্রশ্ন থেকে যায়।
চবির ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সভাপতি সহকারী অধ্যাপক মৌমিতা পাল বলেন, তদন্ত কেন্দ্রের এত কাছে কয়েক মিনিট ধরে ২২টি গুলি চালানো নিছক একটি হত্যাকাণ্ড নয়, এটি পুলিশের উপস্থিতি ও প্রতিরোধ ক্ষমতারও পরীক্ষা ছিল, যাতে পুলিশ সফল হয়নি।
এসপি মাসুদ আলম অবশ্য বলেন, পুলিশ শুধু অপরাধের পরই ব্যবস্থা নেয়—এই বক্তব্য ঠিক নয়। তার ভাষায়, ‘পুলিশের কাজ দুটি—একটি ডিটেকটিভ, আরেকটি প্রতিরোধ। আমরা দুটিই একসঙ্গে করছি।’
দায়িত্ব নেওয়ার পর গোয়েন্দা তৎপরতা আরো বাড়ানো হয়েছে দাবি করে তিনি ডেভিড ইমন, ধামা ইলিয়াস ও গলাকাটা মোবারকের মতো আলোচিত সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারের উদাহরণ দেন। তিনি বলেন, ‘আমরা ঘটনা ঘটার চেয়ে কীভাবে পরিস্থিতি আয়ত্তে আনা যায়, সেটির ওপর জোর দিচ্ছি।’
গত বছরের ৫ নভেম্বর নগরের চালিতাতলীতে বিএনপির প্রার্থী এরশাদ উল্লাহর নির্বাচনি প্রচারের সময় গুলিতে নিহত হন সরোয়ার হোসেন ওরফে বাবলা। এ সময় এরশাদসহ দুজন আহত হন। সরোয়ার এর আগে ৩০ মার্চ বাকলিয়া এক্সেস রোডের হামলা থেকে বেঁচে গিয়েছিলেন, যাতে দুজন নিহত হয়েছিলেন।
বিশ্লেষকদের মতে, আগের হামলা থেকে বেঁচে যাওয়া একজন ব্যক্তির ঝুঁকি মূল্যায়ন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব ছিল পুলিশের, যা হয়নি। পরে পুলিশ ও র্যাব তদন্তে আসামি শনাক্তের চেষ্টা করে; র্যাবের পক্ষ থেকে প্রশিক্ষিত শুটার ব্যবহারের তথ্যও উঠে আসে।
৪০টির বেশি গোলাগুলির ঘটনা
চব্বিশের ৫ আগস্টের পর থেকে এ পর্যন্ত চট্টগ্রামে ৪০টির বেশি গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে, যার পেছনে কোথাও রাজনৈতিক বিরোধ, কোথাও আধিপত্য বিস্তার, কোথাও চাঁদাবাজি বা ব্যক্তিগত বিরোধ রয়েছে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে হামলার কৌশলে মিল দেখা গেছে— মোটরসাইকেল ব্যবহার, হেলমেট বা মুখোশে পরিচয় আড়াল, কয়েক মিনিটে হামলা শেষ করে দ্রুত পালানো।
মেজর (অব.) এমদাদুল ইসলাম বলেন, এ ধরনের হামলার আগে অস্ত্র সংগ্রহ, লোকবল ঠিক করা, লক্ষ্যবস্তুর অবস্থান জানা এবং পালানোর পথ ঠিক রাখার মতো প্রস্তুতি লাগে। অর্থাৎ বেশিরভাগ ঘটনাই আকস্মিক উত্তেজনার ফল নয়। তার প্রশ্ন, এই প্রস্তুতির তথ্য কি পুলিশের কাছে পৌঁছায় না, আর পৌঁছালে তা দিয়ে কতগুলো হামলা ঠেকানো হয়েছে?
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন



