শিক্ষার্থী কমেছে ৭০ শতাংশ, ফলাফলে ধস

সঞ্চয় ভেঙে চলছে সীতাকুণ্ড ডিগ্রি কলেজ

সঞ্চয় ভেঙে চলছে সীতাকুণ্ড ডিগ্রি কলেজ
ছবি: আমার দেশ

একসময় প্রায় পাঁচ হাজার শিক্ষার্থীর পদচারণায় মুখর সীতাকুণ্ড ডিগ্রি কলেজে এখন শিক্ষার্থী দেড় হাজারেরও নিচে। তিন বছরে এইচএসসি পরীক্ষায় পাসের হার কমেছে ৫৩ দশমিক ৯০ থেকে ২৩ দশমিক ৩৬ শতাংশে। শিক্ষার্থী ফি থেকে পর্যাপ্ত আয় না হওয়ায় বেতন-ভাতা ও পরিচালন ব্যয় মেটাতে ভাঙতে হচ্ছে পুরোনো ডিপিএস ও স্থায়ী আমানত (এফডিআর)।

কলেজ প্রশাসনের হিসাবে, মাসে ব্যয় প্রায় সাড়ে সাত লাখ টাকা, বছরে প্রায় ৯০ লাখ। কিন্তু শিক্ষার্থী কমার কারণ, ফলাফল বিপর্যয়ের পেছনের বাস্তবতা এবং আর্থিক সংকটের প্রকৃত মাত্রা এখনো স্পষ্ট নয়। এর সঙ্গে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি, কর্মচারীর হাজিরা ও বেতন এবং ক্যাম্পাস ব্যবস্থাপনা নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠায় ১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানটি পড়েছে বহুমুখী সংকটে।

বিজ্ঞাপন

কলেজটির সংকটের সবচেয়ে দৃশ্যমান চিত্র এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল। ২০২৩ সালে পাসের হার ছিল ৫৩ দশমিক ৯০ শতাংশ, ২০২৪ সালে ৫৩ দশমিক ০৯ শতাংশ। ২০২৫ সালে তা নেমে আসে ২৩ দশমিক ৩৬ শতাংশে। ওই বছর ৬০৮ পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেন মাত্র ১৪২ জন। দুই বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে ৩০ শতাংশীয় পয়েন্টের বেশি। ফলাফলের এই পতন শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি, নিয়মিত পাঠদান ও একাডেমিক তদারকি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।

ফলাফল কমে যাওয়ার ব্যাখ্যায় কলেজের উপাধ্যক্ষ মোহাম্মদ মুসা বলেন, পরীক্ষার হলে সিসিটিভি স্থাপন ও কঠোর নজরদারির কারণে অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার সুযোগ কমেছে। ফলে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত প্রস্তুতির প্রতিফলন ফলাফলে দেখা যাচ্ছে। তবে ফলাফল বিপর্যয়ের কারণ বুঝতে বিষয়ভিত্তিক ফলাফল, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি, শিক্ষক হাজিরা ও পাঠদানের অগ্রগতি পর্যালোচনা প্রয়োজন।

গত ২১ সেপ্টেম্বর দায়িত্ব নেওয়া ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ অধ্যাপক মোহাম্মদ কফিল উদ্দিন আমার দেশকে বলেন, কলেজটি প্রায় ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে চলে গেছে। তাঁর ভাষ্য, অধিকাংশ শিক্ষার্থী নিয়মিত ক্লাসে আসে না। প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহারে পড়াশোনায় মনোযোগ কমেছে। কোনো কোনো শিক্ষকও নির্ধারিত সময়ে কলেজে আসা-যাওয়া করেন না বলে অভিযোগ করেন তিনি। ক্লাস চলাকালে কিছু শ্রেণিকক্ষ তালাবদ্ধ পাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে বলে জানান ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ।

দায়িত্ব নেওয়ার পর শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বাড়ানো, অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ, কাউন্সেলিং এবং ২০২৭ সালের এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের বিশেষ প্রস্তুতির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। তবে এসব উদ্যোগ কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা বোঝার জন্য নিয়মিত পাঠদান ও উপস্থিতির রেকর্ড এবং পরীক্ষার ফলাফলের ধারাবাহিক মূল্যায়ন প্রয়োজন।

শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে কলেজের অবস্থান ও আশপাশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ভর্তি প্রতিযোগিতার কথা বলেছেন উপাধ্যক্ষ মোহাম্মদ মুসা। তাঁর মতে, মূল সড়ক থেকে কলেজটি কিছুটা ভেতরে হওয়ায় যাতায়াতের বাড়তি খরচ বিবেচনায় অনেক শিক্ষার্থী কাছাকাছি প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হচ্ছে। তবে একসময় প্রায় পাঁচ হাজার থেকে দেড় হাজারের নিচে শিক্ষার্থী নেমে আসার পেছনে এটিই প্রধান কারণ কিনা, তা নিশ্চিত নয়। প্রকৃত চিত্র জানতে কয়েক বছরের ভর্তি রেজিস্টার, ভর্তি বাতিল, স্থানান্তর ও উপস্থিতির তথ্য পর্যালোচনা প্রয়োজন।

শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে কলেজের আর্থিক ব্যবস্থাপনাতেও। ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৩৫ জন শিক্ষকসহ ৫০ জনের বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন-ভাতা ও পরিচালন ব্যয় মেটাতে মাসে প্রয়োজন হয় প্রায় সাড়ে সাত লাখ টাকা। বছরে এ ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ৯০ লাখ টাকা। শিক্ষার্থীদের ফি থেকে পর্যাপ্ত আয় না হওয়ায় পুরোনো ডিপিএস ও এফডিআর ভেঙে ব্যয় নির্বাহ করতে হচ্ছে বলে জানান তিনি। সঞ্চিত অর্থ দিয়ে নিয়মিত ব্যয় মেটানোর এই ব্যবস্থা কত দিন চালানো সম্ভব, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তবে প্রকৃত আর্থিক ঘাটতি নির্ধারণে আয়-ব্যয়ের বিবরণী, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, বেতন বিল ও আমানত ভাঙার নথি পর্যালোচনা জরুরি।

প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। কলেজসংশ্লিষ্টদের দাবি, এক কর্মচারী দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকলেও বেতন-ভাতা উত্তোলন করে আসছেন। হাজিরা খাতায় তাঁর নিয়মিত স্বাক্ষরের প্রমাণ নেই বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। বিষয়টি ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় উত্থাপন করা হয়েছে এবং কলেজ বোর্ডকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে বলে জানান ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ।

কলেজের প্রধান ফটকে দৃশ্যমান নামফলক নেই। ম্যানেজিং কমিটির অভিভাবক সদস্যদের অভিযোগ, ক্যাম্পাসের বিভিন্ন দেয়ালে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের পুরোনো স্লোগান এখনো রয়ে গেছে। ভাইস প্রিন্সিপাল টেবিলের সামনে এখনো আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি ও কলেজের সাবেক ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি এস এম আল মামুনের নামসহ সদস্যদের তালিকা এবং শহীদ মিনারে শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি-সংবলিত একটি স্মারক কাপড় দিয়ে ঢাকা রয়েছে বলেও তাঁরা জানান।

সংকট উত্তরণে অভিভাবক সমাবেশ, শিক্ষার্থীদের কাউন্সেলিং, নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং ২০২৭ সালের এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের বিশেষ প্রস্তুতির উদ্যোগ নিয়েছে বর্তমান প্রশাসন। ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের মতে, দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে কলেজটিকে জাতীয়করণ বা সরকারি ব্যবস্থাপনায় নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন। কলেজসংশ্লিষ্ট কয়েকজনও জাতীয়করণের দাবি জানিয়েছেন।

তবে জাতীয়করণের দাবি বাস্তবায়নের পাশাপাশি নিয়মিত পাঠদান, শিক্ষক-কর্মচারীদের দায়িত্ব পালনে জবাবদিহি, আর্থিক হিসাবের স্বচ্ছতা এবং ফলাফল উন্নয়নে কার্যকর পরিকল্পনা জরুরি। শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান ও সঞ্চিত অর্থের ব্যবহার পর্যালোচনাও প্রয়োজন। ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানটিকে ঘুরে দাঁড় করাতে এখন বড় চ্যালেঞ্জ, শিক্ষার মান ফিরিয়ে আনা, আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা।

এমএইচ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...