রাঙ্গামাটি জেলা বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল চরমে

মোহাম্মদ সোলায়মান, রাঙামাটি

রাঙ্গামাটি জেলা বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল চরমে
রাঙামাটিতে ছাত্রদল ও তাঁতি দলের কমিটি নিয়ে মুখোমুখি অবস্থান। সাম্প্রতিক ছবি আমার দেশ

রাঙ্গামাটি জেলা বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল চরম আকার ধারণ করেছে। সম্প্রতি জেলা ছাত্রদল ও তাঁতী দলের কমিটি ঘোষণাকে কেন্দ্র করে মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে দুই পক্ষ। চাপা ক্ষোভ যেকোনো সময় রক্তক্ষয়ী সংঘাতের দিকে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সাধারণ নেতাকর্মীরা। গত মঙ্গলবার ছাত্রদলের দুই পক্ষের সংঘর্ষের ঘটনায় দলীয় কার্যালয়ের আশপাশে জারি করা হয় ১৪৪ ধারা। গত বৃহস্পতিবার থেকে জেলা বিএনপির কার্যালয় ও আশপাশের এলাকায় জোরদার করা হয়েছে নিরাপত্তাব্যবস্থা।

দলীয় সূত্র জানায়, দীর্ঘ আট বছর পর কেন্দ্র থেকে গত ২ মে ঘোষণা করা হয় রাঙ্গামাটি জেলা ছাত্রদলের কমিটি। ২৩ সদস্যবিশিষ্ট এই কমিটি নিয়ে জেলা ছাত্রদলের একাংশ উচ্ছ্বাস প্রকাশ করলেও পদবঞ্চিতরা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। তাদের অভিযোগ, এই কমিটি অছাত্র, বিবাহিত, মাদক কারবারি ও গুরুতর অপরাধের মামলার আসামিতে ভরপুর। কেন্দ্রীয় কমিটির সিনিয়র নেতারা চাঁদা নিয়ে কমিটির ঘোষণা করেছে বলে অভিযোগ তাদের। এর সঙ্গে যোগসাজশ রয়েছে জেলা বিএনপির কতিপয় নেতার।

বিজ্ঞাপন

অপর দিকে গত বুধবার রাতে জেলা তাঁতি দলের একটি কমিটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তা নিয়ে দুপক্ষের মধ্যে বিরোধ শুরু হয়। প্রচারিত কমিটিটি জালিয়াতির মাধ্যমে করা হয়েছে দাবি করছে একপক্ষ। গত বৃহস্পতিবার রাঙামাটি জেলা বিএনপির কার্যালয়ে আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে কেন্দ্রীয় নেতাদের একটি পক্ষ অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে এ কমিটি দিয়েছে বলে তারা দাবি করেন। এ কমিটি বাতিল না হলে, আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তাঁতি দলের একাংশ। অপরদিকে জেলা ছাত্রদলের কমিটি বাতিল না হলে, কঠোর হরতাল অবরোধের ঘোষণা দিয়ে রেখেছে বিক্ষুব্ধ অংশ। এ অবস্থায় যেকোনো সময় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আশঙ্কা করছেন সাধারণ নেতাকর্মীরা।

একাধিক সিনিয়র নেতা জানান, রাঙামাটি জেলা বিএনপির মধ্যে দীর্ঘদিন থেকে চলছে অভ্যন্তরীণ গ্রুপিং। যার প্রভাব পড়তে থাকে দলের অঙ্গ, সহযোগী সংগঠন ও উপজেলা পর্যায়ের রাজনীতিতে। দুই থেকে তিনটি ধারায় বিভক্ত রাঙামাটি বিএনপির গ্রুপিং জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার গঠন করলে দুটি ধারা স্পষ্ট হয়ে উঠে।

দলীয় একাধিক সূত্রে জানা গেছে, দলের সংসদ সদস্য ও পার্বত্য মন্ত্রী দীপেন দেওয়ানকে ঘিরে গড়ে উঠেছে একটি বলয়। আর জেলা বিএনপির সভাপতি দীপেন তালুকদার ও সাধারণ সম্পাদক মামুনুর রশীদ মামুনকে ঘিরে রয়েছে একটি বলয়। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২৪ শের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার সরকারের পতনের পর জেলা বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বলয় মাঠের রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তার করে। অপরদিকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কেন্দ্রীয় বিএনপির সহধর্মবিষয়ক সম্পাদক দীপেন দেওয়ান দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার পর তার সমর্থকরা চাঙ্গা হয়ে ওঠে। সরকার গঠনের পর মাঠে আধিপত্য বিস্তার করে এই গ্রুপ। দলের শীর্ষ পর্যায়ের এই মতবিরোধ ও গ্রুপিং অঙ্গ সহযোগী সংগঠনেও ব্যাপক হারে প্রভাব ফেলে। দলীয় গ্রুপিং-এর কারণে বিরোধ লেগে আছে ছাত্রদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, তাঁতি দল ও শ্রমিক দলেও। এছাড়াও বিভিন্ন উপজেলায় দুই পক্ষের অনুসারীরা বিভক্ত হয়ে আছে। বাঘাইছড়ি ও কাপ্তাই উপজেলায় এ কোন্দলের প্রভাব সবচেয়ে বেশি বলে জানা গেছে। শীর্ষ পর্যায়ের গ্রুপিং-এর কারণে তৃণমূল পর্যায়ের নেতাদের মাঝে হতাশা বিরাজ করছে। তাদের অভিযোগ জেলার শীর্ষ নেতারা নিজেদের স্বার্থের কারণে গ্রুপিং রাজনীতিতে ব্যস্ত রয়েছেন।

এদিকে জেলা বিএনপিতে বিরাজমান এই দুই ধারার বাইরেও চট্টগ্রামের হাটহাজারী আসনের সংসদ সদস্য ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর হেলালের কিছু অনুসারী রয়েছে বলে জানিয়েছেন সাধারণ কর্মী সমর্থকরা।

এদিকে দলের সহযোগী সংগঠনগুলোর কমিটি নিয়ে বিরোধ নিরসনে সিনিয়র নেতাদের কোনো উদ্যোগ নেই বলে তৃণমূল কর্মীরা অভিযোগ তুলেছে।

জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মামুনুর রশীদ মামুন এ অভিযোগ স্বীকার করে বলেন, অঙ্গসংগঠনের কমিটির বিরোধে জেলা কমিটি কোনো হাত নেই। কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে ছাত্রদল ও তাঁতি দলের সমস্যা নিরসনে কাজ করছে। তিনি বলেন, জেলা বিএনপিতে কোনো গ্রুপিং নেই। জেলা বিএনপি সাধারণ সম্পাদকের মধ্যে কোনো গ্রুপিং কেউ দেখাতে পারবে না এবং সংসদ সদস্য ও পার্বত্য মন্ত্রীর সঙ্গেও তাদের কোনো বিরোধ নেই বলে তিনি জানান।

জেলা বিএনপির সহসভাপতি সাইফুল ইসলাম ভুট্টো বলেন, ছাত্রদলের যে কমিটি হয়েছে, তা যথাযথ প্রক্রিয়া হয়নি। কেন্দ্রীয় নেতাদের উচিত ছিল জেলার সঙ্গে আলোচনা করে এ কমিটি দেওয়া।

রাঙামাটি জেলা তাঁতি দলের সাবেক সভাপতি আনোয়ার আজিম বলেন, কেন্দ্রীয় সদস্য সচিবের স্বাক্ষর জাল করে কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক জেলা তাঁতি দলের কমিটি দিয়েছেন। জেলা তাঁতি দলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক ছগির আহমেদ বলেন, কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক জালিয়াতি করে একটি ভুয়া কমিটি দিয়েছেন।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন