স্বৈরাচারী শক্তি ও গুপ্ত মহল আবার একসঙ্গে

স্বৈরাচারী শক্তি ও গুপ্ত মহল আবার একসঙ্গে
ছবি: সংগৃহীত

স্বৈরাচারী গোষ্ঠী গত ১৭ বছর দেশের মানুষের ভোটাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কেড়ে নিয়েছিল। তারা ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায়। এখন সেই শক্তি ও নেপথ্যের গুপ্ত মহল আবারও একজোট হয়েছে। তারা দেশে নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অপচেষ্টা চালাচ্ছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে ফেনীর ফুলগাজী সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি দাবি করেন, এই জোট নতুন নয়। ১৯৯১ ও ১৯৮৬ সালসহ বিভিন্ন নির্বাচনেও তারা গোপনে একসঙ্গে কাজ করেছে। সে কারণেই তাদের ‘গুপ্ত’ বলা হয়।

বিজ্ঞাপন

নির্বাচনের আগে ধর্মীয় অনুভূতি ব্যবহার করে ‘বেহেশতের টিকিট’ বিক্রির মতো প্রচারণা চালানো হয়েছে দাবি করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখন তথাকথিত ‘এক দফা’র আওয়াজ তুলে সরকারের উন্নয়ন ও সংস্কার কর্মসূচি বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা চলছে।

তিনি সরকারের জনকল্যাণমুখী উদ্যোগগুলোর চিত্র তুলে ধরে বলেন, সরকার নারীদের আত্মনির্ভরশীল করতে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষকদের জন্য কৃষক কার্ড এবং ইমাম-মুয়াজ্জিন ও ধর্মীয় গুরুদের জন্য ভাতার ব্যবস্থা কার্যকর করেছে। পাশাপাশি নদী-খাল খনন, স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিও হাতে নেওয়া হয়েছে।

উপজেলা হাসপাতাল ১৫০ শয্যা করার ঘোষণা

জনসভায় প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দেন, দেশের প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ৫০ শয্যা থেকে ১৫০ শয্যায় উন্নীত করা হবে। গ্রামের মানুষকে চিকিৎসার জন্য যেন শহরে যেতে না হয়, সে লক্ষ্যেই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা ও সুযোগ-সুবিধায় স্বয়ংসম্পূর্ণ করা হবে। ‎

তিনি বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দেশের সব উপজেলায় ৩০ শয্যার হাসপাতাল করেছিলেন। পরে আপনাদের ফেনীর মেয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া সেগুলো ৫০ শয্যায় উন্নীত করেন।

স্থানীয় সংসদ সদস্য মুন্সি রফিকুল আলম মজনুর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শুধু পরশুরাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ১০০ শয্যায় উন্নীত করা নয়, দেশের প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ১৫০ শয্যায় উন্নীত করা হবে।

তিনি আরো উল্লেখ করেন, স্বৈরাচারের আমলে বন্ধ হয়ে যাওয়া কলকারখানাগুলো পুনরায় চালুর জন্য দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব উন্নয়ন ও পুনর্বাসন কর্মসূচি ব্যাহত করতেই ষড়যন্ত্রকারীরা মাথাচাড়া দেওয়ার চেষ্টা করছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীকে সতর্ক ও ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান।

তারেক রহমান বলেন, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, নদী ও খাল খনন এখন শুধু বিএনপির কর্মসূচি নয়, বরং দেশের মানুষের কর্মসূচিতে পরিণত হয়েছে। এসব কর্মসূচির পাশাপাশি অপপ্রচার রোধেও জনগণকে সজাগ থাকার আহ্বান জানান তিনি।

তিনি বলেন, বিএনপি জনগণের দল হিসেবে জনগণের কাজ করছে। নদী খনন, খাল খনন এ দেশের জন্য বেশি প্রয়োজন। এই এলাকার মানুষ এতে বেশি উপকৃত হবে। এতে প্রায় ৩৪ হাজার টন ধান বেশি উৎপাদন হবে। এতে কৃষক ও সাধারণ মানুষ উপকৃত হবেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা বলেছিলাম বিএনপি ক্ষমতায় গেলে কৃষিঋণ মওকুফ করা হবে। সেই ঋণ আমরা মওকুফ করেছি। আজ মা-বোনদের ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হবে। এ কার্ড পেলে সাধারণ মানুষ উপকৃত হবে। আমরা কৃষক ভাইদের মধ্যে কৃষক কার্ড দেব। উন্নয়নের পাশাপাশি অপপ্রচার রোধেও জনগণকে সজাগ থাকতে হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

১,৫৪২ কোটি টাকার প্রকল্প উদ্বোধন

এর আগে গতকাল দুপুরে ফেনীর পরশুরাম উপজেলার ঘাটঘর মুহুরী ব্রিজ এলাকায় ১,৫৪২ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘মুহুরী-কহুয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্পের পুনর্বাসন (প্রথম পর্যায়)’ উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রকল্পের আওতায় ৬৭.৯২ কিলোমিটার বাঁধ পুনর্বাসন, ১১.৭৩ কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণ, ৮৩.৫০ কিলোমিটার নদী ও জলাধার পুনঃখনন, ২৭টি সেচ অবকাঠামো পুনর্বাসন এবং ৭৭টি ইনলেট নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। কাজ শেষ করার লক্ষ্য ২০৩০ সাল। পরবর্তী পর্যায়ে মুহুরী ও কহুয়া নদীতে নতুন বাঁধ নির্মাণের পাশাপাশি সিলোনিয়া নদীতে বাঁধ নির্মাণ, নদী খনন ও সংস্কারের পরিকল্পনাও রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ফেনীর মানুষের দীর্ঘদিনের বন্যা ও জলাবদ্ধতা সমস্যা সমাধানে নদী-খাল খনন গুরুত্বপূর্ণ। বিএনপি ক্ষমতায় এলে কৃষিঋণ মওকুফের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, সেটিও বাস্তবায়ন করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

অরাজকতা নিয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান

তারেক রহমান বলেন, একটি রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ডে দেশের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিসরেও বাংলাদেশের সুনাম ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। ১৯৭১ ও ১৯৮৬ সালে ওই দলের ভূমিকা কী ছিল, তা জনগণের সামনে তুলে ধরার কথাও বলেন তিনি।

তিনি আরো বলেন, দেশে রাজনৈতিক দলের কিছু নেতাকর্মী অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটাচ্ছে এবং সেটিকে পুঁজি করে অরাজকতা সৃষ্টির চেষ্টা চলছে। এতে দেশের উন্নয়ন ব্যাহত হলে এর দায় সংশ্লিষ্টদের নিতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দল যার যার, দেশটা সবার’। গণতন্ত্র অব্যাহত রাখার পাশাপাশি অপপ্রচার রোধে জনগণকে সজাগ থাকার আহ্বান জানান তিনি।

প্রধানমন্ত্রী ফুলগাজীতে বেগম খালেদা জিয়া মহিলা কলেজে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতেও অংশ নেন। পরে ফুলগাজী জেলা পরিষদ ডাকবাংলোয় সরকারি ভবনের ছাদে স্থাপিত রুফটপ সোলার থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন।

ফেনীর পরশুরাম, ফুলগাজী ও ছাগলনাইয়া উপজেলার সরকারি ভবনে মোট ৯৬২ কিলোওয়াট সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে ছাগলনাইয়ায় ৪১৫, পরশুরামে ২৯৮ ও ফুলগাজীতে ২৪৯ কিলোওয়াট ক্ষমতার সোলার সিস্টেম রয়েছে।

জনসভায় ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড এবং মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন, খাদেমসহ বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনালয়ে কর্মরতদের সম্মানী প্রদান কর্মসূচিতেও অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু, পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ, ফেনী-১ আসনের সংসদ সদস্য মুন্সি রফিকুল আলম মজনু, ফেনী-২ আসনের সংসদ সদস্য জয়নাল আবেদীন প্রমুখ।

প্রসঙ্গত, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নানা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বাবা ইস্কান্দার মজুমদারের গ্রামের বাড়ি ফেনীর ফুলগাজী উপজেলার শ্রীপুরে। ফেনী-১ আসনের সঙ্গে খালেদা জিয়ার দীর্ঘ রাজনৈতিক ও পারিবারিক স্মৃতি রয়েছে। ১৯৯১ সাল থেকে এ আসনে পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন খালেদা জিয়া।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...