বান্দরবানে সেতুর অভাবে ঝুঁকি নিয়ে পারাপার

আবুল বাশার নয়ন, বান্দরবান

বান্দরবানে সেতুর অভাবে ঝুঁকি নিয়ে পারাপার

বান্দরবানে একটি সেতুর অভাবে প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে খাল সাঁতরিয়ে স্কুলে যাতায়াত করে শত শত শিক্ষার্থী । যেকোনো সময় ঘটে যেতে পারে ভয়াবহ দুর্ঘটনা । সেতুর জন্য এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে বারবার আবেদন-নিবেদন করা হলেও তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না ।

জানা গেছে, প্রতিদিন সকাল সাড়ে ৮টা বাজতেই পাহাড়ি ঢালের পথ বেয়ে নেমে আসে একদল শিশু শিক্ষার্থী। কারো পিঠে পুরোনো স্কুলব্যাগ, কারো বুকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরা বাংলা আর গণিত বই। দূর থেকে দেখলে মনে হয় কোনো উৎসবের প্রস্তুতি। কিন্তু পাড়ঘেঁষে দাঁড়াতেই সেই মায়াবি দৃশ্য রূপ নেয় এক বুক হিম করা আতঙ্কে। সামনেই গর্জন তুলছে পাহাড়ি বমু খাল। ঘোলা জলের প্রবল স্রোত যেন মুহূর্তে গিলে নিতে চায় সবকিছু। পাড়ে দাঁড়িয়ে থমকে যায় চতুর্থ শ্রেণির ছোট্ট মেয়ে পাউঙি ম্রো ও পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র মাংইয়ং ম্রো। মেয়েটির পরনের নীল ইউনিফর্মের নিচের অংশটা কোমর পর্যন্ত গুটিয়ে নেয় সে। এক পা, দু’পা করে নামতেই বুকসমান পানি আর তীব্র স্রোতের টান। খাতার পাতাগুলো যাতে কোনোভাবেই ভিজে নষ্ট না হয়, সে জন্য আরেক হাতে ব্যাগটি মাথার ওপর উঁচিয়ে ধরেছে শিশুটি। পা একটু পিছলে গেলেই নির্ঘাত ভেসে যাওয়ার শঙ্কা। যাদের সঙ্গে বাবা কিংবা বড় ভাই নেই, তাদের জন্য এই পারাপার যেন একেকটি অলিখিত যুদ্ধ। প্রতিদিনের এই করুণ ও বিপজ্জনক জলযুদ্ধ কোনো আকস্মিক দুর্যোগের নয়; বান্দরবানের লামা উপজেলার গজালিয়া ইউনিয়নের ৮ ও ৯ নং ওয়ার্ডের দুটি বিদ্যালয়ের শত শত কোমলমতি শিক্ষার্থীর এটাই প্রতিদিনের নিয়তি। খালের পাড়ে চোখে পড়ে আরেক নির্মম বাস্তবতা। পিঠে বাঁশের তৈরি থ্রম্নং (ঝুড়ি) বোঝাই করে নিয়ে আসছেন কয়েকজন চাষি। ঝুড়িতে পাহাড়ে উৎপাদিত ফসল। খাল পার করে সুবিধাজনক স্থানে তুলতে পারলে ভালো দাম মিলত।

বিজ্ঞাপন

এরপর বাইশফাঁড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এলাকায় কথা হয় স্থানীয় এনজিও কর্মী অংথোয়াইনু মারমার সঙ্গে। দীর্ঘদিনের ক্ষোভ আর হতাশা প্রকাশ করে তিনি বললেন, ‘ব্রিজ হবে হবে বলে বহুবার লোক এসে মাপজোখ করে গেছে। ফিতা টেনে দাগ দিয়ে চলে যায়, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় না। মানুষ শুধু আশাতেই বাঁচে। ফাইল চালাচালির ভিড়ে আমাদের এই দুর্গম জনপদের দুঃখটা কি কারো চোখে পড়ে না? বেলা বাড়ে, খালের স্রোত বাড়ে। ওপারে তখন ছুটির ঘণ্টা বাজার শব্দ। আবার শুরু হবে বাড়ি ফেরার একই লড়াই-বই বাঁচানোর লড়াই, বেঁচে ফেরার লড়াই। লামা উপজেলার গজালিয়ার মানুষ আর কোনো মাপজোখের আশ্বাস চায় না, তারা চায় বমু খালের বুকে শক্ত একটি সেতু, যা তাদের সন্তানদের নিরাপদে স্কুলে পৌঁছে দেবে আর বাঁচিয়ে রাখবে পাহাড়ি জনপদের স্বপ্নকে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন