চলতি অর্থবছরের আগস্টে শীর্ষ পাঁচ রপ্তানিপণ্যের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে চামড়া ও চামড়াজাত শিল্প। রপ্তানিতে প্রথম স্থানে থাকা দেশের তৈরি পোশাকশিল্পের প্রবৃদ্ধির চেয়েও এগিয়ে আছে এই খাত। চামড়াশিল্পের প্রবৃদ্ধির গতি এখন পোশাক খাতের প্রবৃদ্ধির প্রায় দ্বিগুণ। সবচেয়ে বেশি পণ্য রপ্তানির তালিকায়ও দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে এই শিল্প।
বিশ্লেষকদের মতে, দেশের রপ্তানি পণ্যের ক্ষেত্রে বৈচিত্র্য আনার প্রক্রিয়ায় চামড়াশিল্পের এই উত্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। তবে পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণ, কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগারের (সিইটিপি) কার্যকারিতা, অর্থায়ন সংকটের শর্ত পূরণের সক্ষমতার ওপরই নির্ভর করবে কতটা টেকসই হবে এ খাতের প্রবৃদ্ধি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, আগস্টে শীর্ষ পাঁচ রপ্তানি পণ্যের মোট রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ৩৯৬ কোটি ৫৮ লাখ ডলার। আগের বছরের একই সময়ে এ আয় ছিল ৩৪৮ কোটি ৭৬ লাখ ডলার। অর্থাৎ, এক বছরে শীর্ষ পাঁচ পণ্যের রপ্তানি আয় বেড়েছে প্রায় ৪৭ কোটি ৮২ লাখ ডলার।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী রপ্তানির শীর্ষ পাঁচ পণ্যের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে চামড়া ও চামড়াজাত শিল্পে। ২০২৬ সালের আগস্টে এ খাতে রপ্তানি হয়েছে ১২ কোটি ৬৬ লাখ ডলারের, যা আগের বছরের একই মাসের তুলনায় ২৪.৮ শতাংশ বেশি। দেশের শীর্ষ পাঁচ রপ্তানি পণ্যের মধ্যে প্রবৃদ্ধির হারে যা সর্বোচ্চ। রপ্তানিতে শীর্ষে থাকা তৈরি পোশাকের প্রবৃদ্ধির হার যেখানে ১৩.৯ শতাংশ, সেখানে আকারে ছোট হয়েও চামড়াশিল্প প্রায় দ্বিগুণ গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। এ শিল্পের প্রবৃদ্ধি ২৪.৮ শতাংশ।
খাতসংশ্লিষ্টরা যা বলছেন
বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের ভাইস চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান জানান, সাম্প্রতিক সময়ে চীন বিশাল আকারের চামড়া আমদানি করেছে বাংলাদেশ থেকে। কোরবানির কারণে চীনের চাহিদার বিপরীতে প্রাথমিক কাঁচামাল হিসেবে বড় পরিমাণের রপ্তানি করার সুযোগ হয়েছে উদ্যোক্তাদের। টাকাও দ্রুত নগদায়ন হয়েছে। আগস্টের প্রবৃদ্ধির এটা অন্যতম কারণ হতে পারে। পাশাপাশি ভারত থেকে স্প্লিট লেদার, ক্রাস্ট লেদার, ফিনিশড লেদারের প্রচুর পরিমাণে চাহিদা পাওয়া যাচ্ছে। এ সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে এ খাতের প্রবৃদ্ধি টেকসই হবে।
চামড়াশিল্পের সীমাবদ্ধতার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, আগে আমাদের চামড়া ইতালিসহ ইউরোপের দেশগুলোতে রপ্তানি হতো। কিন্তু পরিবেশ ছাড়পত্রের বিষয়টির কারণে আমরা ইউরোপসহ অন্যান্য উন্নত দেশের ব্র্যান্ডের বাজার চাহিদাকে ধরতে পারছি না। উন্নত রাষ্ট্রগুলোতে পণ্য পাঠাতে হলে কোনো ট্যানারির ক্ষেত্রে পরিবেশের ক্ষতি না করে ও নিরাপদ কেমিক্যাল ব্যবহার করে চামড়া তৈরির শর্ত মানা এবং বর্জ্য শোধনাগার অবকাঠামোর জন্য দুটি ছাড়পত্রের দরকার হয়।
এর মধ্যে ‘লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ’ বা (এলডব্লিউসি) দরকার হয়, যা পরিবেশবান্ধব চামড়া উৎপাদনের বৈশ্বিক স্বীকৃতির জন্য; অন্যটি বর্জ্য শোধনাগার অবকাঠামোর ‘কেন্দ্রীভূত বর্জ্য শোধনাগার প্ল্যান্ট’ (সিইটিপি) ছাড়পত্র। তিনি আশা প্রকাশ করে জানান, সরকার তরল বর্জ্য শোধনাগার প্ল্যান্ট (ইটিপি) অনুমোদনের জন্য উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করার কাজ শুরু করেছে। এটি বাস্তবায়িত হলে এ শিল্পের রপ্তানি আয় আরো বৃদ্ধি পাবে।
চট্টগ্রামের বিখ্যাত ট্যানারিশিল্প প্রতিষ্ঠান রিফ লেদার লিমিটেডের পরিচালক (অপারেশন ও সেলস) মোখলেসুর রহমান জানান, চট্টগ্রামে বর্তমানে ইটিপিসহ সব ধরনের কমপ্লায়েন্স মেনে কাজ করছে রিফ লেদার। আমাদের এলডব্লিউজির সনদ রয়েছে। এতে চামড়াজাত পণ্যের বিদেশি ব্র্যান্ডের প্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের রিফ লেদারের চামড়া ও চামড়াপণ্য নিতে আগ্রহী হচ্ছে।
তিনি আরো বলেন, দেশে অনেক প্রতিষ্ঠান চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য নিয়ে কাজ করছে; কিন্তু পরিবেশগত ছাড়পত্রের কারণে তারা রপ্তানিতে পিছিয়ে আছে। সরকার যদি এসব প্রতিষ্ঠানে ইটিপি বাস্তবায়নে সহায়তা দেয়, তাহলে তারাও এলডব্লিউজির সনদ পেতে পারে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের তৈরি চামড়ার চাহিদা আরো বাড়বে।
ব্যাগ, গ্লাভস, ওয়ালেটে বেশি প্রবৃদ্ধি
চামড়া খাতের ভেতরে বড় অবদান রাখছে ব্যাগ, ওয়ালেট, গ্লাভস। এ পণ্যগুলোর প্রবৃদ্ধি সবচেয়ে বেশি। অন্যদিকে কাঁচা ও প্রক্রিয়াজাত চামড়া রপ্তানিও বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। এ খাতের সবচেয়ে বড় উপখাত চামড়ার জুতা রপ্তানিও প্রায় সমান গতিতে বেড়েছে। রপ্তানি হয়েছে ২৪.৭ শতাংশ। ২০২৫-২৬ পূর্ণ অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের সবচেয়ে বড় ক্রেতা যুক্তরাষ্ট্র। দ্বিতীয় অবস্থানে ভারত ১৫.৩ শতাংশ। এরপর যথাক্রমে চীন ও জাপানের অবস্থান। বিশেষভাবে চামড়ার জুতার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা আরো বেশি। একক দেশ হিসেবে এই চামড়া ও চামড়াজাতশিল্পের প্রায় অর্ধেক রপ্তানি যাচ্ছে উত্তর আমেরিকার এই দেশে, যা শতাংশের হিসাবে ৪৭.৯।
প্রবৃদ্ধিতে দ্বিতীয়, রপ্তানি আকারে প্রথম তৈরি পোশাক
চলতি অর্থবছরের আগস্ট মাসে বাংলাদেশের রপ্তানির শীর্ষ পাঁচ পণ্যের মধ্যে চার খাতে রপ্তানি আয় বেড়েছে। চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য থেকে আয় ১২ কোটি ৬৬ লাখ ডলার, যা আগের বছরের ১০ কোটি ১৪ লাখ ডলারের তুলনায় ২৪.৯ শতাংশ বেশি। শীর্ষ পাঁচ পণ্যের মধ্যে এটিই সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি। রপ্তানিতে শীর্ষে থাকা তৈরি পোশাক (আরএমজি) থেকে আয় ৩৬০ কোটি ৮৯ লাখ ডলার, যা ২০২৫ সালের আগস্টে ছিল ৩১৬ কোটি ৮০ লাখ ডলার। ফলে এ খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৩.৯ শতাংশ। অর্থাৎ, প্রবৃদ্ধিতে চামড়া খাত এখন শীর্ষে আর রপ্তানি আকারে প্রথম অবস্থান তৈরি পোশাকের।
পাট ও পাটজাত পণ্যের আয় সাত কোটি ৭২ লাখ ডলার। আগের বছর এ আয় ছিল ছয় কোটি ৩১ লাখ ডলার। রপ্তানি বেড়েছে ২২.৩ শতাংশ।
এদিকে গৃহস্থালি বস্ত্র বা হোম টেক্সটাইল থেকে আয় হয়েছে সাত কোটি ৬৭ লাখ ডলার। আগের বছরের একই সময়ে আয় হয়েছিল সাত কোটি ৯ লাখ ডলার। প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৮.১ শতাংশ। অন্যদিকে কৃষিপণ্য রপ্তানি আয় কমেছে। আগস্টে এ খাত থেকে আয় হয়েছে সাত কোটি ৬৪ লাখ ডলার, যা ২০২৫ সালের আগস্টে ছিল আট কোটি ৪২ লাখ ডলার। ফলে এক বছরে কৃষিপণ্য রপ্তানি কমেছে ৯.২ শতাংশ। আগস্ট মাসে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয় প্রায় ৪৪৩ কোটি ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৩.১ শতাংশ বেশি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

