সীতাকুণ্ডে এসপি মাসুদ

অপরাধের শেকড় উপড়ে ফেলতে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ডাক

অপরাধের শেকড় উপড়ে ফেলতে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ডাক
দক্ষিণ ভাটেরখীল মসজিদ প্রাঙ্গণে সুধী সমাবেশে বক্তব্য রাখেন এসপি মাসুদ। ছবি: আমার দেশ

দীর্ঘদিনের ভয়, আতঙ্ক ও নীরবতার দেয়াল ভেঙে সাধারণ মানুষ যখন অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাহসী অবস্থান নেয়, তখনই সমাজে শান্তি ও নিরাপত্তার পরিবেশ ফিরে আসে। অপরাধ দমনে শুধু পুলিশের অভিযান নয়, প্রয়োজন জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ, সময়মতো তথ্য প্রদান এবং সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা। সম্মিলিত উদ্যোগেই একটি নিরাপদ, মাদকমুক্ত ও মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠা সম্ভব বলে মন্তব্য করেছেন চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম।

রোববার (২ আগস্ট) বিকেলে উপজেলার মুরাদপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ ভাটেরখীল মসজিদ প্রাঙ্গণে আয়োজিত সুধী সমাবেশ ও উঠান বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

বিজ্ঞাপন

সমাবেশে উপস্থিত গ্রামবাসীদের উদ্দেশে পুলিশ সুপার বলেন, যদি তুমি ভয় পাও তবে তুমি শেষ, আর যদি তুমি রুখে দাঁড়াও তবেই বাংলাদেশ। তিনি বলেন, অপরাধীরা সাধারণ মানুষের ভয় ও নীরবতাকে শক্তি হিসেবে ব্যবহার করে। কিন্তু মানুষ যখন ভয় কাটিয়ে আইনের প্রতি আস্থা রেখে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তখন অপরাধীদের দৌরাত্ম্য কমে আসে এবং শান্তির পরিবেশ তৈরি হয়।

পুলিশ সুপার বলেন, শুধু একটি অপরাধীচক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। অপরাধের উৎস চিহ্নিত করে ভবিষ্যতে যেন নতুন করে আর কোনো অপরাধী তৈরি না হয়, সেই ব্যবস্থা নিতে হবে।

তিনি বলেন, আমাদের লক্ষ্য হতে হবে, নতুন করে যেন আর কোনো ‘ইরান’ তৈরি না হয়। একজন তরুণ কেন অপরাধের পথে যায়, কীভাবে সে অপরাধীচক্রের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে এবং কোথায় প্রতিরোধের ঘাটতি রয়েছে, সেসব বিষয় চিহ্নিত করে কাজ করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, অপরাধ প্রতিরোধ একটি সামাজিক দায়িত্ব। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, জনপ্রতিনিধি, সামাজিক সংগঠন ও প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া নিরাপদ সমাজ গঠন সম্ভব নয়। বিশেষ করে তরুণদের মাদক ও অপরাধ থেকে দূরে রাখতে শিক্ষা, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

স্থানীয় ইউপি সদস্য এজাহারুল ইসলামের সভাপতিত্বে এবং তরুণ সংগঠক আইনুল হক রিপনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সভায় এলাকার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশগ্রহণ করেন।

সভায় স্থানীয় বাসিন্দারা এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, মাদক, চাঁদাবাজি, কিশোর অপরাধ ও নিরাপত্তার বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেন। তারা জানান, অতীতে ভয় ও নানা চাপের কারণে অনেকেই অভিযোগ জানাতে সাহস পাননি। তবে বর্তমানে প্রশাসনের সক্রিয়তা এবং পুলিশের জনসম্পৃক্ত কার্যক্রমে মানুষের মধ্যে আস্থার পরিবেশ তৈরি হচ্ছে।

ভুক্তভোগীরা জানান, দীর্ঘদিনের আতঙ্ক কাটিয়ে এখন তারা নিরাপদ পরিবেশ চান। তারা এলাকায় নিয়মিত পুলিশি নজরদারি, মাদকবিরোধী কার্যক্রম এবং অপরাধ প্রতিরোধে স্থায়ী উদ্যোগ গ্রহণের দাবি জানান।

পুলিশ সুপার বলেন, অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তির পরিচয়, প্রভাব বা অবস্থান বিবেচনা করা হবে না। তদন্তে অপরাধের সত্যতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

একই সঙ্গে তিনি সবাইকে আইন নিজের হাতে তুলে না নেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, অপরাধের তথ্য দ্রুত পুলিশকে জানানো, অভিযোগ করা এবং তদন্ত কাজে সহযোগিতা করাই একজন সচেতন নাগরিকের দায়িত্ব। এতে প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা সহজ হয় এবং নিরপরাধ মানুষের অধিকারও সুরক্ষিত থাকে।

মাদককে সামাজিক অপরাধের অন্যতম প্রধান কারণ উল্লেখ করে পুলিশ সুপার বলেন, মাদক একটি পরিবারকে ধ্বংস করার পাশাপাশি পুরো সমাজকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাই মাদক প্রতিরোধে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি পরিবার ও সমাজকে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।

সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম) সিরাজুল ইসলাম, সীতাকুণ্ড মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ মহিনুল ইসলাম, ওসি (তদন্ত) মোহাম্মদ আলমগীরসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।

বক্তারা বলেন, কমিউনিটি পুলিশিং জোরদার, নিয়মিত জনসংযোগ এবং দ্রুত আইনি সেবা নিশ্চিত করার মাধ্যমে পুলিশ ও জনগণের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করা সম্ভব।

সমাবেশ শেষে স্থানীয়রা মাদক, সন্ত্রাস ও অপরাধমুক্ত শান্তিপূর্ণ সীতাকুণ্ড গড়ে তুলতে প্রশাসনের সঙ্গে একযোগে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। তাদের প্রত্যাশা, ভয় নয়, আইনের প্রতি আস্থা, সামাজিক ঐক্য ও সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমেই গড়ে উঠবে নিরাপদ ও মানবিক জনপদ।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন