ইতিহাসে এই প্রথম চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের সলিমপুর ইউনিয়নে অনুষ্ঠিত হয়েছে ব্যতিক্রম এক গণশুনানি। অনুষ্ঠানে স্থানীয় জনগণের প্রত্যাশা ও প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিয়ে সরাসরি সমস্যার সমাধানে প্রশাসনের সক্রিয় ভূমিকার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম।
মঙ্গলবার সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত দীর্ঘ গণশুনানির পরে তিনি সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর কর্মকর্তাদের জনগণের সমস্যা সমাধানের আদেশ দেন। এই শুনানিতে শত শত নারী পুরুষ এলাকার বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফখরুল ইসলামের সভাপতিত্বে ও সহকারি ভূমি কমিশনার আব্দুল্লাহ আল মামুনের সঞ্চালনায় গণশুনানিতে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন-চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ফরিদা খানম। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন- অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সাদি উর রহিম জাদিদ ও উপজেলা পরিষদের বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তারা।

এ সময় জেলা প্রশাসক বলেন, চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় তথ্য মন্ত্রণালয়ের কোনো স্থাপনা হবে না। সেখানে আপনারাই থাকবেন। তবে সেখানে চট্টগ্রাম কারাগার স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। জনগণের কল্যাণ বিবেচনায় পরবর্তীতে যদি সরকারি স্থাপনার প্রয়োজন হয়। তা তখন পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
গণশুনানিতে অংশ নেওয়া সাধারণ মানুষ তাদের এলাকার বিভিন্ন সমস্যার কথা সরাসরি তুলে ধরেছেন। জঙ্গল সলিমপুরের অবহেলিত জনগোষ্ঠীর বঞ্চনার কথা, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা ব্যবস্থার দুরবস্থা, রাস্তাঘাট, কালভার্ট ও বিদ্যুৎ সংযোগ, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যানজট, মাদক ও জেলে সম্প্রদায়ের সমস্যা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সহ নানান সমস্যা ও দুর্দশার কথা জেলা প্রশাসক মনোযোগ সহকারে শোনেন এবং তাৎক্ষণিকভাবে এসব সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেন। জটিল বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে তিনি আশ্বাস দেন, প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় সমাধান করা হবে।

তিনি বলেন, জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় প্রায় ২ লাখ মানুষের বসবাস, কিন্তু সেখানে কোন হাসপাতাল নেই, বিদ্যুৎ নেই, রাস্তাঘাট নেই, এলাকার মানুষ শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত, কোন মানুষ অসুস্থ হলে তাকে হাসপাতালে নেয়ার কোন সুব্যবস্থা নেই। এমনকি নাগরিকদের স্মার্ট কার্ড পর্যন্ত নেই। এই অঞ্চলের বিশাল জনগোষ্ঠী নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত একথাগুলো বলতে গিয়ে জেলা প্রশাসক অত্যন্ত মর্মাহত হন। তিনি বিশেষ করে জঙ্গল সলিমপুরের নাগরিকদের আশ্বস্ত করে বলেছেন, প্রথমে আপনাদের স্মার্ট কার্ডের ব্যবস্থা করে দেওয়া হবে। এরপর পর্যায়ক্রমে স্বাস্থ্যসেবা, রাস্তা, কালভার্ট, স্কুল ও মসজিদ সহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ করে দিতে সংশ্লিষ্ট দপ্তর গুলোকে নির্দেশ দিয়েছেন।

জেলা প্রশাসক আরও বলেন, মানুষকে আর সেবা পেতে অফিসে অফিসে ঘুরতে হবে না। এখন থেকে প্রশাসন নিজেই জনগণের কাছে যাবে। চট্টগ্রাম জেলার ১৯১টি ইউনিয়নের মধ্যে ৩৬টিতে নেই কোন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি। এ প্রেক্ষাপটে জেলা প্রশাসনের এই সরাসরি গণশুনানি একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এই উদ্যোগ শুধু প্রশাসনিক সেবা নয়, বরং সুশাসন, জবাবদিহিতা এবং জনগণের সঙ্গে আস্থার সম্পর্ক গঠনের পথও উন্মুক্ত করবে।
অনুষ্ঠানের শুরুতে জেলা প্রশাসক জারুল গাছের একটি চারা রোপণ করেন, যা পরিবেশ ও টেকসই উন্নয়নের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়।
গণশুনানির মানবিক দিকটিও ছিল প্রশংসনীয়। গত ১৮ আগস্ট ভোরে চট্টগ্রাম সিটি গেইট এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৫ জেলে পরিবারের হাতে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়। তাছাড়াও ১০ জন মেধাবী শিক্ষার্থীকে দেওয়া হয় শিক্ষাবৃত্তি।
গণশুনানি শেষে জেলা প্রশাসক ইউনিয়ন পরিষদের বিভিন্ন কার্যক্রম পরিদর্শন করেন এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আরও সক্রিয় ও জনবান্ধব হওয়ার নির্দেশ দেন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

