চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ থানার দুই শিশু-কিশোরকে বয়স জালিয়াতির মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর অভিযোগ উঠেছে দুই পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে। অভিযুক্তরা হলেন সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) নূর মোহাম্মদ ও অ্যাসিস্ট্যান্ট সাব-ইন্সপেক্টর (এএসআই) আপেল মাহমুদ।
ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর পক্ষ থেকে ইতিমধ্যেই এই দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ও ডিআইজি চট্টগ্রাম রেঞ্জসহ প্রশাসনের একাধিক উচ্চপর্যায়ের দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।
এই চাঞ্চল্যকর অভিযোগপত্রের কপি এবং আনুষঙ্গিক দালিলিক প্রমাণ এই প্রতিবেদকের হাতে এসেছে। পুলিশ সদর দপ্তরের আইজিপি’স কমপ্লেইন সেলে জমা পড়া লিখিত অভিযোগপত্র (রেফারেন্স: সন্দ্বীপ থানা মামলা নং-০৬, ২৫/০৪/২০২৬) পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত ২৫ এপ্রিল রাতে পুলিশের ওপর এক হামলার ঘটনার পর এসআই নূর মোহাম্মদ ও এএসআই আপেল মাহমুদ মিনহাজ ও ইমরান নামে দুই কিশোরকে রাস্তা থেকে পুলিশের গাড়িতে তুলে নেয়। এরপর তাদের পরিবারের কাছে অনৈতিকভাবে মোটা অঙ্কের অর্থ দাবি করা হয়। দরিদ্র পরিবারের পক্ষে সেই অর্থ দেওয়া সম্ভব না হওয়ায় আক্রোশবশত জেনেশুনে অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরদের বয়স বাড়িয়ে জালিয়াতির মাধ্যমে পুলিশের ওপর হামলার মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই অনৈতিক অর্থ দাবি ও বয়স জালিয়াতির মূল শিকার হয়েছে পনের বছর বয়সী কিশোর মিনহাজ ও সতের বছর বয়সী কিশোর ইমরান হোসেন নিলয়। মিনহাজের বাবা মোশাররফ ও ইমরানের মা সাহেদা বেগম যৌথভাবে প্রশাসনের উচ্চমহলে এই অভিযোগ দায়ের করেছেন।
অভিযোগপত্র অনুযায়ী, ঘটনার রাতে কথিত ঘটনাস্থল (সারিকাইত ৭ নং ওয়ার্ড) থেকে প্রায় ৩ কিলোমিটার দূরে শিবেরহাট এলাকা থেকে এই কিশোরদের আটক করা হয়। অভিযোগ পত্র থেকে জানা যায়, সেদিন রাতে ইমরান তার অসুস্থ মায়ের জন্য ওষুধ কিনতে বাজারে গিয়েছিলেন এবং মিনহাজ স্থানীয় একটি গ্যারেজে গাড়ি মেরামতের কাজ করছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শী ও এলাকার সিসিটিভি ফুটেজেও তাদের নির্দোষ থাকার প্রমাণ রয়েছে। অথচ অর্থ না পেয়ে এই দুই কিশোরের ডিজিটাল জন্মনিবন্ধন সনদকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে মিনহাজকে উনিশ বছর এবং নিলয়কে বিশ বছর বয়স দেখিয়ে সাধারণ কয়েদিদের সাথে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
ইমরানের পরিবার জানায়, মায়ের ওষুধ কিনতে যাওয়া নিরপরাধ ছেলেকে এভাবে দাগি আসামি সাজানোয় পুরো পরিবার মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে। অন্যদিকে, মিনহাজের বাবা একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী এবং ঘরে আরও তিনটি ছোট ছোট অবুঝ ভাইবোন রয়েছে তার। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ছেলের এই অনাকাঙ্ক্ষিত অনুপস্থিতিতে পুরো পরিবারটি এখন চরম মানবিক ও খাদ্য সংকটে পড়েছে।
সন্দ্বীপ থানার ওসি সুজন হালদার বলেন, মামলাটি বর্তমানে তদন্তাধীন রয়েছে। এজাহারে বয়স কম-বেশি হওয়ার বিষয়টি আমরা খতিয়ে দেখছি। তবে মাঠপর্যায়ের কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যদি অর্থ দাবি বা ব্যক্তিগত আক্রোশের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে সন্দ্বীপ থানা পুলিশ তার দায় নেবে না। তদন্ত অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আমজাদ হোসেন বলেন, উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে। কোনো নিরপরাধ কিশোর যেন অন্যায়ের শিকার না হয় এবং শিশু আইন যেন কোনোভাবেই লঙ্ঘিত না হয়, সে বিষয়ে স্থানীয় থানা পুলিশকে বার্তা দেওয়া হয়েছে।"
উপজেলা সমাজসেবা অফিসার ও প্রবেশন কর্মকর্তা মোহসীন আলম বলেন, বিষয়টি জানার পর আমরা আদালতের মাধ্যমে এই শিশুদের প্রকৃত বয়স নির্ধারণ এবং তাদের নিরাপদ হেফাজত বা জামিনের জন্য প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ ও সামাজিক অনুসন্ধান প্রতিবেদন' তৈরির কাজ শুরু করেছি।
আইনজীবী ও শিশু আইন বিশেষজ্ঞ ড. রুকাইয়া পারভীন আমার দেশকে বলেন, শিশু আইন-২০১৩ অনুযায়ী, অনূর্ধ্ব ১৮ বছর বয়সী যে কেউ আইনত শিশু। ডিজিটাল জন্মনিবন্ধন থাকার পরও জেনেশুনে বয়স বাড়িয়ে তাদের প্রাপ্তবয়স্কদের সাধারণ কারাগারে পাঠানো একটি গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ ও মানবাধিকার লঙ্ঘন। তদন্তে এটি প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের চাকরিচ্যুতিসহ কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরে জমা পড়া এই লিখিত অভিযোগের পর এখন দেখার বিষয়, উচ্চতর তদন্তের মাধ্যমে এই কিশোরদের মুক্তি এবং অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত দৃশ্যমান কোনো বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয় কি না। আইনের রক্ষক যখন নিজেই জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে শিশুদের জীবন বিপন্ন করে তোলে, তখন ন্যায়বিচারের পথ কতটুকু সুগম -সেই প্রশ্নই এখন মানুষের মুখে মুখে।
জেডএম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

