কুমিল্লার সিসিএন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জান্নাতুন নাঈম ফারিহার মৃত্যুতে শোকে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলার দৌলখাঁর ইউনিয়নের কান্দাল গ্রাম।
ময়নাতদন্ত, থানা পুলিশ, মামলা করার পর বুধবার দিবাগত রাত ১টায় জানাযা শেষে বাড়ির পাশেই সমাহিত করা হয় ফারিহাকে। মেধাবী ফারিহার সঙ্গে তার স্বপ্নগুলোও যেন চিরতরে চাপা পড়ে আছে বাঁশ, চাটাই আর মাটির নিচে।
সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার এক বুক আশা নিয়ে আমৃত্যু লড়াই করেছে মেয়েটি। শুরুতে প্রেমের সম্পর্ক পরবর্তীকালে দুই পরিবারের সমঝোতায় বিয়ে হয় তাদের। স্বামী বেকার হওয়াতে, বিবাহিত হওয়ার পরও নিজের পড়ালেখার খরচ সহ অন্যান্য খরচ যোগাতে কুমিল্লা শহরে কয়েকটা টিউশনি করতেন ফারিহা। সেই টাকাতেও জামাই-শাশুড়ি ভাগ বসাত। ফ্ল্যাটের কাজের সময় আমার মেয়ে ৫০ হাজার টাকা দিয়েছে শাশুড়িকে। কান্না করতে করতে এ কথাগুলো বলছিলেন নিহতের মা কোহিনূর বেগম। তিনি জানান, বিয়ের আট মাসে একটুও শান্তি পায়নি মেয়েটি। ফ্ল্যাট সাজাতে, ফার্নিচারের জন্য ফারিহাকে যৌতুকের জন্য ভিন্ন ভিন্ন কৌশলে বিভিন্ন সময় চাপ দিয়েছে ছেলের মা আফরোজা বেগম ও পাষণ্ড স্বামী মেহেদী হাসান হৃদয়। কিছু হলেই, অত্যাচার চালাত হৃদয়। আমেরিকা প্রবাসী এক মেয়ের সঙ্গে হৃদয়ের সম্পর্ক-যোগাযোগ, মাদকাসক্ত, বেকার জীবন নিয়ে তাদের মধ্যে দাম্পত্য কলহ লেগেই থাকত বলে অভিযোগ করেন নিহতের মা কোহিনূর বেগম। হৃদয় সারাদিন শুয়ে বসে, মুভি দেখে দিন পার করত, কোনো চাকরি করার কথা বললেই শুরু হতো অত্যাচার।
নিহতের ছোট ভাই রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ৫ম সেমিস্টারের ছাত্র জোবায়ের হোসেন খন্দকার ফাহিম অভিযোগ করে বলেন, কিছু হলেই আমার বোনের গায়ে হাত তুলতেন হৃদয়। বিভিন্ন সময় আপুর শরীরে আঘাতের চিহ্ন আমাদের দেখিয়েছেন। শত অত্যাচার সহ্য করেও তিনি সংসার ধরে রেখেছিলেন। তিনি জানান, তার বোনকে রাতেই মেরে আত্মহত্যার নাটক সাজিয়েছে পুরো পরিবার। এভাবে কেউ ফাঁস লাগাতে পারে না, ছবিতে দেখেছি হাঁটু চেয়ারের উপরে ঠেস দেওয়া, আরেক পা খাটের ওপর বাঁকা হয়ে আছে, চেয়ার-বিছানা সবই মনে হয়েছে সাজানো। আমরা এই হত্যার দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই। নিহতের বাবা স্কুলশিক্ষক মো. হানিফ বলেন, আমার কলিজার টুকরা ফারিহার লাশের দুই পায়ের হাঁটুর নিচে অনেক আঘাতের চিহ্ন, দুই হাতে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে।
স্থানীয় দৌলখার উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শাহ আলম মজুমদার জানান, নিহত ফারিহা অত্যন্ত মেধাবী নম্র-ভদ্র স্বভাবের মেয়ে ছিল। তার মৃত্যুতে আমরা হতবাক, আমরা এই হত্যার বিচার চাই।
এদিকে, বৃহস্পতিবার দুপুরে নিহতের গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলার দৌলখাঁর ইউনিয়নের কান্দাল গ্রামে নিহতের পরিবারের সঙ্গে দেখা করে সমবেদনা ও পরিবারকে সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দেন সিসিএন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান ড. তারিকুল ইসলাম চৌধুরী, রেজিস্ট্রার অধ্যাপক জামাল নাছের।
এ সময় বিশ্ববদ্যালয়ের পরিচালক প্রশাসন (অবৈতনিক) ইফতেখারুল ইসলাম চৌধুরী সিয়াম, আইন বিভাগের চেয়ারম্যান সহকারী অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান, সিএসই বিভাগের কো-অর্ডিনেটর মো. সাইফুল ইসলাম, ত্রিপল-ই বিভাগের কো-অর্ডিনেটর মেহেদী হাসান বাপ্পী, সিএসই বিভাগের প্রভাষক নুসরাত জাহান, জনসংযোগ কর্মকর্তা এমদাদুল হক সোহাগ উপস্থিত ছিলেন।
কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি তদন্ত শরীফ ইবনে আলম জানান, রাতেই আত্মহত্যার প্ররোচনার অভিযোগে স্বামী-শ্বশুরসহ পাঁচ জনের নামে মামলা করেছেন নিহত শিক্ষার্থীর বাবা মো. হানিফ। ময়নাতদন্তের রিপোর্টে যদি হত্যার আলামত প্রমাণিত হয় তাহলে হত্যা মামলায় চার্জশিট দেওয়া হবে। প্রধান অভিযুক্ত মেহেদী হাসান হৃদয় পলাতক রয়েছে, তাকে গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত আছে।
উল্লেখ্য, গত মঙ্গলবার (৫ মে) দিবাগত রাতে কুমিল্লা নগরীর মনোহরপুর মুন্সেফবাড়ি এলাকার শ্বশুর বাড়ির ফ্ল্যাট থেকে সিসিএন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগের ১২তম ব্যাচের শিক্ষার্থী জান্নাতুন নাঈম ফারিহার (২৩) লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
এ ঘটনার পর নিহতের পরিবারের দাবি, এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। নিহতের ছবি নেটে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি হত্যাকাণ্ড বলে সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবিতে সারা দেশে আলোচিত বিষয় হয়ে ওঠে। কুমিল্লার স্থানীয় ও জাতীয় মিডিয়ায় বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে ফুটে ওঠে।
এদিকে, সিসিএন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এ ঘটনায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি তুলেছেন। ক্ষোভ প্রকাশ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অভিমত প্রকাশ করছেন তারা। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে অবস্থান ও কুমিল্লা নগরীতে কঠোর আন্দোলনের প্রস্ততি নিচ্ছেন তারা।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

