কুমিল্লা কেন্দ্রীয় সমবায় ব্যাংক লিমিটেডের চেয়ারম্যান পদ দখলে নিতে কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি আমিরুজ্জামান ভূঁঞা মরিয়া হয়ে উঠেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
সমবায় সমিতি আইন, ২০০১-এর ১৯(২)(খ) অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি কেন্দ্রীয় বা জাতীয় সমবায় সমিতির ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য নির্বাচিত হতে চাইলে নির্বাচনের আগের তিন বছর সংশ্লিষ্ট প্রাথমিক সমবায় সমিতির সদস্য থাকতে হবে এবং ওই তিন বছরে অনুষ্ঠিত সংশ্লিষ্ট প্রাথমিক সমিতির অন্তত দুটি বার্ষিক সাধারণ সভায় উপস্থিত থাকতে হবে।
অভিযোগ রয়েছে, আমিরুজ্জামান ভূঁঞা গত ৩১ আগস্ট মনোহরপুর ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বহুমুখী সমবায় সমিতি লিমিটেডের সদস্য হয়েছেন। এর আগে তিনি কুমিল্লা কেন্দ্রীয় সমবায় ব্যাংক লিমিটেডের অধিভুক্ত কোনো সমিতির সদস্য ছিলেন না বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে চলমান নির্বাচনে তার প্রার্থিতার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এদিকে, মনোহরপুর ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বহুমুখী সমবায় সমিতি লিমিটেডও দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকের কার্যক্রমে সক্রিয় নয় বলে অভিযোগ রয়েছে। গত পাঁচ বছর ধরে সমিতিটি ব্যাংকের বার্ষিক সাধারণ সভায় অংশ নিতে পারেনি বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।
এ অবস্থায় গত দুই মাস ধরে কুমিল্লা কেন্দ্রীয় সমবায় ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদে বসতে আমিরুজ্জামান চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন ব্যাংকের বর্তমান চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট কাজী নাজমুস সাদাত।
বুধবার বিকেলে ব্যাংক ভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে কাজী নাজমুস সাদাত বলেন, তার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ তোলা হয়েছে, সেগুলো সত্য প্রমাণিত হলে তিনি পদত্যাগ করবেন এবং অর্থদণ্ডও দেবেন। নিজের বিরুদ্ধে তদন্ত চেয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে চিঠি দিয়েছেন বলেও জানান তিনি।
আমিরুজ্জামান ভূঁঞাকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি আমিরুজ্জামান ভূঁঞা ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদ দখলে নিতে চান। এ জন্য তিনি বহু আগে থেকেই চেষ্টা করছেন।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন কুমিল্লা কেন্দ্রীয় সমবায় ব্যাংক লিমিটেডের সাবেক সভাপতি ও কুমিল্লা জেলা সমবায় ইউনিয়নের সভাপতি সিরাজুল হক, আমড়াতলী সমবায় সমিতির সভাপতি শফিকুল ইসলাম এবং জোড়কানন পূর্ব ইউনিয়ন বহুমুখী সমবায় সমিতির সভাপতি খন্দকার সোহেল রেজা।
কুমিল্লা জেলা সমবায় ইউনিয়নের সভাপতি সিরাজুল হক বলেন, ‘আমিরুজ্জামান কোনো সমবায়ীই নন। আজকাল বিএনপির মধ্যে অনেকে পদ পেয়েছেন, তাকেও এটি দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে।’
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আমিরুজ্জামান ভূঁঞা। তিনি বলেন, ‘উনি (নাজমুস সাদাত) মুরব্বি মানুষ। উনি যা বলেছেন, তা সত্য নয়। আমি সমবায়ী। ব্যাংক নিয়ে তার সঙ্গে কোনো আলোচনা করিনি। অথচ তিনিই সাংবাদিকদের সামনে আমার ফাঁসি দাবি করছেন। উনি মামলাবাজ ।
আমীরুজ্জামান আমীর আরও বলেন, গত ১৬ বছর নাজমুস সাদাত আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সাবেক এমপি আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহারের সঙ্গে চলাফেরা করেছেন এবং টুঙ্গিপাড়ায় গিয়ে বঙ্গবন্ধুর মাজার জিয়ারত করেছেন এমন প্রমাণ তাদের কাছে রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘বিএনপির নেতাকর্মী হিসেবে গত ১৬ বছরে আমরা তাকে কখনো বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত দেখিনি। বরং এই দীর্ঘ সময়ে ওই ব্যাংকে লুটপাটের অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে আমাদের কাছে হাজার হাজার প্রমাণ রয়েছে।’
ব্যাংক দখলের অভিযোগ অস্বীকার করে আমীর বলেন, ‘আমরা দলীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে কোনো প্রতিষ্ঠান দখল করব এমন প্রশ্নই আসে না। আমরা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল আইনের মাধ্যমে ন্যায়বিচার চাইব। কারও বিরুদ্ধে শুধু মুখে মুখে অপবাদ দেওয়া কোনোভাবেই ঠিক নয়।’
ব্যাংকের বর্তমান চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট কাজী নাজমুস সাদাতের রাজনৈতিক ও পেশাগত পরিচয়ও দীর্ঘদিনের। তিনি কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক সমবায়বিষয়ক সম্পাদক ও বরুড়া উপজেলা বিএনপির সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি। বর্তমানে তিনি বরুড়া উপজেলা বিএনপির উপদেষ্টা। ২০১২ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত তিনি জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম কুমিল্লা জেলা শাখার সভাপতি ছিলেন। কুমিল্লা জেলা আইনজীবী সমিতির দুবার সভাপতি এবং একবার সাধারণ সম্পাদক ছিলেন তিনি। কুমিল্লা আইন কলেজের ভিপি এবং কুমিল্লা আদালতের পিপিও ছিলেন।
কুমিল্লার আদালতে বিএনপি চেয়ারপারসন প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়া, সাবেক মন্ত্রী প্রয়াত এ কে আনোয়ার, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী এবং কুমিল্লা-৬ আসনের সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরীর মামলায় বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের প্যানেলেও তিনি ছিলেন।
কুমিল্লা কেন্দ্রীয় সমবায় ব্যাংকটি ১৯১৩ সালের ২০ জুন প্রতিষ্ঠিত হয়। জেলার ৯টি সংসদীয় আসনের ১৭৪টি সমিতি এ ব্যাংকের সদস্য বলে সংশ্লিষ্টদের তথ্য। এর মধ্যে বরুড়া উপজেলার সমিতির সংখ্যাই বেশি।
এমএইচ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

