বান্দরবানের সবুজ পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে রয়েছে বহু অচেনা অরণ্য, ঝিরিপথ আর দুর্গম পর্বতচূড়া। অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় ট্রেকারদের কাছে যে নামগুলো রোমাঞ্চের নতুন মাত্রা যোগ করে, তার অন্যতম আলীকদম উপজেলার চিম্বুক রেঞ্জের গভীর পাহাড়ি অরণ্যে অবস্থিত ‘লিবলুহুং’। আদিম বন্য সৌন্দর্য, ঘন জঙ্গল এবং চরম চ্যালেঞ্জিং ট্রেইলের জন্য ট্রেকিংপ্রেমীদের কাছে এটি এখন এক আরাধ্য গন্তব্য। এই পর্বতের উচ্চতা ২,৭০০–২,৮০০ ফুট।
স্থানীয় ম্রো বা পাহাড়ি ভাষায় ‘লিবলু’ শব্দের অর্থ কচ্ছপের মাথা এবং ‘হুং’ শব্দের অর্থ পাহাড়। দূর থেকে এই পাহাড়ের চূড়াটির আকৃতি দেখলে মনে হয় এক বিশাল কচ্ছপ তার মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। কচ্ছপের মাথার সঙ্গে অদ্ভুত ভৌগোলিক সাদৃশ্য থেকেই যুগ যুগ ধরে এই পাহাড়ের নাম প্রচলিত হয়ে আসছে ‘লিবলুহুং’।
এটি চিম্বুক পর্বতশ্রেণির অংশ হিসেবে আলীকদমের গভীর সীমানায় অবস্থিত। চূড়ায় উঠলে দিগন্তবিস্তৃত যে দৃশ্য চোখে পড়ে, তা এক কথায় অতুলনীয়। লিবলুহুংয়ের শীর্ষ থেকে আশপাশের মদক রেঞ্জ এবং মিরঞ্জা রেঞ্জের একের পর এক সবুজ পাহাড়ের ঢেউ খেলানো দৃশ্য ট্রেকারদের সমস্ত ক্লান্তি এক নিমেষে ভুলিয়ে দেয়।
-7b508f.jpg)
লিবলুহুং পাহাড়ের চূড়ার পুরো ট্রেইলজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে প্রকৃতির বৈচিত্র্যময় রূপ ও চ্যালেঞ্জ। ভ্রমণযাত্রায় ট্রেকারদের যেসব অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়। সূর্যের আলো কোনোমতে মাটিতে পৌঁছায় এমন ঘন বাঁশবন ও বন্য গাছগাছালির মধ্য দিয়ে এগোতে হয়। সরু রিজলাইন ধরে হাঁটার সময় দুপাশে খাড়া পাহাড়ের খাদ এক গা শিউরে ওঠা রোমাঞ্চ তৈরি করে। ট্রেইলের অনেকটা পথ পাড়ি দিতে হয় পিচ্ছিল পাথুরে ঝিরি, ছোট-বড় ঝরনা এবং উজান নদী ধরে। পাহাড়ি স্ফটিক স্বচ্ছ ঠান্ডা পানি যাত্রার ক্লান্তি দূর করতে সাহায্য করে। ট্রেইলজুড়ে দেখা মেলে পাহাড়ি ম্রো ও অন্যান্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী পাড়া ও জুম চাষের দৃশ্য। পাহাড়ি মানুষের জীবনযাত্রা, তাদের মেহমানদারী এবং উঁচু পাহাড়ে জুমঘরের বিশ্রাম এই অ্যাডভেঞ্চারে যোগ করে ভিন্ন মাত্রা।
অভিযানের জন্য প্রস্তুতি ও সতর্কতা
লিবলুহুং সাধারণ পর্যটক বা শখের দর্শনার্থীদের জন্য কোনো সহজ ভ্রমণের জায়গা নয়। দীর্ঘ, পিচ্ছিল এবং চরম দুর্গম হওয়ায় এই ট্রেইলে নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা সবচেয়ে বেশি জরুরি। সীমান্ত ও পাহাড়ি এলাকার নিরাপত্তাজনিত কারণে স্থানীয় প্রশাসন (উপজেলা প্রশাসন) থেকে পূর্বানুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক।
গভীর বনে পথ হারানোর ঝুঁকি এড়াতে অভিজ্ঞ ও নিবন্ধিত স্থানীয় গাইড ছাড়া এই ট্রেইলে প্রবেশ না করার জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। এছাড়াও পর্যটকদের প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের মধ্যে রয়েছে হাইকিং বুট, ফার্স্ট এইড কিট, পর্যাপ্ত জোঁক-প্রতিরোধক তেল বা লবণ, টর্চলাইট, ওয়াটারপ্রুফ ব্যাগ ও শুকনো খাবার সঙ্গে রাখতে হবে।
আলীকদমের লিবলুহুং প্রকৃতির আদিম নিস্তব্ধতার এক অনন্য মাধ্যম। নাগরিক কোলাহল ছেড়ে যারা বুনো জঙ্গল, উঁচুপাহাড়ের হাওয়া আর মেঘের কাছাকাছি যেতে চান, তাদের জন্য নিয়মকানুন ও সতর্কতা মেনে লিবলুহুং জয় করা জীবনের অন্যতম সেরা এক স্মৃতি হয়ে থাকবে।
ট্রেকিং রুট
ঢাকা থেকে সরাসরি বাস বা কক্সবাজারগামী বাসে চকরিয়া নেমে জিপ/বাস/সিএনজিতে আলীকদম পৌঁছানো যায়। আলীকদম শহর বা পানবাজার থেকে প্রয়োজনীয় বাজার-সদাই নিয়ে চাঁদের গাড়ি, মোটরবাইক, নৌকা বা হেঁটে দুছরি বাজার, আমতলী ঘাট কিংবা ২১ কিলো এলাকার দিকে যেতে হয়।
সম্ভাব্য মূল পথ
আলীকদম আমতলী ঘাট → দুছরি বাজার → মেনিয়াং পাড়া → খেমচং পাড়া → রুংরাং/ক্রিসতং ট্রেইল → লিবলুহুং সামিট → লিমানহুং বা ফেরত রুট।
সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ ও শারীরিক প্রস্তুতি
খাড়া উঁচু-নিচু পথ, ভেজা ও পিচ্ছিল পাথর, ঘন জঙ্গলে পথ চেনার জটিলতা, সরু পাহাড়ি রিজ, পানির সীমাবদ্ধতা, গরম-আর্দ্রতা, বর্ষায় জোঁক ও আকস্মিক ঢলের ঝুঁকি এবং মোবাইল নেটওয়ার্ক ও চিকিৎসা সুবিধার অভাব। ট্রিপের অন্তত ৩–৪ সপ্তাহ আগে নিয়মিত হাঁটা, সিঁড়ি ওঠা, স্কোয়াট, হালকা দৌড় ও ব্যাকপ্যাক নিয়ে হাঁটার অনুশীলন করা প্রয়োজন।
এমএইচ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

