আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

জামাই মেলা এখন মাছের মেলা, কোটি টাকার বেচাকেনা

শরীফ ইকবাল রাসেল, নরসিংদী

জামাই মেলা এখন মাছের মেলা, কোটি টাকার বেচাকেনা

নরসিংদীর পলাশ উপজেলার বরাব এলাকায় প্রতি বছর বসে কুঞ্জমেলা। আর একে ঘিরে বসে ‘মাছের মেলা’। দুইশ আটানব্বই বছর ধরে চলে আসা মেলাটি মাছের মেলা হলেও এখন রূপ নিয়েছে জামাই মেলায়।

এই মেলা থেকে আশপাশের গ্রামের জামাইরা সবচেয়ে বড় মাছ কিনে শ্বশুরবাড়ি বেড়াতে যান। এ কারণে মেলার সময় আশপাশের গ্রামগুলোতে বিরাজ করে উৎসবের আমেজ। মূলত এটা মাছের মেলা হলেও কালের বিবর্তনে জামাই মেলা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। প্রতি বছরের পৌষ মাসের দ্বিতীয় সোমবার পলাশ উপজেলার জিনারদী ইউনিয়নের বরাব এলাকায় শ্রী শ্রী কানাইলাল জিউর মন্দিরে দেড় মাসব্যাপী রাধাকৃষ্ণের কীর্তন হয়ে থাকে। আর কীর্তন শেষে রাধাকৃষ্ণের যুগলবন্দি উপলক্ষে মেলাটি বসে। মেলার দ্বিতীয় দিন কাকডাকা ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত চলে মাছ কেনাবেচার ধুম। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে শতাধিক মাছ বিক্রেতা বড় বড় মাছ নিয়ে বসেন মেলায়। এ নিয়ে মাছ ব্যবসায়ীদের মধ্যে প্রতিযোগিতাও হয়—কে কত বড় মাছ মেলায় আনতে পারেন।

বিজ্ঞাপন

অন্যদিকে স্থানীয় জামাই-শ্বশুরদের মধ্যেও বড় মাছ কেনার নীরব প্রতিযোগিতা চলে। মেলায় নিজ এলাকা ছাড়াও বিভিন্ন স্থান থেকে ভক্তরা ছুটে আসেন মাছ কিনতে, আবার কেউ আসেন মাছ দেখতে। মেলায় সামুদ্রিক চিতল, বাঘাইর, আইড়, বোয়াল, রুই, কাতল, কালবাউশ, পাঙাশ, গলদা চিংড়ি ও রূপচাঁদাসহ হরেক রকম মাছ ওঠে। মেলায় প্রতি বছরই বিক্রি হয় কোটি টাকার মাছ।

সরেজমিনে মেলায় গিয়ে দেখা গেছে, মাছ বিক্রেতারা নানা অঙ্গভঙ্গি করে সুর ধরে ডেকে ক্রেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন। কেউ কেউ বড় আকৃতির মাছ উপরে তুলে ধরে ক্রেতাদের ডাকছেন। এটি এক সময় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মেলা হলেও সময়ের সাথে সাথে এখন তা সার্বজনীন উৎসবে রূপ নিয়েছে।

স্থানীয়রা জানান, প্রায় দুইশ আটানব্বই বছর ধরে আশপাশের গ্রামের জামাইরা সবচেয়ে বড় মাছ কিনে শ্বশুরবাড়ি বেড়াতে যান। এ কারণে মেলার সময় আশপাশের গ্রামগুলোর ঘরে ঘরে বিরাজ করে উৎসবের আমেজ। মূলত এটি মাছের মেলা হলেও সবাই এটাকে জামাই মেলাই বলেন।

আয়োজকদের মধ্যে মন্দির কমিটির সাধারণ সম্পাদক মধুসূদন দাস জানান, স্থানীয় লোকজন ছাড়াও বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বহু মানুষ আসেন। প্রতি বছর এই এলাকার বরাব শ্রী শ্রী কানাইলাল জিউর মন্দিরে মাসব্যাপী লীলাকীর্তন হয়ে থাকে। এই কীর্তনের যুগলমিলন হয় পৌষ মাসের দ্বিতীয় সোমবার, আর তাই এই সোমবারেই মাছের মেলাটি বসে। মেলাটি তিন দিন স্থায়ী হয়। মেলায় মাছ ছাড়াও আসবাবপত্র, খেলনা, মিষ্টি, বস্ত্র, হস্ত ও কুটির শিল্পের নানা পণ্যের আমদানি হয়।

তিনি আরও জানান, শুরুতে মেলাটি অনুষ্ঠিত হতো ক্ষুদ্র পরিসরে। এখন এটি উৎসবে পরিণত হয়েছে। সময়ের ব্যবধানে এ মেলাটি এখন সার্বজনীন উৎসবে রূপ নিয়েছে। এখানে শুধু মাছ নয়, এ মেলাকে কেন্দ্র করে বস্ত্র, হস্ত, চারু ও কারুশিল্প, প্রসাধনী, ফার্নিচার, খেলনা, তৈজসপত্র ও মিষ্টির সমাহার ঘটে।

স্থানীয় জিনারদী ইউপি চেয়ারম্যান কামরুল ইসলাম গাজী বলেন, মেলাকে ঘিরে আশপাশের মানুষ ছাড়াও দূর-দূরান্ত থেকে বহু লোকের সমাগম ঘটে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যাতে অবনতি না ঘটে, সেজন্য পরিষদের পক্ষ থেকে গ্রাম পুলিশ ও থানা থেকে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। এলাকায় মাছের এই মেলা স্থানীয়দের জন্য একটি বিশেষ উৎসব। একে অপরের বাড়িতে বেড়ানো আর খোঁজখবরের মধ্য দিয়ে চলে কুশল বিনিময়। এখানে দেখা মেলে সম্প্রীতির এক অনন্য মেলবন্ধন।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...