কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলসহ সারা জেলায় উৎসবের আমেজে পুরোদমে শুরু হয়েছে বোরো ধান কাটা। হাওরের ধানের মাঠে কিষান-কিষানির কর্মচাঞ্চল্যে মুখরিত হয়ে উঠেছে প্রতিটি জনপদ। তবে শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি ও ধানের দাম কম থাকায় বিপাকে পড়ছেন কৃষক।
জানা গেছে, হাওরের খালি জায়গায় বা বাড়ির সম্মুখস্থ বিশাল চত্বরে ধান মাড়াই, ধান শুকানো ও শুকনো ধান ঝেড়ে গোলায় তোলার নান্দনিক আয়োজন শুরু হয়েছে। এবার ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। ফলে এ বছর কিশোরগঞ্জের ইটনা, অষ্টগ্রাম, মিঠামইন হাওরসহ নিকলী, বাজিতপুর, তাড়াইল, করিমগঞ্জ, কটিয়াদী এবং উজান এলাকার অন্যান্য উপজেলায়ও বোরোর ফলন হয়েছে। একদল শ্রমিক ধান কাটছেন, অন্যদিকে আরেক দল শ্রমিক ধানের বোঝা মাথায় করে এনে সড়কের পাশে স্তূপ করে রাখছেন। এখান থেকে ট্রাক, লরি, টমটম ও মহিষের গাড়ি দিয়ে ধান খলায় এনে মেশিন দিয়ে মাড়াই করছেন কেউ কেউ। জমির পাশেই ধান সেদ্ধ করছেন অনেক কিষানি। কেউ আবার রোদে ধান শুকানোর কাজে ব্যস্ত। বাজারে বিক্রি করতে বস্তায় ধান ভরছেন অনেকে।
কৃষকরা জানান, একজন শ্রমিককে দৈনিক এক হাজার টাকা মজুরি দিয়ে ধান কাটাতে হচ্ছে। ধানের দাম না বাড়লে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। এদিকে ব্যবসায়ীরা জানান, ভেজা ধান কেনার পর তাদের শুকাতে হচ্ছে। তাই বর্তমানে ধানের দাম কম। এছাড়া মিল মালিকরা এখনও ধান কেনা শুরু না করায় কৃষকরা বাজারে ভালো দাম পাচ্ছেন না।
কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে বোরো ধান কাটার মৌসুমে একযোগে দেখা দিয়েছে বহুমুখী সংকট। উৎপাদন খরচের তুলনায় বাজারে ধানের দাম কম, জ্বালানি সংকটে বেড়েছে পরিবহন ব্যয়, শ্রমিক সংকটে বাড়তি মজুরি আদায় এবং হারভেস্টার মেশিন ও ডিজেলের স্বল্পতাসহ নানা প্রতিবন্ধকতায় হিমশিম খাচ্ছেন হাওরাঞ্চলের কৃষকরা।
নিকলী উপজেলার বিভিন্ন হাওর এলাকা ঘুরে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চলতি মৌসুমে ধান উৎপাদনে সার, বীজ, কীটনাশক ও সেচের খরচ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। কিন্তু বাজারে ধানের দাম তুলনামূলকভাবে কম থাকায় কৃষকরা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
বিগত বছরগুলোয় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নিকলী হাওরে ধান কাটার জন্য শ্রমিক এলেও বর্তমানে বহিরাগত শ্রমিক কম আসায় শ্রমিক সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। স্থানীয়ভাবে শ্রমিকের অভাব থাকায় যারা কাজ করছেন, তারা অতিরিক্ত মজুরি নিচ্ছেন। বর্তমানে দৈনিক ধান কাটার জন্য ৮০০ থেকে এক হাজার টাকা পর্যন্ত মজুরি দিতে হচ্ছে, যা সামনে আরো বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন কৃষকরা।
দামপাড়া গ্রামের কৃষক রফিক মিয়া বলেন, ‘শ্রমিক পাওয়া যায় না, আর যারা আছে তারা বেশি টাকা ছাড়া কাজ করতে চায় না। বাধ্য হয়ে বেশি মজুরি দিয়েই ধান কাটাতে হচ্ছে। এছাড়া পর্যাপ্ত হারভেস্টার মেশিন না থাকায় অনেক কৃষক আধুনিক পদ্ধতিতে ধান কাটার সুযোগ পাচ্ছেন না। যেসব এলাকায় মেশিন রয়েছে, সেখানেও চাহিদা বেশি থাকায় সময়মতো পাওয়া যাচ্ছে না।’
নিকলী পালপাড়া গ্রামের কৃষক বাদল পাল জানান, তিনি ১৮ একর জমিতে ধান চাষ করেছেন। ‘এবার চাষাবাদে খরচ অনেক বেশি হয়েছে, কিন্তু বাজারে ধানের দাম কম। মৌসুমি পাইকাররাও ধান কিনতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। কাটার খরচ, পরিবহন ব্যয় ও শ্রমিকের মজুরি মিলিয়ে লোকসানের আশঙ্কা রয়েছে,’ বলেন তিনি। অন্যদিকে জ্বালানি সংকটের প্রভাব পড়েছে পরিবহন খাতে। হাওর এলাকা থেকে ধান কেটে বাড়িতে আনতে নৌকা, ট্রলার ও ট্রাক্টরের ভাড়া বেড়ে গেছে। এতে ধান ঘরে তুলতে অতিরিক্ত খরচ গুনতে হচ্ছে কৃষকদের।
নিকলী সদরের আতকাপাড়া গ্রামের কৃষক গিয়াসউদ্দিন বলেন, ‘জ্বালানি সংকটের কারণে সেচ খরচ যেমন বেড়েছে, তেমনি পরিবহন ভাড়াও অনেক বেশি। নৌকা-ট্রলার ও ট্রাক্টরের মালিকরা ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছে। এতে ধান বাড়িতে আনতেই অনেক টাকা চলে যাচ্ছে।’
নিকলী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আব্দুস সামাদ বলেন, ‘হাওরাঞ্চলে ধান কাটার মৌসুমে প্রতি বছরই কিছুটা চাপ থাকে। জমির ধান ৮০ শতাংশ পাকার সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত কাটার জন্য কৃষকদের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। এখন পর্যন্ত হাওরে প্রায় ২০ শতাংশ ধান কাটা সম্পন্ন হয়েছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘নিচু এলাকায় পানি প্রবেশের বিষয়টি আমরা পর্যবেক্ষণে রেখেছি। কৃষকদের দ্রুত ধান কাটার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে, যাতে সম্ভাব্য ক্ষতি কমানো যায়।’
কিশোরগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. সাদিকুর রহমান জানান, ‘এবার জেলায় ১ লাখ ৬৮ হাজার ২৬২ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ করা হয়েছে। আর ডিজেল সংকটে এ বছর সারা দেশব্যাপী যে সমস্যাটি চলছে, এটি কিশোরগঞ্জেও বলবৎ আছে। আমরা চেষ্টা করছি নির্বিঘ্নে ডিজেল যাতে পাওয়া যায় সে ব্যবস্থা করতে।’ সরকার কর্তৃক ধানের দাম নির্ধারিত হলে ধানের দাম বাড়বে বলে তিনি জানান।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

