ঋণের বোঝা, ব্যবসায়িক দুরবস্থা, অব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামোগত সংকটে মুখ থুবড়ে পড়েছে মানিকগঞ্জের সদর উপজেলার গোলড়া বিসিক শিল্পনগরী। ১৯৮৭ সালে ১০ দশমিক ৪০ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত শিল্পনগরীটি এক সময় ছিল কর্মচঞ্চল। উদ্যোক্তা তৈরি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং স্থানীয় অর্থনীতিকে গতিশীল করার লক্ষ্যে তখন এটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। শুরুতেই এখানে গড়ে উঠেছিল প্রায় ৮০টি ছোট-বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান। কিন্তু দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে একের পর এক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বর্তমানে বরাদ্দপ্রাপ্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২৪টিতে।
এর মধ্যেও দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে ১০টি প্রতিষ্ঠান। বন্ধ ও রুগ্ণ এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আটটির বিরুদ্ধেই বিভিন্ন ব্যাংকের বন্ধক ও মামলা সংক্রান্ত জটিলতা রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান ব্যাংকের ঋণখেলাপি অবস্থায় রয়েছে। ফলে এক সময়ের কর্মচঞ্চল বিসিক শিল্পনগরী এখন অনেকটাই নীরব। বর্তমানে চালু ১৪ প্রতিষ্ঠানের কয়েকটিও রুগ্ণ অবস্থায় কোনোমতে টিকে আছে বলে জানিয়েছে বিসিক কর্তৃপক্ষ।
উদ্যোক্তাদের অতিরিক্ত ব্যাংক ঋণ, ব্যবসায়িক দুরবস্থা, অবকাঠামোগত সমস্যা, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের অভাবসহ নানা সংকটে শিল্পনগরীটি ধুঁকছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ না নিলে অবশিষ্ট শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
বিসিক সূত্রে জানা যায়, প্রতিষ্ঠার সময় এ শিল্পনগরীতে প্রায় ৮০টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছিল। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে একের পর এক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বর্তমানে বরাদ্দপ্রাপ্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমে ২৪টিতে দাঁড়িয়েছে।
এর মধ্যে নাহার গার্ডেন ও ঢাকা ফুড নামে দুটি খাদ্যজাত প্রতিষ্ঠান, ইয়ার্ন কনসার্নের একটি বস্ত্র ও বস্ত্রজাত প্রতিষ্ঠান, জে অ্যান্ড জে এসেনশিয়াল প্রডাক্টসের একটি কেমিক্যাল শিল্পপ্রতিষ্ঠান, অনিক প্যাক মেকার্সের একটি মুদ্রণ ও প্যাকেজিং প্রতিষ্ঠান, রিলায়েবলের একটি মেটাল কারখানা, এচিভ করপোরেশনের একটি প্লাস্টিক ও প্লাস্টিকজাত প্রতিষ্ঠান, রিফ্লেক্সের একটি সিরামিক কারখানা এবং পারলী ও এলুমিনার দুটি প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে।
বিসিকের তথ্য অনুযায়ী, বন্ধ ও রুগ্ণ ১০টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৮টির বিরুদ্ধে বিভিন্ন ব্যাংকের বন্ধক ও মামলা রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান ব্যাংকের ঋণখেলাপি অবস্থায় রয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিসিকের এক কর্মকর্তা বলেন, বন্ধ হয়ে যাওয়া কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তা তাদের বরাদ্দকৃত সম্পদের মূল্যের তুলনায় বেশি পরিমাণ অর্থ বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছেন। পরে ব্যবসায়িকভাবে টিকে থাকতে না পেরে তারা উৎপাদন বন্ধ করে দেন। বর্তমানে এসব প্রতিষ্ঠানের অনেক উদ্যোক্তাই এলাকায় নেই।
২০০২ সাল থেকে বিসিক শিল্পনগরীর ব্রাদার্স ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপে কাজ করছেন আমিনুর রহমান। বিসিকের বিভিন্ন কারখানার যন্ত্রপাতি মেরামত ও ওয়ার্কশপের কাজের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত থাকায় শিল্পনগরীর উত্থান-পতন খুব কাছ থেকে দেখেছেন তিনি।
আমিনুর রহমান বলেন, আগে বিসিকের প্রায় সব কারখানাই সচল ছিল। মেশিনের শব্দ আর শ্রমিকদের পদচারণায় পুরো এলাকা মুখর থাকত। এখন অনেক ফ্যাক্টরি বন্ধ। যতটুকু শুনেছি, মালিকদের অতিরিক্ত ব্যাংক ঋণের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান ঋণে জর্জরিত হয়ে বন্ধ হয়ে গেছে।
বর্তমানে বিসিক শিল্পনগরীতে ১৪টি প্রতিষ্ঠান কোনোভাবে উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছে। তবে এর সব যে সুস্থ অবস্থায় রয়েছে, তা নয়। কয়েকটি প্রতিষ্ঠান রুগ্ণ অবস্থায় টিকে আছে বলে জানিয়েছে বিসিক কর্তৃপক্ষ।
প্রতিষ্ঠাকালীন সময় থেকেই বিসিক শিল্পনগরীতে তুলা উৎপাদন করে আসছে মেসার্স কালাম কটন এন্টারপ্রাইজ। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক জহিরুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে আমাদের প্রধান সমস্যা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ। বিদ্যুৎ না থাকলে আমাদের কোনো প্রোডাকশন হয় না। এছাড়া বিসিকের ভেতরের রাস্তা ও ড্রেনেজ ব্যবস্থায় কিছু সমস্যা রয়েছে। এগুলো দ্রুত সমাধান করা জরুরি। শিল্পপ্রতিষ্ঠান সচল রাখতে বিদ্যুৎ ও অবকাঠামোগত সুবিধা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর নাহার গার্ডেন নামের একটি খাদ্যজাত প্রতিষ্ঠান আবারও উৎপাদনে ফেরার চেষ্টা করছে। প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্বপ্রাপ্ত শাহিন রানা বলেন, বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার কারণে আমাদের প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ ছিল। আমরা পুনরায় উৎপাদন শুরু করতে চাই। সে লক্ষ্যে কিছু কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নাহার গার্ডেন (প্রা.) লিমিটেড বিসিক থেকে ৪৫ হাজার স্কয়ার ফিট ভূমি বরাদ্দ নেয়। এর মধ্যে ৩১ হাজার ৫০ স্কয়ার ফিট জমির বিপরীতে বেসিক ব্যাংকের ঢাকার একটি শাখা থেকে ৩৫ কোটি টাকা ঋণ গ্রহণ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। অথচ প্রতিষ্ঠানটির স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ মিলিয়ে ওই ঋণের এক ভাগও হবে না বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
এছাড়া মেসার্স রিফ্লেক্স (প্রা.) লিমিটেড নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠান ঋণখেলাপির দায়ে বন্ধ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি বিসিক থেকে ২৭ হাজার স্কয়ার ফিট জমি বরাদ্দ নিয়ে রূপালী ব্যাংকের ঢাকার একটি শাখা থেকে ১৭ কোটি ৮৩ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ অ্যাপারেল এক্সেসরিজ লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠান ব্যাংক ঋণে দেউলিয়া হয়েছে। চার কোটি টাকা ঋণ পরিশোধ না করায় বেসিক ব্যাংক লিমিটেডের গুলশান শাখা প্রতিষ্ঠানটির ৯ হাজার ৯০০ বর্গফুট জমি নিজেদের কবজায় নিয়ে নিলাম করেছে।
অপরদিকে এলবাট্রোস ফেব্রিক্স (প্রা.) লিমিটেড ব্যাংকের ছয় কোটি টাকা ঋণ পরিশোধ না করে পালিয়ে গেছে। একইভাবে বিসিক শিল্পনগরীর ইয়ার্ন কনসার্ন লিমিটেড সোনালী ব্যাংক থেকে তিন কোটি টাকা ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ না করায় প্রতিষ্ঠানটিও দেউলিয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ অসম্ভব নয়। ব্যাংক, বিসিক, জেলা প্রশাসন ও উদ্যোক্তাদের সমন্বিত উদ্যোগে ঋণ পুনঃতফসিল, বন্ধ প্লট নতুন উদ্যোক্তার কাছে হস্তান্তর, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ, রাস্তা-ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং সহজ শর্তে অর্থায়নের ব্যবস্থা করা গেলে আবারও প্রাণ ফিরতে পারে মানিকগঞ্জ বিসিক শিল্পনগরীতে।
বিসিক মানিকগঞ্জ জেলা কার্যালয়ের উপব্যবস্থাপক আব্দুল কাদের বলেন, বর্তমানে ২৪টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৪টি মোটামুটি রানিং আছে। বাকি ১০টি রুগ্ণ অথবা বন্ধ অবস্থায় রয়েছে। এর মধ্যে ৮টির বিপরীতে ব্যাংকের মর্টগেজ রয়েছে এবং ব্যাংকের মামলাও চলমান। তারা ব্যাংকের ডিফল্টার হিসেবে রয়েছে।
তিনি আরো বলেন, ব্যাংকগুলো যদি তাদের আরো কিছুটা সুযোগ দেয় এবং বিসিকের প্লটগুলো যেহেতু হস্তান্তরযোগ্য, তাই আগের মালিকপক্ষ যদি এসব প্লট নতুন উদ্যোক্তাদের কাছে হস্তান্তর করে, তাহলে বন্ধ প্রতিষ্ঠানগুলো আবার সচল করা সম্ভব।
বিসিকের এই কর্মকর্তা জানান, বন্ধ প্রতিষ্ঠানগুলো পুনরায় চালু করতে নতুন উদ্যোক্তা খোঁজা হচ্ছে। পাশাপাশি রুগ্ণ ও বন্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়ে জেলা প্রশাসকের সভাপতিত্বে বিসিকের এলসি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

