দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের হাসনাবাদে বুড়িগঙ্গা নদীর তীর এবং পোস্তগোলা সেতু এলাকায় সরকারি জমি দখল করে গড়ে উঠেছে ইট, বালু ও পাথরের অসংখ্য গদি। নদীর তীর থেকে সেতুর নিচ পর্যন্ত বিস্তৃত এসব গদিতে প্রকাশ্যে চলছে নির্মাণসামগ্রীর ব্যবসা। একই সঙ্গে সেতুর জায়গা দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে শ্রমিক দল, তাঁতি দল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের রাজনৈতিক কার্যালয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, পুরো কার্যক্রম স্থানীয় বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের প্রভাবশালী নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হচ্ছে। পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায় করা হচ্ছে।
সরেজমিনে পোস্তগোলা সেতুর হাসনাবাদ প্রান্তে গিয়ে দেখা যায়, সেতুর দুই পাশ ও নদীতীরজুড়ে ইট, বালু ও পাথরের স্তূপ। বিভিন্ন স্থানে অস্থায়ী ঘর নির্মাণ করে সেখান থেকেই ব্যবসা পরিচালিত হচ্ছে। বড় বড় ট্রাক ও ট্রলারে করে নির্মাণসামগ্রী আনা-নেওয়া হচ্ছে। এতে নদী তীরের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি যান চলাচল ও জননিরাপত্তাও বিঘ্নিত হচ্ছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, সরকারি সংস্থার নিয়ন্ত্রণাধীন নদীর তীর, সেতুর আশপাশ এবং সরকারি জমি দীর্ঘদিন ধরেই দখল করে এসব ব্যবসা পরিচালিত হচ্ছে। যদিও এ ধরনের দখল নতুন নয়। ২০২০ সালে সেতুর নিচে নদীর সীমানা পিলারের ভেতরে গড়ে ওঠা পাথর ও বালুর ৫২টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করেছিল বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। তখন ২৫ জন ব্যবসায়ীর স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছিল।
স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি ও ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে হাসনাবাদ সেতুর নিচ থেকে মোকামপাড়া পর্যন্ত প্রায় এক থেকে দেড় কিলোমিটার এলাকায় ছোট-বড় মিলিয়ে ৫০ থেকে ৬০টি গদি রয়েছে। ব্যবসার ধরন অনুযায়ী প্রতিটি গদি থেকে মাসে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা আদায় করা হয়। এছাড়া প্রায় ১৫০টি ছোট দোকান থেকে মাসে তিন হাজার টাকা করে নেওয়া হয়। তিনটি রিকশা গ্যারেজ থেকে আদায় করা হয় ৩৮ হাজার টাকা। এসবের পাশাপাশি এলাকায় তিনটি রাজনৈতিক কার্যালয়ও রয়েছে।
বিশ্বস্ত সূত্রের দাবি, গদি, দোকান ও রিকশা গ্যারেজ থেকে প্রতি মাসে মোট চার থেকে সাড়ে চার লাখ টাকা চাঁদা আদায় করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, এই টাকার বড় অংশ দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি সোহেল রানা, সাধারণ সম্পাদক ফয়েজ আহমেদ শাহিন এবং থানা যুবদলের যুগ্ম সম্পাদক আরমান হোসেনের কাছে যায়। বাকি অর্থ স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের অর্ধশতাধিক নেতাকর্মীর মধ্যে বণ্টন করা হয়।

সেতুর জায়গা দখল করে রাজনৈতিক কার্যালয়
এদিকে পোস্তগোলা সেতুর জায়গা দখল করে শ্রমিক দল, তাঁতি দল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের কার্যালয় স্থাপন করা হয়েছে। শ্রমিক দলের কার্যালয় পরিচালনা করেন থানা শ্রমিক দলের সহ-সভাপতি মুজাহিদ ইসলাম ফারুক। তাঁতি দলের কার্যালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন রনি। আর স্বেচ্ছাসেবক দলের কার্যালয় পরিচালনা করেন সভাপতি সোহেল রানা ও সাধারণ সম্পাদক ফয়েজ আহমেদ শাহিনের অনুসারীরা। স্থানীয়দের দাবি, যুবদলের যুগ্ম সম্পাদক আরমান হোসেনের লোকজনও এসব কার্যক্রমে সম্পৃক্ত।
অভিযোগ রয়েছে, এসব কার্যালয় থেকেই সেতুতে চলাচলকারী সিএনজি ও অটোরিকশা, সেতুর নিচের অবৈধ দোকান, গদি, ইট-বালুর ব্যবসা, রিকশা গ্যারেজ এবং নদী তীরের বিভিন্ন পণ্য পরিবহন নিয়ন্ত্রণ করা হয়।
স্থানীয়দের দাবি, ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য সেলিম মেম্বারের ভাই মান্নান ও ভাতিজা অমিতেরও সেতুর নিচে গদি রয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানা ছাত্রদলের সভাপতি প্রার্থী আসিফ মাহমুদ এবং থানা শ্রমিক দলের সহ-সভাপতি মুজাহিদ ইসলাম ফারুকেরও গদি রয়েছে। তবে নেতাদের বা তাদের স্বজনদের গদি কিংবা দোকানের জন্য কোনো ভাড়া দিতে হয় না। এসব প্রতিষ্ঠানে চোরাই বিদ্যুৎ ও পানি ব্যবহারেরও অভিযোগ রয়েছে।
কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, নিয়মিত টাকা না দিলে গদি বসানো, মালামাল রাখা কিংবা ব্যবসা পরিচালনায় নানা ধরনের বাধা সৃষ্টি করা হয়। আবার কেউ কেউ দাবি করেন, নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের নাম ব্যবহার করে চাঁদা আদায় করা হয়।
অভিযোগের বিষয়ে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি সোহেল রানা বলেন, তিনি হাসনাবাদ এলাকায় থাকেন না এবং সেতুর নিচের দোকান বা চাঁদাবাজির সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। স্থানীয় নেতাকর্মীরাই সেখানে ব্যবসা পরিচালনা করেন।
স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক ফয়েজ আহমেদ শাহিন বলেন, আগে সেখানে আওয়ামী লীগের ক্লাব ছিল। জুলাই অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ চলে গেলে ওই জায়গায় স্থানীয় তাঁতি দল, শ্রমিক দল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাকর্মীরা রাজনৈতিক কার্যালয় করেছেন। অবৈধ দোকান, গদি ও চাঁদা আদায়ের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকারি জায়গায় স্থানীয় লোকজন দোকান ও গদি করেছে। সরকার যখন জায়গা ফেরত নেবে, তখন তারা ছেড়ে দেবেন। তিনি চাঁদাবাজির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেন।
দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানা যুবদলের যুগ্ম সম্পাদক আরমান হোসেনও দখলদারিত্বের অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, সেতুর নিচে তার কোনো দোকান নেই এবং তিনি কোনো দখল বা চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত নন। তার নাম ব্যবহার করে যেসব অভিযোগ করা হচ্ছে, তা সঠিক নয়। কে টাকা নেয়, সে বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে চাননি। তবে সেখানে শ্রমিক দল, তাঁতি দল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের তিনটি রাজনৈতিক কার্যালয় রয়েছে বলে তিনি স্বীকার করেন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

