সারি সারি সবুজ কলাগাছ। কোথাও পাতার ফাঁকে উঁকি দিচ্ছে বিশাল কাঁদি, কোথাও আবার পরিপক্ব কলার ভারে নুয়ে পড়েছে গাছ। বাতাসে দুলছে প্রশস্ত সবুজ পাতা। দূর থেকে দেখলে সাধারণ কোনো কলাবাগান মনে হলেও কাছে গেলেই চোখে পড়ে ভিন্নতা। ছোট আকৃতির গাছে ঝুলছে বড় বড় কাঁদিÑএ যেন সবুজের মাঝে সম্ভাবনার এক নতুন রাজ্য।
ফরিদপুরের বোয়ালমারী সদর ইউনিয়নের সৈয়দপুর গ্রামের এমনই এক বাগান গড়ে তুলেছেন কৃষক হাফিজুর রহমান সরদার (৪৫)। মাছচাষ থেকে শুরু করে ফিলিপাইন জাতের আখচাষসহ বিভিন্ন ধরনের কৃষিকাজে হাত দেওয়ার পর এবার রঙিন সাগর ও চাপা-সবরি জাতের কলার চাষ করে এলাকায় সাড়া ফেলেছেন তিনি।
প্রায় চার একর জমিতে তার বাগানে রয়েছে ১ হাজার ৭০০ কলাগাছ। এর মধ্যে প্রায় ১ হাজার ২০০টি রঙিন সাগর কলা এবং বাকি গাছগুলো চাপা-সবরি জাতের। গত বছরের আশ্বিন মাসে রোপণ করা এসব গাছের অধিকাংশেই এখন ধরেছে কলা। বাগানে ঢুকলেই চোখে পড়ে ফলনে ভরা গাছের সারি।
হাফিজুরের দাবি, বাগান তৈরির শুরু থেকে ফলন আসা পর্যন্ত তার খরচ হয়েছে প্রায় আড়াই লাখ টাকা। এখন পর্যন্ত যে ফলন হয়েছে, তাতে তিনি আশাবাদীÑসব মিলিয়ে প্রায় ৮ থেকে ৯ লাখ টাকার কলা বিক্রি করতে পারবেন।
কৃষক হাফিজুর রহমান সরদার জয়পুরহাট জেলার ক্ষেতলাল উপজেলার শিবপুর গ্রামের মৃত আব্দুর রাজ্জাক সরদারের ছেলে। বর্তমানে তিনি বোয়ালমারীর সৈয়দপুর এলাকায় বসবাস করছেন।
স্থানীয় সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান এ কে এম হামিদুল বারী বরুণ মিয়ার কাছ থেকে জমি লিজ নিয়ে শুরু হয় তার নতুন উদ্যোগ। যে জমির একটি বড় অংশ আগে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে ছিল, সেটিই পরিষ্কার করে চাষের উপযোগী করেন তিনি।
হাফিজুর রহমান বলেন, বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ধরনের চাষের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। মাছ চাষের পর ফিলিপাইন জাতের আখের চাষ করেন। পরে নতুন কিছু করার চিন্তা থেকেই কলা চাষে আগ্রহী হন।
তার ভাষায়, পরিত্যক্ত জমি পরিষ্কার করে কলার চারা লাগাই। শুরুতে বুঝতে পারছিলাম না ফলন কেমন হবে। নিয়মিত পরিচর্যা করতে থাকি। প্রায় ১০ মাস পর যখন গাছে গাছে কলা ধরতে শুরু করল, তখন নিজের কাছেই খুব ভালো লাগতে থাকে। এখন প্রতিদিন বাগান থেকে কলা বিক্রি করছি।
হাফিজুরের বাগানে এখন ব্যস্ত সময়। পরিপক্ব কাঁদি কাটা হচ্ছে, আবার নতুন গাছে ফলন আসছে। কৃষকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে ১৫ থেকে ২০ কাঁদি রঙিন সাগর কলা বিক্রি হচ্ছে।
প্রতি কাঁদি কলা আকার ও মানভেদে পাইকারি ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। ফলে নিয়মিত বিক্রির মাধ্যমে দ্রুতই বিনিয়োগের টাকা উঠে আসবে বলে আশা করছেন কৃষক।
তবে শুধু কলা বিক্রি করেই আয় নয়, গাছের গোড়ায় জন্ম নেওয়া চারাও এখন বাড়তি আয়ের উৎস। প্রতিটি পরিপক্ব গাছের গোড়ায় তিন থেকে চারটি করে চারা পাওয়া যাচ্ছে। এসব চারা স্থানীয় বাজারসহ বিভিন্ন জায়গায় ২৫ থেকে ৩০ টাকা দরে বিক্রি করছেন তিনি।
হাফিজুর রহমানের চোখে এ উদ্যোগ শুধু নিজের আয়-রোজগারের পথ নয়; এটি স্থানীয় কৃষিতে নতুন সম্ভাবনারও দরজা খুলে দিতে পারে।
বোয়ালমারী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আলভীর রহমান বলেন, কলার এই বাগানের বিষয়ে আমরা আগে অবগত ছিলাম না। তবে প্রয়োজন হলে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে তাকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও পরামর্শ দেওয়া হবে। স্থানীয়ভাবে এর উৎপাদন বাড়ানো গেলে এলাকার চাহিদা পূরণের পাশাপাশি কৃষকের আয়ও বাড়বে।
বোয়ালমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম রকিবুল হাসান বলেন, কলা অত্যন্ত পুষ্টিসমৃদ্ধ ও শক্তিদায়ক ফল। এতে ভিটামিন, খনিজ ও আঁশ রয়েছে। স্থানীয়ভাবে এ ধরনের ফলের উৎপাদন বাড়ানো গেলে মানুষের পুষ্টির চাহিদা পূরণে ভূমিকা রাখবে। কৃষক হাফিজুর রহমানের কোনো ধরনের সহযোগিতার প্রয়োজন হলে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তা করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এমএইচ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

