নরসিংদী জেলখানা ভাঙার দুবছর আজ। এরই মধ্যে এ জেলায় আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি ঘটেছে। একদিকে ৯টি চরাঞ্চলের টেঁটাযুদ্ধ, অপরদিকে মাদকের অভয়ারণ্য ও নারী নির্যাতনের ঘটনা বেড়েছে । বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষের ঘটনায় লুট হওয়া অস্ত্রের ব্যবহার হচ্ছে বলে এলাকাবাসীর অভিযোগ উঠেছে। গত এক বছরে সংঘর্ষে শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে । এতে জনমনে আতঙ্ক বিরাজ করছে ।
বিগত দিনের অপরাধের পাশাপাশি ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় নরসিংদী জেলা কারাগারে হামলার ঘটনায় অপরাধের মাত্রা নতুন করে যোগ হয়েছে। ওই দিন জেলখানায় আগুন দিয়ে দরজা ভেঙে পালিয়ে যায় সাত জঙ্গিসহ ৮২৬ কয়েদি। লুট হয় কারাগারে থাকা ৮৫টি হাতিয়ার ও আট হাজার ১৫টি গোলাবারুদ। সেই থেকে ১৯ জুলাই নরসিংদীতে একটি আলোচিত ঘটনাবহুল দিন। এরপরও ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তায় অপরাধের মাত্রা অস্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যায়। পাঁচ হাজারেরও বেশি গোলাবারুদ, ২৬টি অস্ত্র উদ্ধার হয়নি এবং ১৬৭ জন আসামি এখনো পলাতক রয়েছে। এর ফলে জেলাজুড়ে হত্যা, ছিনতাই, রাহাজানিসহ গুরুতর অপরাধের প্রবণতা ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিগত এক বছরে নরসিংদীতে শতাধিক চাঞ্চল্যকর খুনের ঘটনা ঘটেছে। এসব বেশিরভাগই হয়েছে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও আধিপত্য বিস্তার ও নারী নির্যাতনের ঘটনায়। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে জেলার অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের দাবি জানানো হলেও সব অস্ত্র উদ্ধার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।
জেলখানায় হামলা ও লুটপাটের ঘটনায় তৎকালীন জেলার কামরুল ইসলাম বাদী হয়ে দুটি মামলাও করেন। কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া আসামিরা যাতে স্থানীয় থানা, কারাগার ও আদালতের মাধ্যমে আত্মসমর্পণ করেন তার জন্য নরসিংদী জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং, প্রচারপত্র বিলি ও বিভিন্ন স্থানে সাইনবোর্ড টানিয়েছিল। ফলে কয়েক দফায় আত্মসমর্পণ ও গ্রেপ্তারের মাধ্যমে পলাতকদের মধ্যে প্রায় সাতশ কয়েদিকে কারাগারে ফেরাতে সক্ষম হয়েছে পুলিশ। এ ছাড়া লুট হওয়া ৮৫টি অস্ত্রের মধ্যে ৫৯টি উদ্ধার হলেও বাকি রয়েছে ২৬টি অস্ত্র। এসব অস্ত্রের মধ্যে চায়না ও বিডি রাইফেল এবং বোর শটগান রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
জেলখানায় হামলা ও লুটপাটের ঘটনায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগ নরসিংদী কারাগারের তৎকালীন জেল সুপার আবুল কালাম আজাদ ও জেলার কামরুল ইসলামকে ২৩ জুলাই বরখাস্ত করে। এ ঘটনায় তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তিন সদস্যের কমিটি করেছে আইজি প্রিজন। ছয় সদস্যের কমিটি করেছে সুরক্ষা সেবা বিভাগ এবং অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রধান করে তিন সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন করেছেন নরসিংদী জেলা প্রশাসকও।
নরসিংদী কোর্ট পুলিশ পরিদর্শক শফিউদ্দিন খান জানান, নরসিংদী জেলখানা থেকে পলাতক আসামিদের মধ্যে একশজনের বেশি আসামি এখনো পলাতক রয়েছে। এছাড়া ২৬টি অস্ত্র, তিন জঙ্গিসহ বেশকিছু গোলাবারুদ উদ্ধার হয়নি।
নরসিংদীর চরাঞ্চল আলোকবালীর বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম জানান, চরাঞ্চলের সংঘাতে দেশে তৈরি অস্ত্র ব্যবহার হচ্ছে। এসব অস্ত্র শুধু সমাজের জন্য নয়, দেশের জন্যও হুমকি। আমরা অবশ্যই চাই সমাজের দুষ্টুচক্রের হাতে থাকা অবৈধ অস্ত্রসহ কারাগার থেকে লুট হওয়া অস্ত্র যেন দ্রুত উদ্ধার করা হয়।
নরসিংদী স্কুল-কলেজ শিক্ষক সমিতির সভাপতি ড. মশিউর রহমান মৃধা বলেন, চরাঞ্চলে এখন শুধু আগের মতো টেঁটা নিয়ে মারামারি হচ্ছে না। এসব সংঘাতে এখন অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার হচ্ছে এবং হতাহতের ঘটনা ঘটছে।
নরসিংদী জেলা জজ আদালতের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনসুর আলী শিকদার বলেন, চরাঞ্চলে যেসব সংঘাত ও হতাহতের ঘটনা ঘটেছে, সেসব অবৈধ অস্ত্র তো আছেই, নতুন করে যোগ হয়েছে জেলখানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র।
নরসিংদী কারাগারের জেল সুপার তারেক কামাল জানান, এ জেলখানা থেকে পালিয়ে যাওয়া ৮২৬ আসামির মধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছে ৬৫৯ জন, পলাতক রয়েছে ১৬৭জন। এছাড়া লুট হওয়া ৮৫টি অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে, ৪৩টি পাওয়া যায়নি, ২২টি অস্ত্র এবং আট হাজার ১৫ রাউন্ড গোলাবারুদের মধ্যে উদ্ধার হয়েছে এক হাজার ৬৬৩, আর পাওয়া যায়নি ছয় হাজার ৩৫২টি।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কলিমুল্লাহ জানান, জেলা কারাগার থেকে লুট হওয়া অস্ত্রের বেশিরভাগ উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া কিছু গোলাবারুদও উদ্ধার হয়েছে। বাকি ২৬টি অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান চলমান রয়েছে। এছাড়া জেল পলাতক আসামিদের মধ্যে এখনো ১৬৭ জনের মতো আসামি পলাতক রয়েছে যাদের গ্রেপ্তারে পুলিশ অভিযান অব্যাহত রেখেছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

