ইউরোপে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার বাঁশকান্দি ইউনিয়নের যুবক মেহেদী হাসান (৩০)। সেই স্বপ্ন পূরণ করতে গিয়ে তিনি এখন লিবিয়ার একটি মানবপাচারকারী চক্রের হাতে জিম্মি হয়ে অত্যন্ত অনিশ্চিত জীবন কাটাচ্ছেন। ছেলেকে দেশে ফিরিয়ে আনতে ইতোমধ্যে ধারদেনা করে ও ভিটেবাড়ি বন্ধক রেখে প্রায় ১৭ লাখ টাকা দিয়েছেন তার পরিবার। কিন্তু তাতেও মেহেদীর মুক্তি মেলেনি। উল্টো তাকে মুক্তি দিতে আরও ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন স্বজনেরা।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, মেহেদী স্থানীয় একটি কম্পিউটারের দোকানে চাকরি করতেন। সেই আয়েই মোটামুটি ভালোভাবে তার সংসার চলছিল। কিন্তু দালালের প্রলোভনে পড়ে ইউরোপে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। এ জন্য শিবচর উপজেলার বাঁশকান্দি ইউনিয়নের ছলেনামা বাজিতপুরের মো. সাগর মিয়ার সঙ্গে ২২ লাখ টাকায় চুক্তি হয়। সেই দালালের মাধ্যমেই গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে লিবিয়ায় পাড়ি জমান মেহেদী। কিন্তু দেশটিতে পৌঁছানোর পরপরই তাকে একটি সংঘবদ্ধ চক্র আটক করে এবং তার ওপর নির্যাতনের ভিডিও পরিবারের কাছে পাঠিয়ে টাকা দাবি করে।
ছেলের জীবন বাঁচাতে পরিবারটি আত্মীয়স্বজন ও বিভিন্ন জায়গা থেকে ধারদেনা করে এবং শেষ সম্বল ভিটেবাড়ি বন্ধক রেখে দফায় দফায় প্রায় ১৭ লাখ টাকা পরিশোধ করে। কিন্তু টাকা দেওয়ার পরও মেহেদীর মুক্তি মিলেনি। বরং প্রায় তিন মাস ধরে তিনি পুনরায় চক্রের নির্মম জিম্মিদশায় বন্দি রয়েছেন। এখন তাকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য নতুন করে আরও ২০ লাখ টাকা দাবি করা হচ্ছে।
মেহেদীর বাবা রহমান শিকদার বলেন, ‘ছেলেকে জীবিত ফিরিয়ে আনতে আমরা সব শেষ করে দিয়েছি। ধারদেনা ও ভিটেবাড়ি বন্ধক রেখে ১৭ লাখ টাকা দিয়েছি। এখন নতুন করে এত টাকা দেওয়ার মতো বিন্দুমাত্র সামর্থ্য আমাদের নেই। আমি আমার সন্তানকে নিরাপদে বুকে ফিরিয়ে পেতে সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ ও সহযোগিতা কামনা করছি।’
এদিকে পরিবারের দিন কাটছে চরম উৎকণ্ঠা ও আতঙ্কে। একদিকে সন্তানের ওপর চলা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের দুশ্চিন্তা, অন্যদিকে বিপুল ঋণের বোঝা—সবমিলিয়ে পুরো পরিবারটি দিশেহারা।
এ বিষয়ে শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এইচ এম ইবনে মিজান বলেন, অবৈধভাবে বিদেশ গমন ব্যক্তি ও দেশের উভয়ের জন্যই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। মানবপাচার ও অবৈধ অভিবাসন প্রতিরোধে উপজেলা প্রশাসন জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং দালাল চক্রের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণে সর্বদা সচেষ্ট রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, অবৈধ অভিবাসন রোধে শুধু প্রশাসনের একার পক্ষে সবকিছু রোধ করা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, ধর্মীয় নেতা, গণমাধ্যম এবং সাধারণ জনগণের সম্মিলিত সচেতনতা ও জোরালো সহযোগিতা অত্যন্ত জরুরি।
পরিবারের এখন একটাই আকুতি, দ্রুত সরকারি উদ্যোগে লিবিয়ার জিম্মিদশা থেকে উদ্ধার করে মেহেদীকে যেন নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

