পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে গত সেপ্টেম্বর মাসে ক্যান্টনমেন্ট থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রাকিবুল হাসানকে প্রথমে প্রত্যাহার এবং পরবর্তীকালে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এরই মধ্যে ফতুল্লা মডেল থানার ওসি মোহাম্মদ মাহবুব আলমকে ঘিরেও আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্টতা, রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা এবং বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ সামনে এসেছে।
চোরাই তেল সিন্ডিকেট থেকে শুরু করে নদীর মাটি কাটা সিন্ডিকেটকে অর্থের বিনিময়ে অনৈতিক সুবিধা দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে; যা নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর টেবিলে ১১টি অভিযোগ জমা পড়েছে। এরই মধ্যে সেই অভিযোগ তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করেছেন এবং অন্তত পাঁচটি অভিযোগের সত্যতা পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন। ওসি মাহবুবের বিরুদ্ধে জমা পড়া অভিযোগের একটি কপি আমার দেশ প্রতিনিধির হাতে এসেছে।
সম্প্রতি রুবেল হোসেন নামের এক ব্যক্তি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে ১১টি অভিযোগ তুলে ধরে ওসি মাহবুব আলমের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন করেছেন বলে জানা গেছে।
লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, ফতুল্লা মডেল থানার প্রায় ৩০০ গজের মধ্যে মেঘনা ও যমুনা তেল ডিপোর পাশে গড়ে ওঠা প্রায় ২০টি অবৈধ চোরাই তেলের দোকান থেকে প্রতি মাসে দেড় লাখ টাকা আদায় করা হয়। অভিযোগে আরও দাবি করা হয়, থানার এসআই ও এএসআইদের বদলি ঠেকানোর কথা বলে তাদের কাছ থেকে লাখ টাকা করে নেওয়া হয়েছে।
এছাড়া থানার মুন্সি পদে জহির নামের এক পুলিশ কর্মকর্তাকে পদায়নের জন্য এক লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে। থানার ভেতরে ধর্ষণ মামলার আপস-মীমাংসা করে বাদীর কাছ থেকে জোরপূর্বক স্বাক্ষর নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে ওই লিখিত আবেদনে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, রাসেল নামের কথিত এক মাদক কারবারিকে আটক করে দুই দফায় মোট আট লাখ টাকা উৎকোচ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নদী থেকে মাটি কাটায় জড়িতদের এবং ভূমিদস্যুদের কাছ থেকে সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও তোলা হয়েছে।
এছাড়াও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একাধিক পুরোনো ছবিতে ওসি মাহবুব আলমকে আওয়ামী লীগের তৎকালীন কয়েকজন নেতা ও সংসদ সদস্যের সঙ্গে দেখা গেছে। এ দিকে শেখ মুজিবুর রহমানের মাজার জিয়ারতের কয়েকটি ছবিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এসব ছবি ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে নানা আলোচনা তৈরি হয়েছে।
তবে সম্প্রতি দুটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে নতুন করে আলোচনায় এসেছেন ওসি মাহবুব আলম। এর একটি হলো ফতুল্লায় জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) জেলা কমিটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক তাওহীদুল ইসলামের ওপর হামলার ঘটনা।
নারায়ণগঞ্জ জেলা এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক আব্দুর রহমান গাফফারি বলেন, ফতুল্লা মডেল থানার ওসির আচরণে মনে হয় তিনি একটি দলের প্রতিনিধিত্ব করছেন। সে আগে ছিল আওয়ামী ঘনিষ্ট, এখন নিজেকে বিএনপি প্রমাণে ব্যস্ত। বক্তাবলীতে এনসিপির উপর হামলার ঘটনায় প্রথমে মামলা নিতে চাননি। রাতে এমপি আব্দুল্লাহ আল আমিন সহ এনসিপির নেতারা থানায় গেলে তিনি মামলা নিতে বাধ্য হন।
তিনি আরও বলেন, একজন থানার ওসির প্রধান দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও সবার প্রতি নিরপেক্ষ থাকা। জনসভায় গিয়ে কোনো রাজনৈতিক দলের নেতাদের প্রশংসা করা এবং আগাম কমিউনিটি পুলিশের সভাপতি ঘোষণা করা তাঁর দায়িত্ব ও নিরপেক্ষতা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি করে। প্রশাসনের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে থেকে আইন ও বিধি অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করাই জনআস্থার জন্য জরুরি।
অভিযোগ রয়েছে, হামলার পর থানায় মামলা করতে গেলে প্রথমে মামলা নিতে অপারগতা প্রকাশ করেন ওসি। পরে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল্লাহ আল আমিন দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে থানায় উপস্থিত হলে রাত প্রায় ১টার দিকে মামলা নেওয়া হয়। এ ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
অন্যদিকে গত বৃহস্পতিবার পাগলা বাজার এলাকায় যানজট নিরসন কমিটির পরিচিতি সভায় বক্তব্য দেওয়ার সময় ওসি মাহবুব আলম বিএনপির নেতাদের প্রশংসা করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তার বক্তব্যের বিষয়টি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমেও আলোচনা চলছে। এতে একজন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের কয়েকজন বলেন, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রাষ্ট্রের একজন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কর্মকর্তা। রাজনৈতিক মতাদর্শের ঊর্ধ্বে থেকে সবার প্রতি সমান আচরণ করাই তার দায়িত্ব। কোনো রাজনৈতিক দলের নেতা বা নেতাকর্মীর রাজনৈতিক ভূমিকার প্রকাশ্য প্রশংসা পুলিশের নিরপেক্ষতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।
এদিকে পুলিশের একটি সূত্র জানায়, শেখ হাসিনা সরকারের আমলে ওসি মাহবুব আলম তৎকালীন ডিআইজি নুরে আলম মিনারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন বলে স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনা ছিল। তবে এ বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া পুরোনো ছবিগুলোর বিষয়ে জানতে চাইলে ওসি মাহবুব আলমের সরকারি মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হয়। অপর প্রান্ত থেকে একজন জানান, ‘ওসি স্যার ছুটিতে আছেন। তাকে সোমবার পাওয়া যাবে।’
এমএইচ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

