রাজবাড়ীর বিসিক শিল্পনগরী ধুঁকছে উদ্যোক্তা সংকটে

রাজবাড়ীর বিসিক শিল্পনগরী ধুঁকছে উদ্যোক্তা সংকটে
আমার দেশ গ্রাফিক্স

একসময় উদ্যোক্তাদের পদচারণে মুখর ছিল রাজবাড়ী বিসিক শিল্পনগরী। সময়ের ব্যবধানে সেই কর্মচাঞ্চল্য এখন অনেকটাই ম্লান। নিরাপত্তাহীনতা, জরাজীর্ণ রাস্তাঘাট, দুর্বল ড্রেনেজ ব্যবস্থা, পুঁজির সংকট ও কর্তৃপক্ষের অসহযোগিতায় রুগ্ন হয়ে পড়েছে একের পর এক শিল্পপ্রতিষ্ঠান। একই সঙ্গে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি না হওয়ায় ধুঁকছে ১৯৬৪ সালে প্রতিষ্ঠিত রাজবাড়ী বিসিক শিল্পনগরী।

গত ৭ সেপ্টেম্বর শিল্পনগরীর নতুন শিল্প মালিক সমিতির পরিচিতি সভায় উদ্যোক্তাদের ক্ষোভ ও হতাশার চিত্র উঠে আসে। সভায় বীর মুক্তিযোদ্ধা ও শিক্ষক খলিলুর রহমান জানান, ৪৫ বছর পর এই প্রথম কোনো কমিটি উদ্যোক্তাদের ডেকে তাদের কথা শোনার সুযোগ দিয়েছে। দীর্ঘদিন ব্যবসা পরিচালনা করলেও নানা সমস্যায় তিনি তার বরাদ্দকৃত প্লট বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

খলিলুর রহমান জানান, শিল্পনগরীতে তার ৯ হাজার বর্গফুটের প্লটে প্রথমে ডালমিল এবং পরে থান কাপড়ের মিল গড়ে তোলা হয়। তিনি ফরিদপুরে বসবাস করায় নিয়মিত বিসিকে আসতে পারতেন না। একদিন কর্মচারীর কাছ থেকে জানতে পারেন, তার প্রায় ৪০ হাজার টাকার একটি মোটর চুরি হয়েছে। এরপর থেকেই ব্যবসায় ধস নামে। প্রতিষ্ঠানটি পুনরায় চালুর চেষ্টা করলেও বিসিক কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পাননি বলে অভিযোগ তার। জমির খাজনা, বার্ষিক কর, আয়করসহ নানা আর্থিক চাপে ব্যবসা রুগ্ন হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে পেনশন ও মুক্তিযোদ্ধা ভাতার টাকা দিয়ে জমির দেনা পরিশোধ করতে হয়েছে তাকে। এখন প্লটটি বাতিলের পর্যায়ে রয়েছে।

জানা গেছে, ১৫.২৮ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত রাজবাড়ী বিসিক শিল্পনগরীতে বরাদ্দযোগ্য প্লট রয়েছে ৭৭টি। এর মধ্যে ৭৬টি বরাদ্দ হয়েছে। মোট শিল্প ইউনিট ৫৩টি। কর্তৃপক্ষের হিসাবে উৎপাদন ও চালু ইউনিট ৩৫টি। রুগ্ন, বন্ধ ও নিষ্ক্রিয় রয়েছে ৯টি এবং বাতিল হয়েছে ছয়টি। মামলাসংক্রান্ত জটিলতায় আরেকটি ইউনিট বাতিলের প্রক্রিয়ায় রয়েছে।

উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, কাগজ-কলমে যত প্রতিষ্ঠান চালু দেখানো হচ্ছে, বাস্তব চিত্র তারচেয়ে ভিন্ন। অনেক কারখানা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে। কেউ কেউ দেনার চাপে ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আবার কিছু উদ্যোক্তা বয়সের ভারে ব্যবসা থেকে সরে গেছেন।

অভিযোগ রয়েছে, কয়েকজন বড় ব্যবসায়ী নুডলস ও সেমাই কারখানার নামে প্লট বরাদ্দ নিলেও বর্তমানে সেগুলো গোডাউন হিসেবে ব্যবহার করছেন। তবে শিল্পোদ্যোক্তা হাজী দেলোয়ার হোসেনের প্রতিষ্ঠানগুলো সচল ও লাভজনক বলে জানা গেছে।

নিরাপত্তা ও অবকাঠামো নিয়ে ক্ষোভ

উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, শিল্পনগরীতে নিরাপত্তা, রাস্তাঘাট ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার দুরবস্থা দীর্ঘদিনের। শিল্পপ্রতিষ্ঠান থেকে বৈদ্যুতিক তার ও বিভিন্ন যন্ত্রপাতি চুরির ঘটনাও ঘটছে। এসব কারণে নতুন উদ্যোক্তারা এখানে বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছেন।

শিল্পোদ্যোক্তা প্রভাত দাস বিষ্ণু অভিযোগ করেন, বিসিক কর্মকর্তাদের অবহেলা ও গাফিলতির কারণে রাজবাড়ীতে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হয়নি। শিল্পনগরীতে ন্যূনতম নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারলে এখানে ব্যবসা করাকে নিরাপদ মনে করা যায় না। এ কারণে তিনি রাজবাড়ীর পরিবর্তে ফরিদপুরের কানাইপুরে শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন।

বেশ কয়েকজন উদ্যোক্তার প্রশ্ন, শিল্পনগরীর কর্মকর্তাদের প্রকৃত দায়িত্ব কী? তাদের অভিযোগ, রুগ্ন শিল্পের মালিকদের টিকিয়ে রাখতে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। আইনগত বা ব্যবসায়িক সহায়তার পরামর্শ না দিয়ে অনেক সময় প্লট ছেড়ে দেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি করা হয়।

কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

রাজবাড়ী বিসিক শিল্পনগরীতে বর্তমানে দুজন কর্মকর্তা রয়েছেন। সহকারী মহাব্যবস্থাপক চয়ন চৌধুরী প্রায় পাঁচ বছর ধরে দায়িত্ব পালন করছেন। অন্যজন স্টেট অফিসার আতিকুর রহমান। উদ্যোক্তাদের একটি অংশ তাদের কার্যক্রম নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক উদ্যোক্তা অভিযোগ করেন, স্টেট অফিসারের কাজের একটি বড় অংশ প্লট হস্তান্তরসংক্রান্ত প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত। কে প্লট ছাড়বেন এবং কে নতুন করে যুক্ত হবেনÑএ ধরনের বিষয়ে মধ্যস্থতার অভিযোগও রয়েছে।

নতুন শিল্প মালিক সমিতির সভাপতি কাজী বেনজির আহমেদ বলেন, বিসিক কর্মকর্তাদের শিল্পবান্ধব হতে হবে। উদ্যোক্তাদের সঙ্গে নিয়মিত সভা করে সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করা প্রয়োজন। তাহলেই শিল্পনগরীকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব। পাশাপাশি উদ্যোক্তাদেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে।

অভিযোগের বিষয়ে সহকারী মহাব্যবস্থাপক চয়ন চৌধুরী বলেন, তাদের অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তারা চান শিল্পনগরী নতুন উদ্যমে এগিয়ে যাক। কিছু দুর্বল উদ্যোক্তার অবহেলা ও অনাগ্রহের দায় অনেক সময় ভালো উদ্যোক্তাদের ওপরও পড়ে।

প্লট হস্তান্তরে কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, কেউ প্লট ছেড়ে দিলে নিয়মাঅনুযায়ী তাকে সহযোগিতা করা হয়। ব্যবসা না করলে প্লট বাতিল হওয়া স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কারো প্রতি বিদ্বেষের সুযোগ নেই।

চুরি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রাতে কোনো প্রতিষ্ঠানে লোকজন না থাকলে চুরির ঝুঁকি থাকে। এ বিষয়ে মালিকদেরও দায়িত্ব নিতে হবে। তবে চুরি ঠেকাতে বিসিকে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সীমানা প্রাচীর নির্মাণসহ প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শিল্পনগরীর মাঝ দিয়ে ইউনিয়ন সড়ক চলে যাওয়ায় সীমানা প্রাচীর নির্মাণে জটিলতা রয়েছে।

তিনি জানান, পুরোনো ভবনটি ভেঙে ফেলায় বর্তমানে ভাড়া বাড়িতে অফিস পরিচালনা করতে হচ্ছে। ২০২৩ সালে নতুন ভবন নির্মাণের জন্য প্রায় দুই কোটি টাকা বরাদ্দ এলেও কাজ শুরু না হওয়ায় ওই অর্থ ফেরত গেছে। ফলে নতুন ভবন নির্মাণও এখন অনিশ্চিত।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন