ফরিদপুরের সদরপুরে স্কুল কমিটির দ্বন্দ্বে স্থানীয় কতিপয় প্রভাবশালীরা একটি অনুষ্ঠানে দাওয়াত না পাওয়ায় টিসি নিয়ে স্কুল ছাড়তে বাধ্য হয়েছে প্রাথমিকের ৪০ জন কোমলমতি শিক্ষার্থী। চলমান একটি স্কুল থেকে বছরের শেষের দিকে একসঙ্গে এত শিক্ষার্থীদের টি সি নেওয়ার ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃস্টি হয়েছে।
ঘটিনাটি ঘটেছে উপজেলার ৮২ নং চরচাঁদপুর কোলচুরী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। আরও শিক্ষার্থীরা টিসি নেয়ার অপেক্ষায় আছে বলে জানিয়েছেন স্কুল সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ । টিসি নিয়ে শিক্ষার্থীরা ক্যাচমেন্টিক এরিয়ার বাইরে প্রায় ২ কিলোমিটার দূরে ৪১ নং চরচাঁদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছেন বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
জানা গেছে, কোলচুরি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কমিটির সদস্য ও কোলচুরি গ্রামের বাসিন্দা মুন্নাফ শেখের নেতৃত্বে গত ৫ অক্টোবর রাতে চরচাঁদপুর বাজারে টিসি নেওয়া শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের ৩০-৩৫ জনের একটি দল একটি সংবাদ সম্মেলন করে। সেখানে লিখিত বক্তব্যে মুন্নাফ শেখ দাবি করে, বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক আ. সামাদের মেয়েকে পরিচালনা কমিটির সভাপতি পদে সমর্থন না করার কারণে তিনি ও তার ছেলেরা ক্ষুব্ধ হন।
এদিকে ৮২ নং চরচাঁদপুর কোলচুরী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আলী খান আমার দেশ প্রতিনিধিকে জানান, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান গত ২৬ সেপ্টেম্বর স্কুলের নতুন ভবনের কাজ শুরু করলে ২ ঘন্টা সময়ের ব্যবধানে দোয়ার অনুষ্ঠান করতে বলে। আমি সংশ্লিষ্টদের দাওয়াত পৌঁছে দিলে কেউ উপস্থিত হয়েছেন কেউ উপস্থিত হতে পারেননি। তারপর থেকেই স্কুলে ছাড়পত্র নেয়ার মত ঘটনা ঘটছে। এ পর্যন্ত ৩৬ জন টিসি নিয়েছেন, আবেদন দিয়ে গেছেন আরো ৪ জন। টিসি নেওয়ার জন্য আরও আসবে বলে গ্রামে গুঞ্জন রয়েছে। গ্রাম্য প্রভাবশালীরাই এ কলকাঠি নাড়ছেন বলে মনে হচ্ছে। নইলে অক্টোবর মাসে কেন, জানুয়ারিতে টিসি নিতে পারত। তবে আমরা আপসমীমাংসার জন্য গ্রাম্য নেতৃবৃন্দ্বের দ্বারস্থ হয়েছি। তারা এই সমস্যার সমাধানে আশ্বাস দিয়েছেন।
কোলচুরি গ্রামে সরেজমিন অনুসন্ধানে গেলে কয়েকজন অভিভাবক নাম না প্রকাশের শর্তে বলেন, কামরুল হাসান, মুন্নাফ শেখ নামক প্রভাবশালীরা শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের টিসির নেওয়ার আবেদন করতে চাপ দিচ্ছেন এবং ঘটনার নেপথ্যে কলকাঠি নাড়ছেন। ঐ অভিভাবকদের দাবি, এদের ভয়ে কেউ মুখ খোলে না। মকবুল হোসেন খান ডাঙ্গী, নছরদ্দিন খান ডাঙ্গী কোলচুরি ডাঙ্গী এই তিন গ্রামের মানুষ এই প্রভাবশালীদের কাছে জিম্মি।
তৃতীয় শ্রেণির একশিক্ষার্থীর অভিভাবক আকল শেখ বলেন, ‘বিদ্যালয়ের বর্তমান পরিস্থিতিতে সন্তানের পড়াশোনা ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে ছাড়পত্র নিয়ে অন্য বিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়েছি।’ তবে নাম না প্রকাশের শর্তে জনৈক অভিভাবক জানান, আমার মেয়েও ঐ স্কুলে পড়ে আমি কোনো সমস্যা দেখি না। প্রভাবশালীদের একটি অংশ স্কুলে আধিপত্য বিস্তার করতে চাইছে। তারাই এমন ঘটনা ঘটাচ্ছে।
তবে অভিযুক্ত কামরুল হাসান এই প্রতিবেদককে বলেন, আমি এ ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত নই। আমি ফরিদপুরে থাকি। একটি কুচক্রীমহলের ইন্ধনে আমার বিরুদ্ধে এসব রটানো হচ্ছে।
এ ব্যাপারে ভাষানচর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শেখ মো. গোলাম কাউসার বলেন, কমিটির দ্বন্দ্ব থেকেই ঘটনার সূত্রপাত। একটি নিরপেক্ষ কমিটি দিয়ে ঘটনার মীমাংসার চেষ্টা অব্যাহত আছে। আশাকরি, পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে শিক্ষার্থীরা আবার ফিরে আসবে।
এ প্রসঙ্গে সদরপুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মামুনুর রহমান বলেন, কমিটির দ্বন্দ্ব থেকে এ সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা অন্য স্কুলে চলে যাচ্ছে। স্থানীয়ভাবে সমস্যার সমাধানের চেষ্টা চলছে। প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধেও অভিযোগ হস্তগত হয়েছে। তদন্তসাপেক্ষে স্কুলটিকে সাবেক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
তবে এলাকাবাসীর দাবি, ক্ষমতার দ্বন্দ্বে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে না। বছরের শেষ সময়ে শিক্ষার্থীদের স্কুল ত্যাগের ঘটনা এলাকাবাসীর জন্যও লজ্জাকর। কোমলমতি শিশুদের যেন দূরের কোনো বিদ্যালয়ে যেতে না হয় সে ব্যাপারে যেন পদক্ষেপ নেওয়া হয়। স্কুল কমিটির ঠিক হয়ে গেলে অভিভাবকরা শিক্ষার্থীদের স্কুলে ফিরিয়ে আনবেন বলেও আশ্বস্ত করেছেন সংশ্লিষ্ট মহল।
এমএইচ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

