বিয়ের ১৪ দিন আগে ডেঙ্গুতে মৃত্যু, নিথর কপালে সিঁদুর পরালেন হবু বর

বিয়ের ১৪ দিন আগে ডেঙ্গুতে মৃত্যু, নিথর কপালে সিঁদুর পরালেন হবু বর

বিয়ের আর মাত্র ১৪ দিন বাকি ছিল। লাল শাড়ি, সিঁদুরসহ কনের সাজের সব কেনাকাটাও প্রায় শেষ। ১৬ অক্টোবর একই দিনে বিয়ের পিঁড়িতে বসার কথা ছিল জমজ দুই বোনের। কিন্তু বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা নিয়ে হবু শ্বশুরবাড়িতে যাওয়ার বদলে বাবা নির্মল ঘরামিকে ফিরতে হলো মেয়ে বৃষ্টির নিথর মরদেহ নিয়ে। আর সেই মরদেহ বাড়িতে পৌঁছানোর পর বিয়ের সাজে কেনা সিঁদুরই বৃষ্টির নিথর কপালে পরিয়ে তাকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করলেন হবু বর সবুজ মণ্ডল।

২৫ বছর বয়সী বৃষ্টি ঘরামী ঢাকার শ্যামলীর ট্রমা সেন্টারের সিনিয়র স্টাফ নার্স ছিলেন। হঠাৎ করে জ্বর অনুভূত হওয়ায় ২৮ সেপ্টেম্বর পরীক্ষায় ধরা পড়ে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি। ২ অক্টোবর (শুক্রবার) ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। বিয়ের মাত্র ১৪ দিন আগে তার এমন মৃত্যুতে কোটালীপাড়ার নৈয়ার বাড়ি গ্রামের বাড়িতে এখন চলছে শোকের মাতম।

বিজ্ঞাপন

সোমবার (৫ অক্টোবর) বিকেলে বৃষ্টির বাড়িতে ঢুকতেই ভেতর থেকে ভেসে আসে কান্নার রোল। উঠানে নেই বিয়ের ব্যস্ততা, নেই অতিথিদের আনাগোনা। কয়েক দিন আগেও যে বাড়িতে শারদীয় দুর্গাপূজার আনন্দের সঙ্গে দুই জমজ বোনের বিয়ের প্রস্তুতি চলছিল, সেই বাড়িতেই এখন নেমে এসেছে শোকের ছায়া।

আগামী ১৬ অক্টোবর মুকসুদপুর উপজেলার গোয়াইল গ্রামের সবুজ মণ্ডলের সঙ্গে বৃষ্টির বিয়ে হওয়ার কথা ছিল। একই দিনে বিয়ের পিঁড়িতে বসার কথা ছিল তাঁর জমজ বোন বন্যা ঘরামীরও। বন্যা ঘরামী ঢাকার সিএমএইচে নার্স হিসেবে কর্মরত। দুই বোনের বিয়ে ঘিরে পরিবার ও আশপাশের মানুষের মধ্যে চলছিল ব্যাপক প্রস্তুতি।

বৃষ্টির মৃত্যুর পর ঢাকা থেকে মরদেহ বাড়িতে নেওয়ার সময় বিয়ের জন্য কেনা সামগ্রীও সঙ্গে নিয়ে আসেন বরের পরিবারের সদস্যরা। পরে বৃষ্টির নিথর কপালে সিঁদুর পরিয়ে তাকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করেন সবুজ। শনিবার দুপুরে কোটালীপাড়ার নৈয়ার বাড়ি গ্রামের নিজ বাড়িতে বৃষ্টির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হয়।

বৃষ্টির বাবা কৃষক নির্মল ঘরামির শুক্রবারই এলাকার মুরুব্বিদের সঙ্গে নিয়ে মেয়ের হবু শ্বশুরবাড়িতে যাওয়ার কথা ছিল বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা নিয়ে কথা বলতে। কিন্তু সেই দিনই তাকে মেয়ের মরদেহ নিয়ে বাড়িতে ফিরতে হয়।

বৃষ্টি ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষে গোপালগঞ্জ নার্সিং ও মিডওয়াইফারি কলেজে পড়াশোনা করেন। প্রায় নয় মাস ধরে ঢাকার শ্যামলীর ট্রমা সেন্টারে সিনিয়র স্টাফ নার্স হিসেবে কর্মরত ছিলেন। স্বজনদের ভাষ্য, কয়েক দিন ধরে জ্বরে ভুগছিলেন বৃষ্টি। পরে ডেঙ্গু শনাক্ত হলে তার শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হয়। মৃত্যুর দিন সকালেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বি-নেগেটিভ রক্তের প্রয়োজন জানিয়ে পোস্ট করেছিলেন তিনি। শেষ পর্যন্ত চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

বৃষ্টির বড় বোন মেঘলা ঘরামী বলেন, “আমার বোন আর নেই। ১৬ অক্টোবর ওর বিয়ের দিন ছিল। বিয়ের সব কেনাকাটাও শেষ হয়েছিল। ডেঙ্গু আমার বোনটাকে কেড়ে নিল।”

বৃষ্টির ছোটবেলার শিক্ষক বলেন, “বৃষ্টি ছোটবেলা থেকেই খুব মেধাবী ও পরিশ্রমী ছিল। তার এমন মৃত্যু আমাদের হৃদয় ভেঙে দিয়েছে। শারদীয় দুর্গাপূজার আনন্দের সঙ্গে দুই জমজ বোনের বিয়ের আয়োজন নিয়ে পুরো এলাকায় যে প্রস্তুতি চলছিল, বৃষ্টির মৃত্যুতে সবকিছু থমকে গেছে।”

প্রতিবেশী মনিশ জয়দার বলেন, “বৃষ্টি ছোটবেলা থেকেই খুব হাসিখুশি ও নরম স্বভাবের মেয়ে ছিল। ছোটবেলায় দেখেছি, দুই বোনের যেকোনো একজনের জ্বর বা অসুস্থতা হলে অন্যজনেরও একই অবস্থা হতো। তাদের মধ্যে খুব গভীর সম্পর্ক ছিল। বৃষ্টির অকালমৃত্যুতে বন্যা মারাত্মকভাবে ভেঙে পড়েছে।”

বৃষ্টির জমজ বোন বন্যার হবু স্বামী অনুপ বাড়ৈ বলেন, বৃষ্টি ও সবুজের ভালোবাসা মেনে নেয় দুই পরিবার। দুই পরিবারের সম্মতিতে ১৬ অক্টোবর বিয়ের দিন ঠিক হয়।

আমারও বন্যার আরও দু বছর পরে বিয়ে হওয়ার কথা ছিল। শুধুমাত্র বৃষ্টির আগ্রহে একই দিনে বিয়ের আয়োজন করা হয়। এই বিয়ের পুরো অর্থ বৃষ্টিই সংগ্রহ করছিল। অফিসে অতিরিক্ত ডিউটি করছিল অনেক দিন ধরে। শুধু বিয়ের খরচ জোগানো নয়, পুরো পরিবারকে আগলে রেখেছিল বৃষ্টি। বর্তমান পরিস্থিতিতে হয়তো বা বিয়ের তারিখটা পরিবর্তন হবে।

বৃষ্টির মরদেহ বাড়িতে পৌঁছালে সবুজ সকলের অনুমতি নিয়েই নিথর বৃষ্টির কপালে সিঁদুর পরিয়ে দেন। এর আগে সবুজের অনুরোধে নিথর বৃষ্টিকে পরানো হয় লাল বেনারসি শাড়ি।

যে বাড়িতে কয়েক দিন পর দুই জমজ বোনের বিয়ের আয়োজন হওয়ার কথা ছিল, সেই বাড়িতেই এখন শোকের মাতম। বিয়ের জন্য কেনা লাল শাড়ি, সিঁদুর আর সাজসজ্জার সামগ্রীগুলো পড়ে আছে। শুধু নেই বৃষ্টি। ১৬ অক্টোবর যে দিনটি হওয়ার কথা ছিল নতুন জীবনের সূচনা, সেটিই এখন পরিবারের কাছে হয়ে থাকবে এক অপূর্ণ স্বপ্নের স্মৃতি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন