পেশায় আলাদা পরিচয়ে গুণী শিক্ষক লাভলী রানী

পেশায় আলাদা পরিচয়ে গুণী শিক্ষক লাভলী রানী
গুণী শিক্ষক লাভলী রানী বিশ্বাস। ছবি: আমার দেশ

শিক্ষকতা তার কাছে শুধু চাকরি নয়, ভালোবাসা ও দায়িত্বের নাম। কোমলমতি শিশুদের চোখে ভবিষ্যতের স্বপ্ন জাগিয়ে তোলা এবং তাদের ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাই যেন তার জীবনের অন্যতম লক্ষ্য। শিক্ষার্থীদের প্রতি মমতা, পেশার প্রতি নিষ্ঠা এবং নানা উদ্ভাবনী উদ্যোগের মাধ্যমে নিজেকে আলাদা পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত করেছেন মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার ৭৩ নং উল্লাবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক লাভলী রানী বিশ্বাস।

২০০৭ সালের ৯ জুলাই সরাসরি প্রধান শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন তিনি। দেখতে দেখতে পেরিয়ে গেছে ১৯ বছরেরও বেশি সময়। দীর্ঘ এই সময়ে তার হাত ধরে অনেক শিক্ষার্থী ডাক্তার, প্রকৌশলী, ব্যাংকার ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়েছেন। সাবেক শিক্ষার্থীদের সাফল্যই তার কাছে সবচেয়ে বড় অর্জন।

বিজ্ঞাপন

লাভলী রানী বিশ্বাস বলেন, ‘১৯ বছরের চাকরি জীবনে আমার অনেক শিক্ষার্থী ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ব্যাংকার ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়েছে। অনেকে এখন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে। এগুলো আমাকে ভীষণ আনন্দ দেয়। নিজের তথাকথিত বড় কোনো চাকরি না করার কষ্ট তখন আর থাকে না।”

শিক্ষাজীবনেও তার রয়েছে উজ্জ্বল সাফল্য। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়ন বিষয়ে বিএসসি অনার্সে প্রথম শ্রেণিতে সপ্তম এবং এমএসসি পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে চতুর্থ স্থান অর্জন করেন তিনি। উচ্চশিক্ষায় অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে প্রাথমিকের শিশুদের পাঠদানকে করেছেন আরও আনন্দময় ও কার্যকর।

ঝরে পড়া শিক্ষার্থীকে ফিরিয়েছেন বিদ্যালয়ে

শিক্ষার্থীদের প্রতি তার আন্তরিকতার অন্যতম উদাহরণ ছাত্র অনিক। একসময় বিদ্যালয়মুখী ছিল না এই শিক্ষার্থী। নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসত না, পড়াশোনার প্রতিও ছিল অনাগ্রহ। লাভলী রানী বিশ্বাস ব্যক্তিগতভাবে তার সঙ্গে যোগাযোগ করে ধীরে ধীরে তাকে বিদ্যালয়ে ফিরিয়ে আনেন এবং পড়াশোনার প্রতি আগ্রহী করে তোলেন। পরবর্তীতে সমাপনী পরীক্ষায় গণিতে ৯৫ নম্বর পেয়ে অনিক নিজেই বিস্মিত হয়েছিল।

আবার ছোটবেলায় স্কুল পালানো উজ্জ্বল নামের এক ডানপিটে শিক্ষার্থীও আজ দেশের বাইরে পড়াশোনা করছে। এসএসসি ও এইচএসসির ফরম পূরণের সময়ও সে শিক্ষক লাভলী রানীকে ফোন করেছিল। প্রয়োজনের সময় শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন তিনি, এমনকি কাউকে কাউকে আর্থিক সহযোগিতাও করেছেন।

দরিদ্র শিক্ষার্থীদের পাশে

দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্যও রয়েছে তার বিশেষ উদ্যোগ। বিদ্যালয়ের তুলনামূলক বেশি দরিদ্র শিক্ষার্থীদের শিক্ষা উপকরণের দায়িত্ব ভাগ করে দিয়েছেন সহকর্মীদের মধ্যে। বিদ্যালয়ের প্রত্যেক শিক্ষক অন্তত একজন দরিদ্র শিক্ষার্থীর খাতা, কলম, কাগজ ও স্কুল ড্রেসের দায়িত্ব বহন করেন। পাশাপাশি বিদ্যালয়ের সততা স্টোর থেকেও প্রয়োজন অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা দেওয়া হয়।

মায়েদের সম্পৃক্ত করে ইতিবাচক প্রতিযোগিতা

শিক্ষার্থীদের শিখন অগ্রগতি বাড়াতে নিজের উদ্যোগে বেশ কিছু কার্যক্রম চালু করেছেন লাভলী রানী বিশ্বাস। এর মধ্যে রয়েছে ‘প্রতিযোগিতাই গতিশীলতা’, ‘জানি ও জানাই’, মাল্টিমিডিয়ার মাধ্যমে পাঠদান এবং আকর্ষণীয় শিক্ষা উপকরণ ব্যবহার। শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি ও পড়াশোনায় অভিভাবকদের সম্পৃক্ত করতে মায়েদের নিয়ে গড়ে তুলেছেন হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ।

পাড়াভিত্তিক মা-লিডার নির্বাচন

পাড়াভিত্তিক মা-লিডার নির্বাচন করে শিক্ষার্থীদের ফলাফল ও অংশগ্রহণ পর্যবেক্ষণ করা হয়। যে পাড়ার শিক্ষার্থীদের পারফরম্যান্স ভালো হয়, সেই পাড়ার মা-লিডারকে দেওয়া হয় পুরস্কার। মায়েদের মধ্যে ইতিবাচক প্রতিযোগিতা তৈরি করতে রয়েছে ‘শ্রেষ্ঠ মা’ পুরস্কারের ব্যবস্থাও।

পড়াশোনার পাশাপাশি সহশিক্ষা কার্যক্রম

শুধু পাঠ্যবইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই বিদ্যালয়ের কার্যক্রম। বিতর্ক, আবৃত্তি, সুন্দর হাতের লেখা, সাবলীল পঠন, গান ও নৃত্যসহ বিভিন্ন সহপাঠক্রমিক কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। সরকারি ফান্ডামেন্টাল লার্নিং অ্যান্ড নিউমেরেসি কার্যক্রমে শতভাগ অর্জন, শিক্ষার্থীদের ৯৮ শতাংশ উপস্থিতি এবং শতভাগ ইউনিফর্ম নিশ্চিত করার সাফল্যও রয়েছে বিদ্যালয়টির।

একাধিকবার পেয়েছেন শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি

লাভলী রানী বিশ্বাসের কর্মের স্বীকৃতিও মিলেছে একাধিকবার। ২০২৪ সালে জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ গুণী শিক্ষক নির্বাচিত হন তিনি। ২০২৫ সালে জেলার শ্রেষ্ঠ গুণী প্রধান শিক্ষক নির্বাচিত হন। এছাড়া উপজেলা পর্যায়ে তিনবার শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক এবং জেলা পর্যায়ে একবার শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক নির্বাচিত হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন তিনি। গুণী শিক্ষক পদক চালুর পর ২০২৪ সালে প্রথম বছরেই জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ গুণী শিক্ষক হিসেবে স্বীকৃতি পান লাভলী রানী। পরের বছর ২০২৫ সালে প্রধান শিক্ষক ক্যাটাগরিতে জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ গুণী প্রধান শিক্ষক হন। নিজের সাফল্যের বিষয়ে লাভলী রানীর বক্তব্য খুবই সরল।

তিনি বলেন, ‘বিশেষ কিছুই না। আমি আমার পেশাকে ভীষণ ভালোবাসি, ভালোবাসি প্রত্যেকটি শিশুকে। স্বপ্ন দেখি এই শিশুদের নিয়েই। প্রত্যেকটি শিশুকে বিকশিত করা আমার অঙ্গীকার। সরকারের প্রতিটি কার্যক্রমকে ইতিবাচকভাবে নিয়ে নিজের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করি। নতুন প্রতিটি কার্যক্রমে নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা থাকে।’

শিক্ষক পরিবারেই বেড়ে ওঠা তার

ছয় বোনের মধ্যে তৃতীয় লাভলী রানী বিশ্বাস। শিক্ষক পরিবারের আবহেই তার বেড়ে ওঠা। তার বাবা ছিলেন উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক। তিন বোন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন। এক বোন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন। আরেক বোন সাতক্ষীরা সরকারি মেডিকেল কলেজের প্রভাষক এবং বর্তমানে এফসিপিএস করছেন। লাভলী রানী বিশ্বাস ২০২৪ ও ২০২৫ সালে জেলা পর্যায়ে গুণী শিক্ষক পদক অর্জন করে রাজৈরের শিক্ষাঙ্গনে অনন্য সাফল্যের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

পদক নয়, শিক্ষার্থীর সাফল্যই বড় অর্জন

লাভলী রানী বিশ্বাস মনে করেন, একজন শিক্ষকের প্রকৃত সাফল্য কোনো পদক বা সনদে নয়, তাঁর শিক্ষার্থীদের সাফল্যের মধ্যেই। তাই প্রতিদিন বিদ্যালয়ে এসে তিনি নতুন করে স্বপ্ন দেখেন। সেই স্বপ্ন হলো—রাজৈরের প্রত্যন্ত এলাকার প্রতিটি শিশু শিক্ষার আলোয় আলোকিত হবে, নিজের প্রতিভা বিকশিত করবে এবং একদিন সমাজ ও দেশের জন্য কাজ করবে।শিক্ষার্থীদের নিয়ে দেখা সেই স্বপ্নই যেন তাঁর নেশা। আর সেই নেশার পথ ধরে ৭৩ নং উল্লাবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রতিদিন তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন সম্ভাবনা। অভিভাবক শংকরী বলেন, “আমার সন্তান আগে নিয়মিত স্কুলে যেতে চাইত না। এখন স্কুলে যাওয়ার জন্য নিজেই আগ্রহ দেখায়। শিক্ষকদের আন্তরিকতা এবং লাভলী ম্যাডামের নজরদারির কারণে তার পড়াশোনায়ও অনেক উন্নতি হয়েছে। শুধু বইয়ের পড়া নয়, ভালো মানুষ হওয়ার শিক্ষাও এখানে দেওয়া হয়। একজন অভিভাবক হিসেবে আমরা এতে খুবই সন্তুষ্ট।”

অভিভাবক মুক্তেশ বলেন, “লাভলী ম্যাডাম মায়েদেরও বিদ্যালয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত করেছেন। আমাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হয় এবং সন্তানের পড়াশোনা ও উপস্থিতির বিষয়ে জানানো হয়। এতে আমরা সন্তানকে আরও ভালোভাবে সহযোগিতা করতে পারছি। বিদ্যালয়ে ‘শ্রেষ্ঠ মা’ ও পাড়াভিত্তিক মা-লিডারের মতো উদ্যোগগুলো আমাদের মধ্যেও সন্তানদের পড়াশোনার বিষয়ে সচেতনতা বাড়িয়েছে।

এমএইচ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন