আওয়ামী ডাক্তারদের কাছে জিম্মি টাঙ্গাইলের ৪০ লাখ মানুষ

আওয়ামী ডাক্তারদের কাছে জিম্মি টাঙ্গাইলের ৪০ লাখ মানুষ

টাঙ্গাইলে ৪০ লাখ মানুষ চিকিৎসাসেবায় আওয়ামীপন্থি ডাক্তারদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছেন। হাসপাতালগুলোতে স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপের) হাতে বন্দি রয়েছে রোগীরা। সিভিল সার্জনের কার্যালয়, মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রসহ সব সরকারি হাসপাতালে আওয়ামীপন্থি পেশাজীবী সংগঠন স্বাচিপের আধিপত্য ও প্রভাব বিদ্যমান থাকায় ড্যাব সদস্যরা কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে ওষুধের টেন্ডার।

বিজ্ঞাপন

অপরদিকে, ফ্যাসিস্ট সরকারের দীর্ঘ সময় দৌড়ের ওপর থাকা ডক্টর অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশসহ (ড্যাব) মেধাবী চিকিৎসকরা এখনো কোণঠাসা। যোগ্যতার ভিত্তিতে পদায়নের আশায় দিন কাটছে তাদের। এছাড়া স্বেচ্ছাচারিতা, অনিয়ম আর সিন্ডিকেটের মাধ্যমে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এমএসআর টেন্ডার নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ উঠেছে।

সম্প্রতি ঘাটাইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ২৫ বস্তা মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ নদীতে ফেলে দেওয়ার সময় জনতার হাতে ধরা পড়ে। গণমাধ্যমে প্রকাশ পেলে এ নিয়ে রীতিমতো তোলপাড় শুরু হয়। নড়েচড়ে বসে স্বাস্থ্য বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। ওষুধকাণ্ডের ঘটনায় উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার-পরিকল্পনা কর্মকর্তা স্বাচিপ সদস্য আবু নয়িম মোহাম্মদ সোহেলকে ওএসডি করা হয়। তিন সদস্যের তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছে। স্বাচিপের আদিপত্য রোধ, মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে চিকিৎসকদের পদায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না।

জানা গেছে, টাঙ্গাইল জেলায় একটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল, ১২টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও ১১১টি উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র রয়েছে। আওয়ামী শাসনামলে প্রায় ১৭ বছর এসব হাসপাতালের চিকিৎসক নিয়োগ ও বদলির ক্ষেত্রে স্বাচিপের সদস্যই ছিল যোগ্যতার অন্যতম প্রধান মাপকাঠি।

অনুসন্ধানে জানা যায়, টাঙ্গাইলের বর্তমান সিভিল সার্জন স্বাচিপের আজীবন সদস্য ফরাজী মো. মাহবুবুল আলম মঞ্জু গত বছরের ৯ মার্চ যোগদান করেন। স্বাচিপের অপর দুই সদস্য ডেপুটি সিভিল সার্জন মুহাম্মদ আজিজুল হক এবং মেডিকেল অফিসার আবু জাফর যোগদান করেন আওয়ামী সরকারের সময়ে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক পদে স্বাচিপের দুই সদস্য কামরুল কিবরিয়া ও মারুফ আহমেদ খান সহকারী পরিচালক পদে যোগদান করেন। এর আগে ২০১৪ সালে টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রকল্প পরিচালক পদে যোগদান করেন স্বাচিপের আজীবন সদস্য নুরুল আলম মিঞা। এ হাসপাতালের ১১৭ জন চিকিৎসকের বেশিরভাগই স্বাচিপের সদস্য।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের ৪৮ জন চিকিৎসক, নার্স ও কর্মকর্তা-কর্মচারীর তালিকা প্রকাশ করে বৈষম্যবিরোধী চিকিৎসকসমাজ। জুলাই গণবিপ্লবের বিরোধিতা, গণহত্যায় মদদদাতার অভিযোগ আনা হয়। এ তালিকার কয়েকজন বদলি হলেও বাকিরা গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল রয়েছেন। জেলার ১২ উপজেলার মধ্যে স্বাস্থ্য কর্মকর্তা হিসেবে ৯ জন নিয়োগ পান আওয়ামী সরকারের আমলে। যাদের প্রায় সবাই স্বাচিপ সদস্য বা আওয়ামী সুবিধাভোগী।

ড্যাবের টাঙ্গাইল জেলা শাখার সভাপতি ডা. আব্দুল মতিন আমার দেশকে জানান, জেলার চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্র এখনো স্বাচিপ ও আওয়ামী সুবিধাবাদী চিকিৎসকদের দখলে। নানা অনিয়ম-দুর্নীতি চলছে আগের মতোই। শূন্যপদে আওয়ামী দুঃশাসনে হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার চিকিৎসকদের পদোন্নতি ও পদায়নের সুযোগ রয়েছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন মহলের নজরে আনা হয়েছে।

এদিকে জেলার ১২টি উপজেলার মধ্যে মির্জাপুর, দেলদুয়ার, নাগরপুর, ভূঞাপুর, গোপালপুর, ধনবাড়ী ও সখিপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল, সার্জিকেল অ্যান্ড রিকোজিট টেন্ডারে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এসব উপজেলা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালার বহির্ভূত শর্ত আরোপ করে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ উঠেছে।

জেলা সিভিল সার্জন অফিস সূত্র জানায়, ১২টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অনুমোদিত ৪৫০টি পদের মধ্যে শূন্যপদ ১৭৭টি। পদায়ন করা ২৭৩ জনের মধ্যে বেশিরভাগই আওয়ামীপন্থি সুবিধাভোগী। এছাড়া ৫ আগস্টের পরে যে ১৪৫ জনের পদায়ন কর হয় তার মধ্যেও প্রাধান্য পায় আওয়ামী সুবিধাভোগীরা। টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৭৯০টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে ৬৩ জন আর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে ৮৭ জনের বিপরীতে ৫৪ চিকিৎসক রয়েছে। এছাড়া জেলায় ১১১টি উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রে ৩৯টি পদ শূন্য রয়েছে। উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের চিকিৎসকের অধিকাংশ আওয়ামী পরিবারের সদস্য বা সুবিধাভোগী।

জেলা সিভিল সার্জন ফরাজী মো. মাহবুবুল আলম মঞ্জু আমার দেশকে জানান, ঘাটাইল স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ওষুধকাণ্ডের ঘটনায় কর্মকর্তাকে ওএসডি এবং তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। উপজেলার টেন্ডারে অনিয়ম হলে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি তিনি স্বাচিপের সদস্য নন বলেও দাবি করেন।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন