বাজিতপুরে সুদখোরদের খপ্পরে সর্বস্বান্ত ঋণগ্রহীতারা

শিল্পী বণিক, বাজিতপুর (কিশোরগঞ্জ)

বাজিতপুরে সুদখোরদের খপ্পরে সর্বস্বান্ত ঋণগ্রহীতারা

ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা সমবায় সমিতির চটকদার বিজ্ঞাপনের আড়ালে অধিক মুনাফার ফাঁদে ফেলে সাধারণ মানুষের কষ্টার্জিত সঞ্চয় আত্মসাৎ করার অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে মাত্রাতিরিক্ত সুদের চাপে প্রান্তিক গ্রাহকদের নিঃস্ব করার অভিযোগ রয়েছে এসব অননুমোদিত প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে।

কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর উপজেলায় গ্রাহকদের কাছ থেকে প্রাপ্য ঋণের বিপরীতে ফাঁকা চেক গ্রহণ ও পাওনা অর্থের চেয়ে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করে নিঃস্ব ও সর্বস্বান্ত করে চলেছে বাজিতপুরের কিছু মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি ও দাদন ব্যবসায়ী।

বিজ্ঞাপন

ভুক্তভোগী গ্রাহকরা জানান, শুধু এ মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি নয়, এলাকায় ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা বিভিন্ন সমিতি ও ব্যক্তিসুদখোররা চড়া সুদের ব্যবসা শুরু করেছে। এতে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন অনেকেই। বাড়ছে পারিবারিক অশান্তি এবং ঋণগ্রহীতাদের এলাকাছাড়া হওয়ার মতো ঘটনাও। জানা গেছে, নিবন্ধিত অধিকাংশ সমবায় সমিতি আইনবহির্ভূতভাবে ফাঁকা চেকের বিপরীতে সদস্যদের মধ্যে ঋণ বিতরণ করার কথা থাকলেও বেশি লাভের আশায় বাইরে ঋণ বিতরণ করে। আবার অনিবন্ধিত ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা কিছু সমিতি সাইবোর্ড টানিয়ে এবং কিছু ব্যক্তিসুদখোর সাধারণ মানুষের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে বার্ষিক, মাসিক, পাক্ষিক, সাপ্তাহিক মেয়াদে এমনকি দৈনিক হিসেবে চড়া সুদের ব্যবসা করছেন। কেউ ব্যাংকের ফাঁকা চেক ও জমির দলিল বন্ধক রেখে চড়া সুদে ঋণ গ্রহণ করছেন, যা সমাজে দাদন ব্যবসা নামে পরিচিতি পেয়েছে।

এ দাদন ব্যবসায়ীদের খপ্পরে পড়ে মানুষ প্রতারিত হচ্ছে। বহু পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়ছে। কেউ পরিবার নিয়ে দেউলিয়া হয়েছে এবং আত্মহত্যার মতো ঘটনাও ঘটেছে। দাদন ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য নিয়ে এরই মধ্যে উপজেলার সচেতন মহলের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। কয়েকটি স্থানে মানববন্ধনও করেছে সচেতন মহল।

পৌর শহরের মথুরাপুর (তমালতলা) গ্রামের মজিবর নামের এক দাদন ব্যবসায়ীর খপ্পরে পড়ে তমালতলা গ্রামের এক ক্ষুদ্র ওষুধ ব্যবসায়ী তার বসতবাড়ি, জমিজমা সম্পূর্ণ শেষ করে সর্বস্বান্ত হয়ে চার বছর ধরে এলাকা ছেড়ে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে অন্যত্র জীবনযাপন করছেন। একই এলাকার একজন বেসরকারি স্কুলশিক্ষক প্রয়োজনের তাগিদে সুদের ওপর টাকা নিয়ে সংসার জীবনের তার সবকিছু হারিয়ে এখন নিঃস্ব জীবনযাপন করছেন।

উপজেলার পৈলানপুর গ্রামের ভুক্তভোগী কাদের বলেন, ফলের ব্যবসার জন্য মথুরাপুর মোড়ে ‘প্রগতি সঞ্চয় ও ঋনদান সমিতি থেকে ব্যাংকের একটি ফাঁকা চেক জমা দিয়ে দেড় লাখ টাকা ঋণ নিই। প্রতিদিন এক হাজার ৫০০ টাকা করে চার মাস কিস্তি দেওয়ার পর ওই সমিতি উধাও হয়ে যায়। সমিতি উধাও হওয়ার আট মাস পর আমার নামে পাঁচ লাখ টাকার চেকের মামলা দেওয়া হয়। মামলায় উল্লেখ করা হয়, ওই সমিতির মালিক আমাকে টাকা ধার দিয়েছেন। মামলার পর থেকে আমি বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছি’। বাজিতপুর উপজেলা সমবায় অফিসার এরশাদ রিকাবদার বলেন, অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তবে ফাঁকা চেক জমা নিয়ে ঋণ দেওয়া আইনের পরিপন্থী।

এ বিষয়ে মুঠোফোনে কথা হয় জেলা সমবায় কর্মকর্তার সঙ্গে। তিনি বলেন, জেলা সমবায় অফিস থেকে সম্প্রতি এক স্মারকলিপির মাধ্যমে জেলা-উপজেলার সব বহুমুখী, মাল্টিপারপাস, সঞ্চয় ও ঋণদান, সার্বিক গ্রাম, কৃষি উন্নয়ন সমবায় সমিতির ঋণ বিতরণে ফাঁকা চেক, ডিড, স্ট্যাম্প গ্রহণ না করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বাজিতপুর উপজেলা প্রশাসক ও নির্বাহী কর্মকর্তা জালাল উদ্দীন বলেন, ফাঁকা চেক কিংবা জমির দলিলের বিনিময়ে কেউ প্রতারিত হয়ে অভিযোগ করলে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...