খেলাধুলা ছেড়ে গেম ও অনলাইন জুয়ায় ঝুঁকছে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীর শিশু-কিশোররা। এতে করে বাড়ছে শিশু অপরাধ প্রবণতা।
বিকাল হলেই একসময় সরগরম হয়ে উঠত গ্রামের মাঠ। কোথাও ফুটবলের লড়াই, কোথাও ক্রিকেট, আবার কোথাও চলত গোল্লাছুট, হাডুডু কিংবা দাঁড়িয়াবান্দা। সন্ধ্যার আগে মাঠ ছেড়ে বাড়ি ফিরত শিশু-কিশোররা। সেই চেনা দৃশ্য এখন অনেকটাই হারিয়ে গেছে। মাঠের জায়গা দখল করেছে মোবাইলের ছোট পর্দা। এমনকি দুর্বল নেটওয়ার্কের কারণে ইন্টারনেটের খোঁজে কেউ কেউ গাছের ডালে, কেউ বাঁশের মাচায় বসেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা মোবাইলে ডুবে থাকছে।
কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে এখন এমন দৃশ্য চোখে পড়ছে। দল বেঁধে গাছের নিচে কিংবা উঁচু কোনো স্থানে বসে মোবাইল হাতে ব্যস্ত কিশোর-তরুণরা। কারো চোখ অনলাইন গেমে, কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, আবার কেউ জড়িয়ে পড়ছে অনলাইন জুয়ায়। নেটওয়ার্কের জন্য গাছে ওঠার এই দৃশ্য যেমন কৌতূহল তৈরি করছে, তেমনি শিশু-কিশোরদের মোবাইলনির্ভর হয়ে পড়া নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, আগে অবসর সময়ের প্রধান সঙ্গী ছিল মাঠ ও খেলাধুলা। এখন সেই জায়গা নিয়েছে স্মার্টফোন। খেলার মাঠের সংকট, পড়াশোনার চাপ, নিরাপত্তা নিয়ে অভিভাবকদের উদ্বেগ এবং সহজলভ্য ইন্টারনেট সব মিলিয়ে শিশু-কিশোরদের একটি বড় অংশ ঘরবন্দি হয়ে পড়ছে। আর ঘরবন্দি সময়ের বড় অংশ কাটছে মোবাইলের পর্দায়।
উপজেলার মসূয়া ইউনিয়নের পং মসূয়া গ্রামের প্রবীণ মুরুব্বী মোমতাজ উদ্দিন জানান, আগে বিকাল হলেই ছেলেরা দল বেঁধে মাঠে চলে যেত। কেউ ফুটবল খেলত, কেউ ক্রিকেট, আবার কেউ গোল্লাছুট বা হাডুডু। সন্ধ্যা হলে সবাই বাড়ি ফিরত। এখন মাঠে শিশু-কিশোর কম, মোবাইল হাতে তাদের সংখ্যাই বেশি। মসূয়া গ্রামের কিশোর জিসান বলেন, মাঝেমধ্যে ফুটবল খেলতে যাই। গোল্লাছুট ও দাঁড়িয়াবান্দা এসব খেলার নাম শুনেছি, কিন্তু কোনোদিন খেলিনি, দেখিওনি।
অভিভাবকদের অভিযোগ, মোবাইলের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তির কারণে সন্তানদের পড়াশোনায় মনোযোগ কমছে। অনেক শিশু মোবাইল ছাড়া খেতে চায় না, পড়তে বসে না। আবার কিশোরদের কেউ কেউ গেম কিংবা অনলাইন জুয়ার পেছনে অর্থ ব্যয় করছে। এতে পরিবারে তৈরি হচ্ছে অশান্তি ও উদ্বেগ। জালালপুর ইউনিয়নের রহিমা খাতুন বলেন, ভাবতেই পারছি না আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম কোনো দিকে যাচ্ছে। সাত বছরের ছেলেকে মোবাইল না দিলে পড়তে বসে না। সাড়ে তিন বছরের মেয়েও মোবাইল ছাড়া এক লোকমা খাবার খেতে চায় না। সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমি দিশাহারা।
কটিয়াদী সদর ভোগপাড়া ইসলামিয়া দাখিল মাদরাসার ভারপ্রাপ্ত সুপার সুফিয়া খাতুন বলেন, বর্তমান প্রজন্মের অনেক শিশুই জন্মের পর থেকেই মোবাইলের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে। কান্না থামাতে কিংবা ব্যস্ত রাখতে মা-বাবা ছোটবেলা থেকেই তাদের হাতে মোবাইল তুলে দিচ্ছেন। এভাবেই ধীরে ধীরে মোবাইলের প্রতি তৈরি হচ্ছে আসক্তি। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই আগ্রহ আরো গভীর হয়ে শিশুর স্বাভাবিক খেলাধুলা, পড়াশোনা ও সামাজিক মেলামেশার জায়গা দখল করে নিচ্ছে মোবাইল। কটিয়াদী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বদিউল আলম মাহফুজ বলেন, মোবাইলে অনলাইন গেমের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তির কারণে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় মনোযোগ নষ্ট হচ্ছে। অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহার তাদের ভবিষ্যতের জন্য বড় ধরনের হুমকি। এখনই সচেতন না হলে একটি প্রজন্ম মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।
কটিয়াদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা. ঈসা খান বলেন, অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের ফলে শিশুদের চোখের বিভিন্ন সমস্যা, ঘুমের ব্যাঘাত, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা ও মনোযোগের সমস্যা দেখা দিতে পারে। শিশুদের দীর্ঘসময় মোবাইলে না রেখে নিয়মিত খেলাধুলা ও শারীরিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার পরামর্শ দেন তিনি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

