বৃদ্ধকে রাস্তায় ফেলে গেলেন স্বজনরা, পাশে দাঁড়ালেন প্রতিমন্ত্রী

জেলা প্রতিনিধি, টাঙ্গাইল

বৃদ্ধকে রাস্তায় ফেলে গেলেন স্বজনরা, পাশে দাঁড়ালেন প্রতিমন্ত্রী

জীবনের শেষ প্রান্তে এসে মানুষ সবচেয়ে বেশি আশ্রয় খোঁজেন নিজের সন্তান-স্বজনের কাছে। কিন্তু টাঙ্গাইলে শতবর্ষী এক বৃদ্ধের জীবনে ঘটেছে তার সম্পূর্ণ বিপরীত। সারাজীবন পরিশ্রম করে সন্তানদের মানুষ করা সেই বৃদ্ধকে বয়সের ভারে ন্যুব্জ, প্রায় দৃষ্টিশক্তিহীন অবস্থায় রাস্তার পাশে ফেলে রেখে যায় স্বজনরা।

পরে স্থানীয়দের খবরে তাকে উদ্ধার করে পুলিশ। অসহায় ওই বৃদ্ধের চিকিৎসা, থাকা-খাওয়া ও প্রয়োজনীয় সব ব্যয়ভার ব্যক্তিগতভাবে বহনের ঘোষণা দিয়েছেন টাঙ্গাইল সদর আসনের সংসদ সদস্য ও মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু।

বিজ্ঞাপন

জানা যায়, গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় টাঙ্গাইল সদর উপজেলার বল্লা ইউনিয়নের বইল্লা এলাকার একটি সেতুর পাশে কান্নারত অবস্থায় শতবর্ষী মফিজ উদ্দিনকে দেখতে পান স্থানীয়রা। প্রায় দৃষ্টিশক্তিহীন এই বৃদ্ধ দীর্ঘদিন ধরেই বয়সজনিত নানা সমস্যায় ভুগছেন এবং একা চলাফেরা করতে পারেন না। শারীরিক দুর্বলতার কারণে দৈনন্দিন জীবনযাপনের প্রায় সব ক্ষেত্রেই তাকে অন্যের সহায়তার ওপর নির্ভর করতে হয়।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, এনায়েতপুর গ্রামের বাসিন্দা মফিজ উদ্দিন তিন ছেলে ও তিন মেয়ের জনক। প্রায় আট বছর আগে স্ত্রী মারা যাওয়ার পর থেকেই তিনি একাকী জীবনযাপন করছিলেন। এক ছেলে মারা গেছেন, বড় ছেলে পক্ষাঘাতগ্রস্ত এবং ছোট ছেলে আলাদা সংসার করেন। জীবনের শেষ সম্বলটুকুও মাত্র ১০০ টাকার বিনিময়ে দুই ছেলের নামে লিখে দেওয়ার পর পরিবারে তার অবস্থান আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, পক্ষাঘাতগ্রস্ত বড় ছেলে শামসুলের বাড়িতেই তিনি বসবাস করতেন। ছেলের স্ত্রী মারা যাওয়ার পর সেখানে নাতনি ও তার স্বামী থাকতেন। তারা বৃদ্ধের দেখাশোনা করতে অনাগ্রহী ছিলেন। একপর্যায়ে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তাকে বাড়ি থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে নিয়ে গিয়ে রাস্তার পাশে ফেলে রেখে চলে যান। দীর্ঘ সময় সেখানে বসে কান্নাকাটি করার পর স্থানীয়রা এগিয়ে এসে তার পরিচয় শনাক্ত করেন।

ঘটনার খবর পৌঁছে যায় প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকুর কাছে। বিষয়টি জানার পর তিনি তাৎক্ষণিকভাবে টাঙ্গাইল সদর থানার ওসি গোলাম মুক্তার আশরাফ উদ্দিনকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।

প্রতিমন্ত্রীর নির্দেশে পুলিশ রাতেই ঘটনাস্থলে গিয়ে বৃদ্ধকে উদ্ধার করে নিরাপদে তার ছোট মেয়ে রিনা বেগমের জিম্মায় পৌঁছে দেয়। একই সঙ্গে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হয়। ইতোমধ্যে নাতনিকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। তবে তার স্বামী পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে পালিয়ে যান।

শুধু উদ্ধার নয়, বৃদ্ধের চিকিৎসা, খাবার, বাসস্থান এবং প্রয়োজনীয় সব ব্যয়ভার ব্যক্তিগতভাবে বহনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী। পাশাপাশি দ্রুত তার বৃদ্ধভাতার ব্যবস্থা করা এবং প্রয়োজনে আলাদা কক্ষ ভাড়া নিয়ে থাকার ব্যবস্থাও করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।

প্রথমদিকে বাবার দায়িত্ব নিতে অনাগ্রহ প্রকাশ করলেও প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার পর ছোট মেয়ে রিনা বেগম বাবার দেখাশোনার দায়িত্ব নিতে সম্মত হন।

রিনা বেগম বলেন, “পাশের বাড়ির লোকজনের মাধ্যমে জানতে পারি আমার বাবাকে রাস্তার পাশে ফেলে রেখে যাওয়া হয়েছে। বাবাকে ওই অবস্থায় দেখে খুব কষ্ট পেয়েছি। প্রতিমন্ত্রী আমার সঙ্গে কথা বলেছেন এবং সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। এখন থেকে বাবার দায়িত্ব আমিই পালন করব।”

টাঙ্গাইল সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা গোলাম মুক্তার আশরাফ উদ্দিন বলেন, “প্রতিমন্ত্রীর নির্দেশ পাওয়ার পরপরই পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে বৃদ্ধকে উদ্ধার করে। তিনি বর্তমানে তার ছোট মেয়ের হেফাজতে রয়েছেন। নাতনিকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। তবে তার স্বামী পালিয়ে গেছেন। তাকে আটকের চেষ্টা চলছে।”

প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, “একজন অসহায় বৃদ্ধকে এভাবে রাস্তায় ফেলে রেখে যাওয়ার ঘটনা অত্যন্ত অমানবিক ও হৃদয়বিদারক। বাবা-মা আমাদের সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ। তাদের অবহেলা করার কোনো সুযোগ নেই। যতদিন প্রয়োজন, এই বৃদ্ধের চিকিৎসা, থাকা-খাওয়া ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতার দায়িত্ব আমি নেব। একই সঙ্গে যারা তাকে এভাবে পরিত্যাগ করেছে, তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। সমাজের প্রতিটি মানুষকে অসহায় প্রবীণদের পাশে দাঁড়াতে হবে।”

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...