নানা সংকটে মুখ থুবড়ে পড়েছে প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা

নানা সংকটে মুখ থুবড়ে পড়েছে প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা
শিবালয়ের চরাঞ্চলে সমস্যা সংকুল একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়।

মানিকগঞ্জের শিবালয়, দৌলতপুর ও হরিরামপুর উপজেলার দুর্গম চরাঞ্চলের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে নানান সংকটে ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষা কার্যক্রম। উত্তাল নদী পেরিয়ে যাতায়াতে দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে শিক্ষার্থীরা। এছাড়া, শিক্ষক সংকট, আবাসন সংকট, নদীভাঙন, অনুন্নত যোগাযোগব্যবস্থা, মোবাইল নেটওয়ার্কের দুরবস্থা এবং অভিভাবকদের অসচেতনতার কারণে এসব বিদ্যালয়ে নিয়মিত পাঠদান ও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

বিজ্ঞাপন

দীর্ঘদিন ধরে এসব সমস্যা থাকলেও তা সমাধানে কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে না। ফলে চরাঞ্চলের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা মুখ থুবড়ে পড়েছে। শিবালয়ের আলোকদিয়া, মধ্যনগর, গঙ্গাপ্রসাদ, ত্রিশুন্ডি, দৌলতপুরের বাগুটিয়া, চরকাটারি, বাচামারা এবং হরিরামপুর উপজেলার পদ্মা নদীবেষ্টিত আজিমনগর, লেছড়াগঞ্জ ও সুতালড়ি এলাকাকে দুর্গম চরাঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

হরিরামপুরে ১৩টি, শিবালয়ে ৫টি এবং দৌলতপুরে ৩৯টি মিলে এই তিন উপজেলায় মোট ৫৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। তিন উপজেলায় শিক্ষকের সংখ্যাÑহরিরামপুর ৪৯ জন, শিবালয়ে ১৭ জন এবং দৌলতপুরে ১৬৯ জন মিলে মোট ২৩৫ জন। এর মধ্যে সুতালড়ি রামচন্দ্রপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কার্যক্রম বর্তমানে নেই বলে জানা গেছে। বাকি বিদ্যালয়গুলোর মধ্যেও রয়েছে শিক্ষক সংকট।

আটটি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নেই। পাশাপাশি বেশিরভাগ বিদ্যালয়ে একাধিক সহকারী শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। দুর্গম চরাঞ্চলের এসব বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকটের অন্যতম কারণ যাতায়াতের সমস্যা। পদ্মা নদীরভাঙন ও নৌযাননির্ভর যোগাযোগব্যবস্থার কারণে বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে পড়ে। অনেক শিক্ষককে প্রতিদিন সমতল এলাকা থেকে ইঞ্জিনচালিত নৌযানে নদী পার হয়ে বিদ্যালয়ে যেতে হয়। নৌযান সংকট, অতিরিক্ত ভাড়া এবং কখনো কখনো নৌযান মালিকদের স্বেচ্ছাচারিতার কারণে শিক্ষকদের ভোগান্তিতে পড়তে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

চরাঞ্চলের অনেক বিদ্যালয়ে যেতে শিক্ষকদের ২০ থেকে ২৫ কিলোমিটার পর্যন্ত পথ পাড়ি দিতে হয়। যাতায়াতের মাধ্যম ও সড়কের অবস্থার কারণে যাতায়াতে সময় লাগে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা। এতে শিক্ষকদের সময় ও অর্থের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। মাস শেষে বেতনের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ যাতায়াত ব্যয়েই চলে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন কয়েকজন শিক্ষক।

এনায়েতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আরমান আলী বলেন, ‘যাতায়াতে প্রতিদিন প্রায় দুই ঘণ্টা সময় চলে যায়। খরচ হয় প্রায় ৩০০ টাকা। বর্ষায় সময় ও খরচ দুটোই বেড়ে যায়। কিন্তু এ জন্য আমাদের কোনো ভাতা নেই।’ শিক্ষকদের অভিযোগ, চরাঞ্চলে কাজ করার জন্য কোনো ধরনের বিশেষ যাতায়াত সুবিধা কিংবা দুর্গম এলাকার ভাতা না থাকায় তাদের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি হচ্ছে।

পাশাপাশি দীর্ঘসময় নৌপথ ও দুর্গম সড়ক পাড়ি দিয়ে বিদ্যালয়ে পৌঁছাতে গিয়ে শারীরিকভাবেও ক্লান্ত হয়ে পড়তে হয়। শুধু শিক্ষক সংকট কিংবা যাতায়াত সমস্যাই নয়, চরাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে উপস্থিতির হার নিয়েও রয়েছে উদ্বেগ। বেশিরভাগ বিদ্যালয়েই শিক্ষার্থীর সংখ্যা খুবই কম। এর কারণ চরাঞ্চলের অধিকাংশ মানুষ কৃষিকাজ ও দিনমজুরির সঙ্গে সম্পৃক্ত। পরিবারের আয়ের সঙ্গে শিশুদের কাজের সম্পর্ক থাকায় অনেক অভিভাবক সন্তানের নিয়মিত লেখাপড়ার চেয়ে পারিবারিক ও কৃষিকাজকে বেশি গুরুত্ব দেন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

এদিকে চরাঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোতে কর্মরত শিক্ষকদের আবাসন ব্যবস্থা নেই। ফলে দূরবর্তী এলাকা থেকে প্রতিদিন যাতায়াত করেই দায়িত্ব পালন করতে হয় শিক্ষকদের। এতে সময় ও অর্থের পাশাপাশি তাদের শারীরিক ও মানসিক চাপও বাড়ছে। নারী শিক্ষকদের ক্ষেত্রে নিরাপদ যাতায়াত ও আবাসনের সংকট আরো বেশি সমস্যার সৃষ্টি করছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এছাড়াও চরাঞ্চলে মোবাইল নেটওয়ার্কের চরম দুরবস্থা। চরাঞ্চলের অনেক এলাকায় নেটওয়ার্ক দুর্বল থাকায় শিক্ষকদের সঙ্গে পরিবার কিংবা বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নিয়মিত যোগাযোগও অনেক সময় সম্ভব হয় না।

বিশেষ করে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার সময় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লে শিক্ষক ও তাদের পরিবারের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়। নদীভাঙন ও বন্যার সময় এসব সমস্যা আরো প্রকট আকার ধারণ করে। স্বাভাবিক সময়ে যে পথ পাড়ি দিয়ে বিদ্যালয়ে যাওয়া সম্ভব, বর্ষা বা বন্যার সময় সেই পথ হয়ে ওঠে অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। নৌযাননির্ভরতা বেড়ে যাওয়ায় যাতায়াত খরচও বাড়ে।

অনেক সময় প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে নির্ধারিত সময়ে বিদ্যালয়ে পৌঁছানো সম্ভব হয় না। এতে শিক্ষকরা প্রশাসনিক জটিলতার মুখেও পড়েন বলে অভিযোগ রয়েছে। চরাঞ্চলের আরেকটি সমস্যা হলোÑবদলি ব্যবস্থা। কোনো বিদ্যালয়ে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষক দীর্ঘদিন একই বিদ্যালয়ে কর্মরত থাকছেন। বদলির বিভিন্ন নিয়ম ও প্রক্রিয়ার কারণে অনেক শিক্ষক ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও অন্যত্র বদলি হতে পারছেন না বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ। ফলে দুর্গম এলাকায় দীর্ঘদিন কর্মরত শিক্ষকদের মধ্যে হতাশা তৈরি হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, চরাঞ্চলের শিক্ষাব্যবস্থার বাস্তব চিত্র বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত শূন্যপদ পূরণ, প্রয়োজনীয় শিক্ষক নিয়োগ, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী যাতায়াত ব্যবস্থা, শিক্ষকদের জন্য আবাসন সুবিধা এবং শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করতে বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি চরাঞ্চলের অভিভাবকদের মধ্যে শিক্ষার গুরুত্ব নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে স্থানীয় প্রশাসন ও শিক্ষা বিভাগের সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি।

এ ব্যাপারে মানিকগঞ্জ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা গকুল চন্দ্র দেবনাথ বলেন, ‘পরিকল্পনা তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। জেলা উন্নয়ন ও সমন্বয় সভায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। পরিকল্পনা তৈরির কাজ চলছে। এটি সম্পন্ন হলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বরাবর প্রেরণ করা হবে। একটি সঠিক ও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনাই দীর্ঘদিনের সমস্যার সমাধান হতে পারে বলে মনে করি।’ এসব বিষয়ে জেলা প্রশাসক নাজমুন সুলতানা বলেছেন, ‘আমরা বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছি। কর্মস্থলে থেকে কাজ করার বিকল্প নেই। আমরা চরে শিক্ষকদের আবাসনব্যবস্থা করার কথা ভাবছি।’

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন