ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে সার ডিলার নিয়োগকে কেন্দ্র করে বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। দলের নির্যাতিত ও দীর্ঘদিনের ত্যাগী নেতাকর্মীদের বাদ দিয়ে সুবিধাভোগীদের মূল্যায়ন করা হচ্ছে—এমন অভিযোগ তুলে সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন উপজেলা বিএনপির ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক জামাল হোসেন লস্কর।
একই বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন চুন্টা ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সেলিম।
শুক্রবার নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে উদ্দেশ্য করে জামাল হোসেন লস্কর লেখেন, ‘আপনার দলের ধ্বংস নিশ্চিত।’ দলের দুঃসময়ে রাজপথে থাকা নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন না করার অভিযোগ তুলে তিনি লেখেন, ‘আপনি বলেছিলেন, মিছিলের শেষ কর্মীটিও মূল্যায়ন পাবে। কিন্তু বাস্তব সত্য হচ্ছে, প্রথম কর্মীটির অস্তিত্ব বিলীন। সময় কিন্তু এক রকম যায় না—খারাপ সময় যেকোনো মুহূর্তে!’
একই দিন বিকেলে সরাইল উপজেলা বিএনপির প্রবীণ নেতা ও সভাপতি আনিসুল ইসলাম ঠাকুরকে উদ্দেশ্য করেও ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন জামাল।
সেখানে আওয়ামী লীগের নেতা এবং জুলাই বিপ্লবের আন্দোলন-সংক্রান্ত একটি মামলার এজাহারভুক্ত আসামি বিল্লালকে সার ডিলার পাইয়ে দিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও কৃষি কর্মকর্তার কাছে তদবিরের অভিযোগ তোলেন তিনি। কারা এ বিষয়ে তদবির করেছেন, তা জানতে চান জামাল।
এ ছাড়া বিল্লালকে গ্রেপ্তারের জন্য আবেদন, এ-সংক্রান্ত কল রেকর্ড প্রকাশ এবং দ্রুত সংবাদ সম্মেলনের কথাও পোস্টে উল্লেখ করেন তিনি।
জামাল হোসেন লস্কর সরাইল উপজেলা বিএনপির ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক ও উপজেলা ছাত্রদলের সদ্য সাবেক আহ্বায়ক। তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আইন ছাত্র ফোরামের ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শাখার আহ্বায়ক।
এর আগে জেলা ছাত্রদল ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজ ছাত্রদলের সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
এ বিষয়ে ‘আমার দেশ’কে জামাল হোসেন লস্কর বলেন, দলের দুঃসময়ে আন্দোলন-সংগ্রাম করতে গিয়ে তিনি ১২ থেকে ১৪টি মামলার আসামি হয়েছেন। হামলার শিকার হয়েছেন, কারাগারে গেছেন এবং রিমান্ডে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাকে বারবার ক্রসফায়ারে দেওয়ারও চেষ্টা করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। শিক্ষকতা পেশায় থাকাকালে চাকরিচ্যুত হওয়ারও দাবি করেন জামাল।
তিনি বলেন, ‘অনেক সময় না খেয়ে রোজা রাখতে হয়েছে। আমার পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়স্বজনও আমার জন্য বহুবার নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এত ত্যাগের পরও সার ডিলার হিসেবে আওয়ামী লীগের নেতা ও জুলাই বিপ্লবের আন্দোলন-সংক্রান্ত মামলার এজাহারভুক্ত এক আসামিকে মূল্যায়ন করা হয়েছে। এটি একজন ত্যাগী কর্মীর জন্য অত্যন্ত হতাশাজনক ও লজ্জাজনক।’
জামাল আরও বলেন, ‘এই নিষিদ্ধ সংগঠনের লোকদের ডিলার দেওয়ার মাধ্যমে আমার দল ও কৃষকদের হয়রানি করা হবে। এমনকি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভাবমূর্তিও নষ্ট হবে।’
এদিকে চুন্টা ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সেলিমও ফেসবুকে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি লেখেন, ‘চারটি মামলায় সাত বছর হাজিরা দিয়েছি, দলের জন্য কাজ করেছি। একটি সার ডিলারের আবেদন করেছিলাম, তাও পাইনি। যাকে কোনো দলের কাজে দেখিনি, দলের নাম দিয়ে সে পেয়েছে সার ডিলার।’
শুধু চুন্টা ইউনিয়ন নয়, সরাইল উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে সার ডিলার নিয়োগ নিয়েও বিতর্কের অভিযোগ উঠেছে। বিএনপির একাধিক নেতাকর্মীর অভিযোগ, ইউনিয়নগুলোতে দলের দীর্ঘদিনের ত্যাগী ও নির্যাতিত নেতাকর্মীদের বাদ দিয়ে সুবিধাভোগীদের নাম ডিলার নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ একরাম হোসেনকে ঘিরেও অভিযোগ তুলেছেন কেউ কেউ। তাদের দাবি, তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তা ছিলেন এবং সার ডিলার নিয়োগে অনিয়ম ও আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে একটি সিন্ডিকেটকে সুবিধা দিয়েছেন। উপজেলা সার ও বীজ কমিটির সব সদস্যের উপস্থিতি ছাড়াই নিজের মতো করে তালিকা তৈরি করে জেলা পর্যায়ে পাঠানোর অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। তবে এসব অভিযোগের কোনো স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে উপজেলা কৃষকদলের আহ্বায়ক মশিউর রহমান ‘আমার দেশ’-কে বলেন, তিনি কৃষি কর্মকর্তা একরাম হোসেনের কাছে ডিলার নিয়োগের বিষয়ে জানতে চাইলে কর্মকর্তা তাঁকে বলেন, ‘আপনাদের সকলের আবেদন যাচাই-বাছাই করে জেলায় পাঠানো হয়েছে। জেলা থেকে সিরিয়াল করে পাঠানো হবে।’
মশিউর রহমান বলেন, উপজেলা বীজ মনিটরিং কমিটির সদস্য হয়েও তিনি কমিটির সভায় থাকার সুযোগ পাননি। তাঁর প্রশ্ন, ‘আমি যদি মিটিংয়ে না থাকতে পারি, তাহলে বিএনপি নেতা পলাশ কীভাবে মিটিংয়ে থাকেন?’
তিনি আরও বলেন, ‘একদিন কৃষি অফিস থেকে একজন লোক আমাকে স্বাক্ষর দিতে বললে আমি তাঁর ডাকে স্বাক্ষর দিতে অপারগতা প্রকাশ করি। সরাইল উপজেলায় যদি কোনো বিএনপি কর্মী সার ডিলার পেতে পারেন, তাহলে সাবেক ছাত্রনেতা রিগান ও আমি মশিউর রহমানও পেতে পারি। কারণ আমরা দলের জন্য জেল খেটেছি, বছরের পর বছর মামলা-হামলার শিকার ও নির্যাতিত হয়েছি।’
তবে সার ডিলার নিয়োগে স্থানীয় বিএনপির কোনো হস্তক্ষেপের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সরাইল উপজেলা বিএনপির সভাপতি আনিসুল ইসলাম ঠাকুর। ‘আমার দেশ’-কে তিনি বলেন, ‘সরাইল উপজেলা কৃষি অফিস সকলের আবেদন যাচাই-বাছাই করে জেলায় পাঠিয়েছে। এ বিষয়ে স্থানীয় বিএনপি কোনো হস্তক্ষেপ করেনি। এরপর সেখান থেকে সরকার ডিলার নিয়োগ দিয়েছে।’
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ একরাম হোসেন বর্তমানে শায়েস্তাগঞ্জ কৃষি অফিসে কর্মরত। তাঁর সঙ্গে বিভিন্ন মাধ্যমে যোগাযোগের চেষ্টা করেও এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গত কয়েক বছর ধরে সরাইলে সার নিয়ে সাধারণ কৃষক ও মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে। সরাইলের বরাদ্দকৃত সার অন্য উপজেলায় ট্রাকযোগে পাচারের অভিযোগও রয়েছে। সম্প্রতি বিজয়নগরে বিপুল পরিমাণ সার সরাইল ২৫ বিজিবি আটক করেছে বলেও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
এমএইচ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

