উপজেলা প্রতিনিধি, আড়াইহাজার (নারায়ণগঞ্জ)

সবাই যখন ঘুমে, ইউএনও তখনো মানবিক দায়িত্বে

সবাই যখন ঘুমে, ইউএনও তখনো মানবিক দায়িত্বে
ছবি: আমার দেশ

রাত তখন সাড়ে ১২টা। দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত এক নারী পড়ে আছেন হাসপাতালের জরুরি বিভাগে। হাত-পা ভেঙে গুরুতর আহত । পরনের কাপড়ও ছিঁড়ে গেছে। পাশে নেই কোনো স্বজন, নেই তার পরিচয় জানার মতো কেউ। যারা তাকে রাস্তা থেকে উদ্ধার করে হাসপাতালে এনেছেন, তারাও জানালেন, তারা ওই নারীর আত্মীয় নন।

এমন অসহায় পরিস্থিতিতে খবর পেয়ে আড়াইহাজারের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আসাদুর রহমান গভীর রাতে ছুটে যান হাসপাতালে। প্রথমে ওই নারীর জন্য সালোয়ার-কামিজ কেনার ব্যবস্থা করেন। এরপর অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে এবং সঙ্গে একজন আনসার সদস্য দিয়ে তাকে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন ঢাকা পঙ্গু হাসপাতালে।

বিজ্ঞাপন

রাতের নিস্তব্ধতায় যখন অধিকাংশ মানুষ ঘুমে, তখন অচেনা এক নারীর পাশে দাঁড়ানোর এই উদ্যোগ যেন দায়িত্বের সীমানা ছাড়িয়ে মানবিকতার এক গল্প হয়ে উঠল। পরিচয় নেই, আত্মীয়তার সম্পর্ক নেই, পাশে থাকার মতো স্বজনও নেই; এমন একজন বিপন্ন মানুষের প্রয়োজনকে উপেক্ষা করেননি এক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা।

ঘটনাটি সোমবার রাত ১১টার দিকে গোপালদী পৌরসভার কলগাছিয়া এলাকার। একটি অজ্ঞাত গাড়ি ওই নারীকে চাপা দিয়ে চলে যায়। আনুমানিক ৩৫ থেকে ৪০ বছর বয়সি ওই নারী দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন। এ সময় তার হাত-পা ভেঙে যায় এবং পরনের কাপড়চোপড় ছিঁড়ে যায়।

পরে স্থানীয় লোকজন তাকে উদ্ধার করে আড়াইহাজার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে নিয়ে যায়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক গোলাম সারোয়ার আহত নারীর অবস্থা গুরুতর দেখে দ্রুত তাকে ঢাকায় নেওয়ার পরামর্শ দেন।

কিন্তু উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়ার ব্যবস্থা করবে কে? আহত নারীকে হাসপাতালে নিয়ে আসা লোকজন জানান, তারা তাকে রাস্তা থেকে উদ্ধার করে এনেছেন। তারা ওই নারীর আত্মীয়স্বজন নন। ফলে পরবর্তী চিকিৎসার দায়িত্ব নেওয়ার মতো কেউ তখন সামনে ছিলেন না।

এমন পরিস্থিতিতে রাত সাড়ে ১২টার দিকে ওই ব্যক্তিরা ইউএনও মো. আসাদুর রহমানের বাসায় গিয়ে ঘটনাটি জানান। খবর শুনে তিনি আর দেরি করেননি। সরাসরি চলে যান উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। সেখানে আহত নারীর অবস্থা দেখে প্রথমে তার জন্য সালোয়ার-কামিজ কেনার ব্যবস্থা করেন। এরপর দ্রুত ঢাকায় নেওয়ার জন্য নিজের খরচে অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করেন। চিকিৎসার পথে সহায়তার জন্য সঙ্গে দেন একজন আনসার সদস্য।

একজন অজ্ঞাপরিচয় মানুষের জন্য গভীর রাতে এমন উদ্যোগ শুধু দাপ্তরিক দায়িত্ব পালনের ঘটনা নয়; এটি বিপদের মুহূর্তে মানুষের পাশে দাঁড়ানোরও দৃষ্টান্ত। যার পরিচয় জানা নেই, যার সঙ্গে কোনো আত্মীয়তার বন্ধন নেই, তার প্রয়োজনকেই গুরুত্ব দিয়েছেন ইউএনও।

প্রশাসনিক দায়িত্বের পরিচয় পদবি দিয়ে। কিন্তু সেই দায়িত্বের মানবিক রূপ প্রকাশ পায় মানুষের বিপদের সময়ে। কলগাছিয়ার সেই রাতের ঘটনা মনে করিয়ে দেয়, জনসেবা কেবল কার্যালয়ের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কখনো কখনো বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়াতে হয় গভীর রাতেও, যখন চারপাশের মানুষ ঘুমিয়ে থাকে।

রাতে যখন সবাই ঘুমায়, তখনো কোথাও কেউ বিপন্ন থাকেন। তার পাশে কেউ এগিয়ে এলে অন্ধকারের মধ্যেও জ্বলে ওঠে মানবতার আলো। আড়াইহাজারের ইউএনও মো. আসাদুর রহমানের গভীর রাতের এই উদ্যোগ সেই মানবিকতারই একটি গল্প।

ইউএন আসাদুর রহমান জানান, ‘এটা আমার দায়িত্ব থেকে করেছি। কাজটি করে আমার ভালো লেগেছে।’

এমএইচ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন