কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দান আবারও প্রস্তুত হচ্ছে ইতিহাসের সাক্ষী হতে। শতবর্ষের ধারাবাহিকতায় এবার এখানে অনুষ্ঠিত হবে ১৯৯তম ঈদুল ফিতরের জামাত, যা দেশের সবচেয়ে বড় ঈদ জামাত হিসেবে সুপরিচিত। নির্ধারিত সময় অনুযায়ী ঈদের দিন সকাল ১০টায় শুরু হবে এই বৃহৎ জামাত, যেখানে দেশ-বিদেশ থেকে লাখো মুসল্লির সমাগমের প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
এবারের জামাতে ইমামতি করবেন প্রখ্যাত আলেম মুফতি আবুল খায়ের মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ। বিকল্প ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন মাওলানা জুবায়ের ইবনে আব্দুল হাই। নারীদের জন্য পৃথক নামাজের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে সূর্যবালা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে।
প্রায় সাত একর আয়তনের এই বিশাল ঈদগাহ ময়দানে প্রস্তুত করা হয়েছে ২০৬টি কাতার। প্রতিটি কাতারে প্রায় ৭০০ থেকে ৮০০ মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারবেন। মূল ময়দান ছাড়াও আশপাশের সড়ক, পুকুরপাড়, সেতু এবং বিভিন্ন ভবনের ছাদেও অতিরিক্ত মুসল্লিদের জন্য ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ফলে পুরো এলাকা পরিণত হবে এক বিশাল নামাজের ময়দানে।
জামাতকে ঘিরে ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে সকল প্রস্তুতি। মাঠে দাগ কাটা, মেহরাব নির্মাণ, দেয়ালে চুনকাম, ওজুখানা স্থাপন এবং সার্বিক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ শেষ হয়েছে। স্থানীয়দের অংশগ্রহণে এই প্রস্তুতি ঘিরে সৃষ্টি হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশ।
নিরাপত্তা নিয়ে কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপার ড. এস এম ফরহাদ বলেন, পুলিশের পক্ষ থেকে ৪ স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। পোশাকি পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকে দায়িত্ব পালন করবে। র্যাব ও এন্টিটেরিজম বোম ডিস্পোজল ইউনিট কাজ করবে। প্রতিটি মানুষ যখন ঈদগাহ ময়দানে আসবেন পুলিশের চারটি স্থাপনা পেরিয়ে আসতে হবে। সেটি চেকপোস্ট হোক বা পিকেট হোক। আবার কোথাও কোথাও পাঁচ থেকে ছয়টি স্থাপনা পেরিয়ে ময়দানে আসতে হবে। জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত রাখা হয়েছে ফায়ার সার্ভিস, অ্যাম্বুলেন্স, মেডিক্যাল টিম এবং কুইক রেসপন্স ইউনিট। ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থান থেকে বিশেষায়িত নিরাপত্তা ইউনিটও অংশ নেবে নিরাপত্তা কার্যক্রমে। প্রযুক্তি নির্ভর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে।
শোলাকিয়া ঈদগাহ পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আসলাম মোল্লা বলেন, সকাল ১০টায় ঈদ জামাতকে কেন্দ্র করে গড়ে তোলা হয়েছে বহুস্তর নিরাপত্তা বলয়। এবারও মাঠে শুধু জায়নামাজ নিয়ে প্রবেশ করতে হবে। মোবাইল, ব্যাগ নিয়ে প্রবেশে বিধি-নিষেধ রয়েছে। মাঠ ও আশপাশে বসানো হয়েছে ৬৪টি সিসিটিভি ক্যামেরা, ৬টি ওয়াচ টাওয়ার থেকে সার্বক্ষণিক নজরদারি করবে পুলিশ ও র্যাব।
মোতায়েন থাকবে এগারোশ পুলিশ, র্যাবের ৬টি টিম, ৫ প্লাটুন বিজিবি, ৫ প্লাটুন আনসার ও ৪ প্লাটুন সেনাবাহিনীর সদস্যরা। পাশাপাশি থাকবে ড্রোন নজরদারি, মেটাল ডিটেক্টর, আর্চওয়ে ও একাধিক চেকপোস্ট। ১৩ জন এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করবেন। দূর-দূরান্ত থেকে আগত মুসল্লিদের যাতায়াত সহজ করতে বাংলাদেশ রেলওয়ে চালু করেছে ‘শোলাকিয়া স্পেশাল’ নামে ২টি বিশেষ ট্রেন সার্ভিস।
সকাল ৬টায় ভৈরব থেকে ছেড়ে আসবে একটি এবং ময়মনসিংহ থেকে ৫টা ৪৫ মিনিটে একটি ট্রেন ছেড়ে আসবে। তিনটি খাবার পানির ভ্যান থাকবে যেখানে ৩ হাজার লিটার পানির ব্যবস্থা করে হবে। ৬টি নলকূপ, ৫টি অস্থায়ী অজুখানা, ১৫টি অস্থায়ী টয়লেটের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
ঐতিহ্য অনুযায়ী, ঈদ জামাত শুরুর আগে বন্দুকের গুলির মাধ্যমে সংকেত প্রদান করা হবে। নির্ধারিত সময়ের ১৫ মিনিট আগে তিনটি, ১০ মিনিট আগে দুটি এবং ৫ মিনিট আগে একটি গুলি ছুড়ে মুসল্লিদের সতর্ক করা হবে—যা শোলাকিয়ার দীর্ঘদিনের বিশেষ রেওয়াজ।
সব মিলিয়ে ধর্মীয় আবেগ, ঐতিহ্যের গৌরব এবং কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার সমন্বয়ে শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দান আবারও প্রস্তুত দেশের সবচেয়ে বড় ঈদ জামাত আয়োজনের জন্য। লাখো মুসল্লির পদচারণায় মুখরিত হবে পুরো এলাকা, একসঙ্গে উচ্চারিত হবে তাকবির, আর গড়ে উঠবে সাম্যের এক অনন্য বন্ধন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

