কিশোরগঞ্জের নিকলী হাওরে এখন বোরো ধান কাটার মৌসুম। হাওরের বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে কৃষকদের ব্যস্ততা থাকলেও সেই ব্যস্ততার আড়ালে লুকিয়ে আছে হাজারো বর্গাচাষির কান্না। কেউ ধান কাটছেন, কেউ রোদে শুকাচ্ছেন, আবার কেউ হিসাব মিলাতে গিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়ছেন ঋণ আর লোকসানের ভারে। বিশেষ করে ভূমিহীন বর্গাচাষিদের দুর্দশা এবার যেন আরো ভয়াবহ হয়ে উঠেছে।
হাওরাঞ্চলে বোরো মৌসুমে অন্যের জমি বর্গা নিয়ে চাষাবাদ করেন হাজারো ভূমিহীন কৃষক। কিন্তু জমির মালিকানা না থাকায় তারা ব্যাংক থেকে সহজে কৃষিঋণ পান না। ফলে বাধ্য হয়ে এনজিও ও মহাজনের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করতে হয় তাদের।
এবার অতিবৃষ্টি, আগাম বন্যা ও জলাবদ্ধতায় হাওরের বিস্তীর্ণ ফসলি জমি পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন এসব বর্গাচাষি।
নিকলীর ছোট-বড় হাওরগুলোতে এখন ধান কাটার উৎসব চললেও অনেক কৃষকের ঘরে নেই আনন্দ। ফসল হারিয়ে তারা এখন ঋণের কিস্তি, মহাজনের চাপ আর সংসারের খরচ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন।
একাধিক বর্গাচাষীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হাওরাঞ্চলের অধিকাংশ প্রান্তিক কৃষক অন্যের জমি বছরে চুক্তিভিত্তিক বর্গা নিয়ে চাষ করেন। প্রতি একর জমির জন্য ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত অগ্রিম দিতে হয়। এরপর বীজ, সার, সেচ ও শ্রমিক খরচ মিলে চাষাবাদে বিপুল টাকা ব্যয় হয়। কিন্তু নিজের নামে জমি না থাকায় ব্যাংক থেকে কৃষিঋণ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে বাধ্য হয়ে চওড়া সুদে এনজিও কিংবা মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিতে হয়।
এবার টানা বৃষ্টিপাত ও আগাম বন্যায় অনেক কৃষকের জমির ধান পানির নিচে তলিয়ে যায়। এতে ফসল হারিয়ে ঋণের বোঝায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তারা। অনেকেই এখন ধারদেনার চাপ সামলাতে বাড়িছাড়া হওয়ার আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন।
সুশীল ব্যক্তিত্ব সোহেল রানা বলেন, “নিকলী হাওরে অনেক ভূমিহীন কৃষক বোরো চাষের সঙ্গে জড়িত। বছরে মাত্র একবার ধানের আবাদ হয়। কৃষকরা অন্যের জমি বর্গা নিয়ে চাষ করেন। কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসল নষ্ট হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন বর্গাচাষিরাই। জমির মালিকরা আগেই টাকার অংশ নিয়ে ফেলেন। ক্ষতির পুরো বোঝা বহন করতে হয় কৃষকদের।
চামারটুলা গ্রামের প্রান্তিক কৃষক নুরু মিয়া (৩৫) বলেন, অন্যের জমি বর্গা নিয়ে চাষ করি। জমির ভাড়া, সার, সেচ আর শ্রমিকের খরচ দিতে গিয়ে হাতে কিছুই থাকে না। এবার আবার পানিতে ফসল তলিয়ে গেছে। ব্যাংকে ঋণ নিতে গেলে জমির কাগজ চায়, কিন্তু আমাদের তো নিজের জমি নেই। তাই বাধ্য হয়ে মহাজন বা এনজিও থেকে বেশি সুদে ঋণ নিতে হয়। এখন ঋণের চাপ সামলাতে পারছি না।
নিকলী সদরের মীরহাটি গ্রামের ভূমিহীন কৃষক এলিম মিয়া (৪৭) জানান, কুর্শা হাওরে ৪ একর জমি ২৮ হাজার টাকা দরে বর্গা নিয়ে হাইব্রিড বোরো ধানের আবাদ করেছিলেন তিনি। কিন্তু ভারী বৃষ্টিতে জমির ধান পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় তার প্রায় সাড়ে ৪ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। এই ক্ষতি কীভাবে কাটিয়ে উঠবেন, তা নিয়ে চরম উদ্বেগে আছেন তিনি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক নিকলী শাখার ব্যবস্থাপক মো. মোজাম্মেল হক বলেন, বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী জমির মালিক ভূমিহীন কৃষকের পক্ষে সুপারিশ করলে কৃষিঋণ দেওয়া সম্ভব। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে নিকলীতে ৪৩০ জন কৃষকের মাঝে ৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা কৃষিঋণ বিতরণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

