নারায়ণগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী গঞ্জে আলী খালকে ফতুল্লা ও শহরের প্রাণ বলা হয়। এই খাল জলাবদ্ধতা নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। প্রায় আট কিলোমিটারে এই খাল ফতুল্লার চানমারী থেকে শুরু হয়ে তল্লা-হাজীগঞ্জের বুক চিড়ে শীতলক্ষ্যা নদীতে সংযুক্ত হয়েছে। ঐতিহ্যবাহী সেক আল্টির দিকে বদ নজর পড়েছে কিছু বিএনপি নেতার, যারা নারায়ণগঞ্জ জেলা মাইক্রোবাস ও ট্যাক্সি স্ট্যান্ড শ্রমিক সমিতির সাইনবোর্ড সাঁটিয়ে দখলের পাঁয়তারা শুরু করেছেন। এ ঘটনায় ফতুল্লা ও নগরবাসীর মধ্যে দেখা দিয়েছে চরম অসন্তোষ।
সরেজমিনে দেখা যায়, ফতুল্লার চানমারী রেললাইন থেকে গঞ্জে আলী খালটির শুরু। আর সেখানেই নারায়ণগঞ্জ জেলা মাইক্রোবাস ও ট্যাক্সি স্ট্যান্ড মালিক সমিতি ও শ্রমিক কমিটির নামে বেশ কয়েকটি ব্যানার টানানো হয়েছে। সেখানে স্পষ্ট করে উল্লেখ রয়েছে— প্রস্তাবিত ট্যাক্সি স্ট্যান্ড। অপর একটি ব্যানারে এই কমিটির উপদেষ্টাদের নাম, যেখানে এই সমিতির প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে মহানগর বিএনপির সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট ইউসুফ খানের নামটি দেখা যায়। এছাড়া জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মাসকুল ইসলাম রাজীব, মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ফতে মোহাম্মদ রেজা রিপন, মহানগর যুবদলের আহ্বায়ক মনিরুল ইসলাম সজল, মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক রানাসহ ১৩ জন বিএনপি নেতার নাম রয়েছে।
খাল দখলের এই চেষ্টার খবরে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে নগরবাসী। তারা জানান, এর আগে ২০২০ সালের জুলাই মাসে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন শহরের পানি নিষ্কাশন স্বাভাবিক রাখতে এই খালের ওপর গড়ে ওঠা বিভিন্ন অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করেছিল। সে সময় খালটি পরিষ্কার হওয়ায় এলাকায় জলাবদ্ধতা অনেকটাই কমে আসে। এখন যদি এই খাল ভরাট করে ট্যাক্সি স্ট্যান্ড করা হয়, তাহলে ফতুল্লার চানমারী-তল্লা-হাজিগঞ্জ রেললাইন ও চাষাঢ়া এলাকার পানি নামার আর কোনো সুযোগ থাকবে না। বর্ষা মৌসুমের পুরোটা সময় তখন জলমগ্ন থাকবে এসব অঞ্চল।
খালের ওপর সাইনবোর্ড ব্যবহার করে ট্যাক্সি স্ট্যান্ড নির্মাণের পাঁয়তারায় ক্ষোভ প্রকাশ করে গণসংহতি নারায়ণগঞ্জ জেলার প্রধান সমন্বয়ক তরিকুল সুজন জানান, ‘খালটি আমাদের শহরের প্রাণ। খালটি কোনো দল বা ব্যক্তির সম্পত্তি নয়। এখানে ট্যাক্সি স্ট্যান্ড নির্মাণের চেষ্টা করা হলে আমরা তা প্রতিহত করব।’
এ বিষয়ে সংগঠনের প্রধান উপদেষ্টা ও মহানগর বিএনপির সদস্যসচিব আবু আল ইউসুফ খান টিপু বলেন, ‘বর্তমানে ট্যাক্সি স্ট্যান্ডটি সেনাবাহিনীর জায়গায় রয়েছে। সেনাবাহিনী জায়গাটি খালি করে দিতে বলেছে। তাই বিকল্প হিসেবে খালের মধ্যে প্রস্তাবিত জায়গায় সাইনবোর্ড লাগানো হয়েছে। যদি তারা সেখানে ট্যাক্সি স্ট্যান্ড না করতে পারে, তাহলে আপনারা তাদের জায়গা ঠিক করে দেন, তারা কোথায় যাবে। আমরা লিজের জন্য আবেদন করেছি।’
খালের জায়গা লিজ দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেছেন রেলওয়ে ঢাকা বিভাগীয় ভূ-সম্পত্তি বিভাগের উপসচিব শিমুল কুমার সাহা। তিনি বলেন, ‘আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর গত তিন মাসে গঞ্জে আলী খাল এলাকায় কোনো লিজ দেওয়া হয়নি। যেহেতু এটি জলাশয়ের অন্তর্ভুক্ত, এখানে কোনো স্থাপনা নির্মাণের সুযোগ নেই। শুধু মাছ চাষের জন্য লিজ দেওয়া যেতে পারে। বালু ভরাট করে ট্যাক্সি স্ট্যান্ড করার কোনো আইনগত অবকাশ নেই।’
উপদেষ্টা পরিষদের নাম থাকলেও এ বিষয়ে অবগত নয় বলে জানান জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মাসকুল ইসলাম রাজীব, মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ফতেহ মোহাম্মদ রেজা রিপন, মহানগর যুবদলের আহ্বায়ক মনিরুল ইসলাম সজল, মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক রানা।
তাদের দাবি, ‘৫ আগস্টের পর উপদেষ্টা পরিষদে আমাদের নাম রাখলেও আমরা কখনো তাদের কোনো মিটিংয়ে যাইনি। এই সমিতির কর্মকাণ্ড সম্পর্কে আমরা অবগত নই।’
তথ্য অনুযায়ী, খানপুর গঞ্জে আলী খাল নারায়ণগঞ্জের একটি পুরোনো ও গুরুত্বপূর্ণ জলাধার। এটি স্থানীয় পানি নিষ্কাশন এবং বর্ষাকালে জলাবদ্ধতা কমাতে বড় ভূমিকা রাখে। পুনর্খননের মাধ্যমে খালটিকে কার্যকর রাখার পাশাপাশি ভবিষ্যতে এর আশপাশে পার্ক বা জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত স্থান তৈরির পরিকল্পনাও ছিল। এমন অবস্থায় খাল দখল করে ট্যাক্সি স্ট্যান্ড স্থাপনের উদ্যোগ নগর পরিবেশ ও পানি ব্যবস্থাপনার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

