শরৎকালেও প্রমত্তা পদ্মার রুদ্ররুপ

সদরপুরে ভাঙনে বিলীন হচ্ছে বিস্তীর্ণ জনপদ

সদরপুরে ভাঙনে বিলীন হচ্ছে বিস্তীর্ণ জনপদ
ভাঙনের থাবায় বিলীন হচ্ছে কৃষিজমি। ছবি: আমার দেশ

বর্ষা মৌসুম শেষ, এখন শরৎকাল। দেশের বিভিন্ন স্থানে নদ-নদীর পানি কমলেও প্রমত্ত পদ্মার রুদ্ররূপ কিছুতেই থামছে না।

ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলায় পদ্মা নদীর ভয়াল ভাঙনের থাবায় বিলীন হচ্ছে কৃষিজমি ও বসতভিটা। চোখের সামনে নদীগর্ভে তলিয়ে যাচ্ছে শত শত বিঘা ফসলি জমি ও বসতবাড়ি। এছাড়া নদীর তীরে গড়ে ওঠা ২০০ বছরের প্রাচীন পিঁয়াজখালীর হাট, ঘাট, বাজার, আশ্রয়ণ প্রকল্প ভবনসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা মারাত্মক হুমকির মুখে রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

স্থানীয়দের দাবি, বর্ষা শেষে পদ্মার এমন ভাঙন আর তীব্র স্রোত আগে কখনো দেখা যায়নি। তাদের মতে, বাগড়া ঘাট থেকে দিয়ারা ও চরনাসিরপুর ঝাউকান্দা হয়ে পদ্মা নদী শাসনের মাত্র ১৭ কিলোমিটার কাজ হওয়ার পর তা স্থগিত থাকায় নদীর স্রোতের মূল প্রবাহ সদরপুরের দিকে ঘুরে গেছে । পদ্মাতীরের সদরপুর অংশে এখনই টেকসই বাঁধ বা স্থায়ী সমাধান না মিললে তীব্র স্রোতের কারণে সৃষ্ট এই ভাঙনে অচিরেই গ্রাস হয়ে যাবে একটি স্বাবলম্বী ও প্রাণবন্ত বিশাল জনপদ।

সরেজমিনে দেখা যায়, সদরপুর উপজেলার ঢেউখালী ইউনিয়নের শয়তানখালী ঘাট, চেয়ারম্যান ঘাট ও মুন্সীরচর এবং পার্শ্ববর্তী চরনাছিরপুর ইউনিয়নের বাবুরালি মোল্যার কান্দি, শিমুলতলী, নাজির শিকদারের কান্দি, মনিরদ্দিন ফকিরের কান্দি, কাজীকান্দি ও শিকদারকান্দিসহ মাইলের পর মাইল নদীর পাড় একযোগে ভেঙে নদীগর্ভে তলিয়ে যাচ্ছে। নদীপাড়ের বাসিন্দারা তাদের বসতি নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নিলেও রোপিত ফসলসহ জমিগুলো ভাঙনের কবলে রয়েছে, বাধ্য হয়েই ভুক্তভোগী কৃষকেরা আধাপাকা বা কাঁচা ধান গোখাদ্য হিসেবে কেটে নিয়ে যাচ্ছেন।

এদিকে ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে চরনাসিরপুর ইউনিয়নের আশ্রয়ণ প্রকল্প ভবন, ঢেউখালীর শতবর্ষী পিঁয়াজখালী হাট, জনসংঘ আদর্শ উচ্চবিদ্যালয়, চরনাসিরপুর উচ্চবিদ্যালয়সহ বেশ কয়েকটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মসজিদ, ছোট-বড় বাজার ও লোকালয়। এতে চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে নদীপারের বাসিন্দারা।

শয়তানখালী ঘাটের ইজারাদার মানিক ব্যাপারী জানান, ‘যে হারে নদী ভাঙছে, তাতে আগামী বছর পিঁয়াজখালী হাট বলে আর কিছু থাকবে না।’ জনৈক সুমন বলেন, ‘শুনেছি উজানে নদীশাসনের কাজ বন্ধ রয়েছে এবং সেখানে বিশাল বালুর স্তূপ জমে আছে, যার ফলে নদীর স্রোতের গতিও পরিবর্তন হতে পারে।’

জনসংঘ আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক আইয়ুব আলী বলেন, ‘নদীরভাঙন অত্যন্ত তীব্র এবং প্রতিদিনই ভাঙন বাড়ছে, আমরা চরম আতঙ্কের মধ্যে আছি, কখনো ভাবিনি এত অল্প সময়ের মধ্যে নদী আমাদের এতটা কাছাকাছি চলে আসবে।’ নদীভাঙনের মুখে পড়া চরনাসিরপুরের কৃষক জয়নাল আধাপাকা ধান কাটতে কাটতে বলেন, ‘আর কিছুদিন থাকলেই ধান ঘরে তুলতে পারতাম। এখন বাধ্য হয়ে তা গরুর খাদ্য হিসেবে কেটে নিয়ে যাচ্ছি।’

চরনাসিরপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান রোকন উদ্দিন জানান, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো তাদের ঘরবাড়ি সরিয়ে নিচ্ছে, আশ্রয়ণ প্রকল্পের ভবনটিও চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। দ্রুত স্থায়ী সমাধান না হলে এই ইউনিয়ন মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে।

ঢেউখালী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বয়াতি বলেন, ‘আমার জীবনে এত তীব্র ভাঙন দেখিনি। চোখের সামনে মাত্র ২০ মিনিটে ৫০০ ফুট লম্বা ও ৩০ ফুট প্রস্থের এলাকা নদীগর্ভে তলিয়ে গেল, অথচ কয়েক বছর আগেও এমন পরিস্থিতি ছিল না। ভাঙনের গতি ভয়াবহ, তাই সরকারের উচিত দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে স্থায়ী বাঁধ বা নদীশাসনের কাজ বাস্তবায়ন করা।’

এ বিষয়ে সদরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শরীফ শাওন বলেন, ‘এ এলাকার মানুষের দুর্ভোগের বিষয়টি সরকার অবগত রয়েছে। পদ্মা নদী শাসনের বিষয়টি প্রকল্প আকারে একনেকে (ECNEC) তোলা হয়েছে এবং তা বর্তমানে পর্যালোচনার অধীনে রয়েছে। দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞরা এ নিয়ে কাজ করছেন, আশা করি খুব শিগগির একটি স্থায়ী সমাধান পাওয়া যাবে।’

এমএইচ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন