নরসিংদী জেলার সমৃদ্ধ ইতিহাস আর ঐতিহ্যগত নিদর্শনের ধারক হিসেবে শিবপুর উপজেলা অন্যতম। অধিকাংশ এলাকায় ছোট-বড় টিলা ও পাহাড় থাকায় প্রাকৃতিকভাবেই মনোরম সৌন্দর্যে ভরা এ উপজেলাটি। তাই দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে এখানে ছুটে আসেন ভ্রমণপিপাসুরা। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী মহল এই টিলাগুলোর মাটি কেটে একদিকে নষ্ট করছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, অন্যদিকে বিপন্ন করছে পরিবেশ।
ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের নাম ব্যবহার করে এসব ছোট-বড় টিলা কাটা হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। তাদের ভাষ্য, একটি স্বার্থান্বেষী মহলের ছত্রছায়ায় দিনরাত সমান তালে পাহাড় কাটায় বেপরোয়া মাটিখেকোরা।
পাহাড়ি এলাকাবেষ্টিত শিবপুর উপজেলার ৯টি ইউনিয়নে ছোট-বড় প্রায় হাজারের বেশি টিলা রয়েছে। এর মধ্যে বাঘাব, জয়নগর, চক্রধা ও যশোর ইউনিয়নেই টিলাগুলোর অবস্থান বেশি। টিলাগুলোর উচ্চতা ২০ থেকে ৪০ ফুটের মধ্যে। ভেকু দিয়ে দিন-রাত সমান তালে কাটা হচ্ছে এসব টিলা। কেটে নেওয়া মাটি ব্যবহার হচ্ছে আশপাশের পুকুর ভরাটের কাজে। এছাড়া টিলার অধিকাংশ মাটি বিক্রি হচ্ছে আশপাশের বিভিন্ন সিরামিক কারখানাতেও।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই চক্রটি পানির দামে কিনে নিচ্ছে টিলার মাটি। তারা আবার মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে বিক্রি করছে এসব মাটি। এলাকার প্রভাবশালীরা এই চক্রের সঙ্গে জড়িত থাকায় প্রশাসনের লোকজন এসব দেখেও অনেকটা না দেখার মতো থাকেন। আবার দরিদ্র কিছু লোকজন টিলা কেটে মাটি সমান করে বাড়িঘর নির্মাণে আগ্রহী। ফলে জোরেশোরেই চলছে মাটি কাটা। এভাবে টিলা কাটতে থাকলে কয়েক বছরের মধ্যেই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি শিবপুর এলাকার সৌন্দর্য বিলীন হয়ে যাবে বলে মনে করছে সচেতন মহল।
এদিকে সর্বশেষ শিবপুর উপজেলার চক্রধা ইউনিয়নের নিনগাও বাজারের পাশে ও বিলশরন এলাকায় বিশালাকার দুটি টিলা কেটে সমান করা হয়েছে। স্থানীয় প্রভাবশালী সেলিম ও শেখ রিমন নামে দুই ব্যক্তি আশপাশের টিলা বা পাহাড় কাটার দায়িত্ব নিয়ে থাকে। তারাই নিনগাও বাজারের পাশে ও পার্শ্ববর্তী বিলশরন এলাকার মাহমুদ এবং আবুল কাশেমসহ চার ভাইয়ের যৌথ মালিকানার টিলাটি ভেকু দিয়ে কেটে সেই মাটি দিয়ে আশপাশের পুকুর ভরাট করে ফেলে।
চক্রধা ইউনিয়নের বিলশরন এলাকার বাসিন্দা আক্কাছ আলী জানান, স্থানীয় ক্ষমতাসীন দলের ছত্রছায়ায় থেকে প্রভাবশালী কিছু ব্যক্তি পানির দামে টিলাগুলো কিনে নিচ্ছে। আর কেনার পর সুযোগ বুঝে রাত কিংবা দিনের বেলায় কেটে নিচ্ছে এসব টিলার মাটি। এভাবে মাটি কাটার ফলে পরিবেশ নষ্টের পাশাপাশি নষ্ট হচ্ছে রাস্তাঘাট, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পরিবেশ। তারা প্রভাবশালী হওয়ায় সাধারণ মানুষ প্রতিবাদও করতে পারে না। তাই বাধ্য হয়ে চুপ থাকা ছাড়া কোনো উপায় নেই।
চক্রধা ইউপি চেয়ারম্যান বেনজির আহমেদ খান জানান, কোনো টিলা বা পাহাড় কাটা, পুকুর খনন বা ভরাট করার জন্য ইউনিয়ন পরিষদ থেকে অনুমোদন নেওয়ার নিয়ম থাকলেও এ এলাকার কেউ তা মানছে না। তবে নিনগাও ও বিলশরন এলাকায় টিলা কাটার বিষয়ে কেউ ইউনিয়ন পরিষদ থেকে কোনো অনুমতি নেয়নি। বাকিটা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলতে পারবেন। নরসিংদী পরিবেশ আন্দোলনের (আপন) সভাপতি মঈনুল ইসলাম মিরু জানিয়েছেন, প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে ছোট-বড় টিলা ও পাহাড়। সেগুলোকে নির্বিচারে ধ্বংস করে পরিবেশকে বিপর্যয়ের দিকে নিয়ে যাচ্ছে কিছু মানুষ। গণমাধ্যমে এ নিয়ে সংবাদ প্রকাশ হলে প্রশাসনের কিছুটা তৎপরতা লক্ষ্য করা যায়। স্থায়ীভাবে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ প্রশাসনের পক্ষ থেকে চোখে পড়ে না।
শিবপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা ইয়াসমিন বলেন, শিবপুর উপজেলার বাঘাব, যশোর ও জয়নগর ইউনিয়নের কিছু অংশে প্রাকৃতিকভাবে পাহাড় ও টিলা রয়েছে। যেগুলো এ এলাকার প্রাকৃতিক পরিবেশের শোভাবর্ধন করে। এখানে অনেক গাছপালাও রয়েছে। কিন্তু টিলা বা পাহাড় কেটে ফেলার কোনো খবর আমি জানি না। যখন কাটে, তখন কেউ জানালে ব্যবস্থা নেবেন বলে জানান তিনি।
নরসিংদী পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক বদরুল হুদা জানান, বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন-১৯৯৫ অনুযায়ী যেকোনো ধরনের পাহাড় বা টিলা, হোক ব্যক্তিমালিকানাধীন বা সরকারি, কর্তন বা মোচন আইনত নিষিদ্ধ ও দণ্ডনীয় অপরাধ। আমরা নরসিংদীতে অবস্থিত কোনো পাহাড় বা টিলা কর্তনের খবর পেলে তখন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা এবং প্রশাসনের সহযোগিতায় মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিয়ে থাকি। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫-এর ৬(খ) ধারা অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সরকারি বা আধাসরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন বা দখলাধীন বা ব্যক্তিমালিকানাধীন পাহাড় ও টিলা কর্তন বা মোচন করতে পারবে না।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

